তুমি বড় রেগে যাচ্ছ।
এর পরও রাগ না হয়ে পারে, বলো!
আচ্ছা আমি ক্ষমা চাইছি। এখন বলে তো কী হয়েছে।
বলেছি তো। আর শুনতে চেও না। আমার একটা ব্যবস্থা করবে।
কি ব্যবস্থা? তোমার সঙ্গে একটা মেয়েকে রাখতে বললাম, তা তো রাখলে না?
ওটা মোটেই কোনও ভাল ব্যবস্থা নয়।
তা হলে নিমাইকে ফিরিয়ে আনো।
নিমাই! সে কেন ফিরবে! ইয়ার্কি করছ? এসব নিয়ে ইয়ার্কি করা ভাল নয় কাকা।
দেখ, ফের রেগে যাচ্ছে! ইয়ার্কি মোটেই করিনি।
আগে আমাকে বলো তো, মেয়েদের আর কতদিন এরকম পাহারা দিয়ে রাখতে হবে?
কাকা গম্ভীর হয়ে বলে, যতদিন রোপস্ট করে ততদিন।
রেপিস্টদের ফাঁসি দাও না কেন? যাকগে, সেই মেয়েটা কোথায় আছে?
নেই। সে একটা ছেলের সঙ্গে পালিয়ে গেছে।
বাঁচা গেছে।
তুমি বরং ঘরটা ছেড়ে শহরের দিকে চলে এসো।
নিজের ঘর ছেড়ে দেবো?
উপায় কি?
বীণা কিছুক্ষণ গুম হয়ে বসে থেকে হঠাৎ বলল, আমার মনটা একদম বিগড়ে গেছে।
ব্যাপারটা তুমি বড্ড বড় করে দেখছ। পচা-গলা একটা সমাজে থাকে। কত পাপ হচ্ছে চারদিক! গা বাঁচিয়ে এ মধ্যেই তো থাকতে হবে আমাদের। আর লড়াই করতে হবে।
তুমি কি লড়াই করছ শুনি?
আমিও লড়ছি বীণা। সামাজিক পাপের সঙ্গে আমার লড়াইয়ের হাতিয়ার নাটক। যার যা আছে সে তো তাই নিয়েই লড়বে, নাকি? আমাদের আর কোন হাতিয়ার আছে বলো!
বীণা গোঁজ হয়ে বসে থেকে কিছুক্ষণ পরে বলল, আমার বড় ভয় করছে। পারুলের মুখখানা দেখে এত কষ্ট হচ্ছিল কাল।
হওয়ারই কথা। ভেবো না, দলের কোনও মেয়েকে সঙ্গে কয়েকটা দিন রাখে। তারপর দেখা যাবে।
বীণা উঠল।
হাসপাতালে গিয়ে যখন পারুলকে ফের দেখল বীণা তখন তার জ্ঞান ফিরেছে। তার মা বসে আছে পাশে। তাকে দেখে পারুল ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
কী হয়ে গেল বীণাদি।
কী হয়েছিল বলবে?
পুলিশকে বলেছি। পুলিশ আরও উন্টে এমন সব প্রশ্ন করতে লাগল যেন দোষটা আমারই।
পুলিশও যে পুরুষমানুষ। কি হয়েছিল?
যা হয়। একা ফিরছিলাম। চারটে ছেলে মাঠের মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিল।
চারজন?
হ্যাঁ।
ফলো করে এসেছিল?
কী জানি। কাউকে লক্ষ করিনি আগে।
হঠাৎ এসে ধরল?
হ্যাঁ। চারজনকে দেখলাম রাস্তা আটকে দাঁড়িয়ে আছে। পাশ কাটাতে যেতেই একজন হাত ধরে ফেলল। বলল, আমাদের সঙ্গে যাবে? মেলা টাকা দেব।
এত সাহস?
ওরা আমাদের বেশ্যা বলেই বোধ হয় ভাবে। আমি ঝটকা মেরে হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে চেঁচাতে যাচ্ছি, অমনি একজন মুখ চেপে ধরল।
তারপর?
আরও শুনতে চাও? টেনে নিয়ে গিয়ে পতিত জমিটায় ফেলে দিল। তারপর মনে হচ্ছিল যেন, মানুষ নয়, চারট কুকুর আমাকে ছিঁড়ে খাচ্ছে। আমার কী হবে বীণাদি।
কী আবার হবে? এ সমাজে কিছু হয় নাকি? সব মেনে নিতে হয়।
আমার যে বিয়ে ঠিক হয়ে গিয়েছিল। পাকা কথা হয়ে গেছে। ওরা কি আর নেবে আমাকে?
বীণা থমকে গেল। তারপর বলল, কেন নেবে না?
ধ্যুৎ। রেপ হওয়া মেয়েকে কেউ নেয়?
বীণা স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে কিছুক্ষণ।
পারুল কাঁদতে কাঁদতে বলে, কিছুই পোপন থাকবে না বীণাদি। এতক্ষণে তাদের কাছে বোধ হয় খবর পৌঁছে গেছে। কী হবে বলে তো?
বীণা পারুলের হাতটা শক্ত করে ধরে বলল, শোনো, ওরকম কথা বলে না। বিয়েটাই মেয়েদের সব নয়। বিয়ে না হলেও জীবনটা নষ্ট হয়ে যায় না। মেয়েরা এত সহজে ভেঙে পড়ে বলেই তো লড়াই করতে পারে না। শক্ত হও তো। কয়েকটা কুকুর তোমার জীবন নষ্ট করে দেবে কি হয়?
দিল তো।
মোটেই দিল না। আমি মনে করি, মেয়েরা পুরুষের তুলনায় অনেক উন্নত মানুষ। তাদের অনেক কিছু করার আছে।
এমনকি বাবা অবধি আজ সকালে আমাকে বকাকি করে গেছে, জানো?
কী বলেছেন উনি?
বলেছে, আমারই নাকি দোষ। কেন সন্ধেবেলা আমি একা ফিরছিলাম, কেন আমি এত স্বাধীনচেতা, এইসব।
একা ছাড়া উপায় কি? আমাকেও কত রাতে একা ফিরতে হয়।
তোমার সম্পর্কে পাড়ার লোক তো কত কথাই বলে!
তুমি বলো না তো!
না, বীণাদি। আমি জানি, তুমি কত কষ্ট করে সংসার করছ। নিমাইদার সঙ্গে আমার খুব ভাব ছিল। নিমাইদা তোমার কথা কত বলেছে আমাকে।
কী বলেছে?
বলত তুমি নাকি বেহুলার মতো অনেক সাধ্যসাধনা করে তবে নিমাইদাকে শক্ত অসুখ থেকে ভাল করেছ। শ্বশুরশাশুড়িকে খাইয়ে পরিয়ে রেখেছ। তোমার খুব প্রশংসা করত।
পারুলের ঘোমটা টানা মা এবার বীণার দিকে চেয়ে বলল, নিমাই আমার ছেলের মতো। কী সুন্দর গলা। কত কীৰ্তন শুনিয়েছে আমাদের। তাকে দেখছি না কেন?
আছে।
তোমার কথা সত্যিই খুব বলত বাছা। এখন এ মেয়েকে নিয়ে কী করব বলো তো! সারা রাত কেঁদেছি। চোখের জল বোধ হয় ফুরিয়ে গেল। একটা পরামর্শ দাও তো মা।
বিয়ে যদি ভেঙে যায় তো যাক। ও নিয়ে ভাববেন না। পারুল গান গাইতে পারে?
খালি গলায় গায়। ভালই গায়।
ও সুস্থ হয়ে উঠুক, আমি কাকাকে বলে ওকে যাত্রায় ঢুকিয়ে দেবো।
যাত্ৰা! যাত্রা করলে কী হবে! বিয়েটার কথা ভাবছি।
বিয়ের কথায় বিরক্ত হল বীণা। বলল, দেখুন মাসিমা, এদেশে এখনও মেয়েরা নিজের ইচ্ছেয় বিয়ে করতে পারে না। তাদের কেউ পছন্দ করলে, দাদরিতে বনিবনা হলে তবেই বিয়ে।
তাই তো বটে।
লটারি খেলার মতো। বিয়ের জন্য বসে থাকলে মেয়েদের কিছু হবে? দেশভর্তি ছেলেগুলো সব বেকার, বিয়ে করবে কে? তারপর এই ঘটনা। বিয়ে নিয়ে ভাবছেন কেন?
তাহলে?
ওসব পরে ভাবা যাবে মাসিমা। আচ্ছা, পারুল, ওরা কারা ছিল জানো? কাউকে চিনতে পেরেছিলে?
পারুলের চোখের পাতা যেন একটু কাপল। একটা মেয়ে মিথ্যে কথা বললে অন্য মেয়ে তা যেন বুঝতে পারে। পারুল স্তিমিত গলায় বলল, না তো!
