মহেন্দ্রবাবু চলে গেলেন, কিন্তু বীণা ঘরে গেল না। মেয়েদের যে কত বিপদ, কত লোভ-লালসার নজরবন্দী হয়ে যে তাদের থাকতে হয় সে কথাই সে ভাবছিল টর্চ হাতে দাঁড়িয়ে।
আধা ঘন্টাও পার হল না, একটা শশারগোল উঠল। টর্চ হাতে এগিয়ে গেল বীণা। একটু এগোতেই দেখল, ছেলেরা ধরাধরি করে মাঠ থেকে তুলে আনছে পারুলকে।
ধর্ষিতা কোনও মেয়েকে এর আগে কখনও দেখেনি বীণা। আজ দেখল। খোলা দাওয়ায় শশাওয়ানো ঠাণ্ডা, রক্তাক্ত জ্ঞানহীন দেহ। কম্বল দিয়ে ঢাকা দেওয়া হয়েছে। মুখে গাজলা কাটছে। পারুলের মা, দিদি, ঠাকুমা কাঁদছে, ক্লাবের ছেলেরা তড়পাচ্ছে, মহেন্দ্ৰবাবু মাথায় হাত দিয়ে বসা। কিছু স্পর্শ করল না বীণাকে। সে শুধু পারুলকে দেখছিল। তার শরীরের ভিতর থকে একটা হলকা যেন বেরিয়ে আসতে চাইছে। রাগে, বিদ্বেষে, ঘেন্নায় যেন পাগল হয়ে যাচ্ছে মাথা। রাত এগারোটার পরও পাড়াসুষ্ঠু লোক এসে জুটেছে মহেন্দ্রবাবুর বাড়িতে। যেন একটা মস্ত পরব।
বীণার পিছন দিকেই একটা জটলা। মাঝবয়েসি কয়েকজন তোক চাপা গলায় কথা বলছিল। তাদের মধ্যে একজন বলল, মেয়েটাও সুবিধের ছিল না মশাই। রেপ কি আর অমনি হয়? এক হাতে তালি বাজলেই হল!
বীণা ঘুরে লোকটার মুখে টর্চের আলো ফেলল অভদ্রের মতো। বলল, আপনি কিছু দেখেছেন?
লোকটা চমকে উঠে বলল, কি দেখব?
আপনি পারুলকে দেখেছেন, রেপ হওয়ার জন্য ঘুরে বেড়াচ্ছিল?
নিজের কণ্ঠস্বরের তীব্রতা বীণাকেও চমকে দিল।
লোকটা একটু ভেরিয়ে হয়ে বলে, দেখার কী আছে। সবাই জানে।
বীণা এক পা এগিয়ে গিয়ে বলল, কি জানে?
সেটা কি আপনাকে বলতে হবে নাকি?
বীণা সটান লোকটার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল, হঁ। আমাকে বলতেই হবে। মেয়েটা খারাপ কি ভাল সে কথা পরে হবে, তার আগে বলুন রেপ করাটা ভাল না খারাপ?
লোকটা একটু ভড়কে গিয়ে বলে, রেপ ভাল তো বলিনি!
আপনি তো রেপ করাটাকেই সাপোর্ট করছেন। এই যে বললেন, এক হাতে তালি বাজে না। যেন মেয়েটাও রেপ হওয়ার জন্য মুখিয়ে ছিল। তাই বুঝি!
অন্য লোকেরা তাড়াতাড়ি মধ্যস্থ হয়ে যেতে দাও, যেতে দাও বলে লোকটাকে একটু দূরে সরিয়ে নিয়ে গেল। বীণার ইচ্ছে হচ্ছিল লোকটাকে জুডোপেটা করে।
ডাক্তার এল। কী একটু দেখেটেখে বলল, পুলিশে খবর দিয়েছেন? না দিয়ে থাকলে দেওয়া উচিত। আর হাসপাতালে রিমুভ করুন। থরোলি পরীক্ষা হওয়া দরকার।
পারুলকে যখন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তখন বীণা ঘরে ফিরে এল। দরজা বন্ধ করে বিছানায় বসে অনেকক্ষণ ধরে গরম শ্বাস ফেলল ফোঁস ফোঁস করে। বুক জ্বালা করছে। পারুলের সঙ্গে যে তার খুব একটা ভাব ছিল তা নয়। পাড়ার মেয়ে বলে চিনত। কিন্তু আজ পারুলের এই সৰ্বনাশ যেন পারুলের বন্ধু করে তুলল তাকে। দুনিয়ার যত ধর্ষিত নারীর জ্বালা যেন সে পেতে লাগল আজ রাতে।
কেন রেপ হবে মেয়েরা? কেন হবে? কেন তারা পুরুষের হাতে এরকম বেমক্কা লাঞ্ছিত হবে দুনিয়ার সব জায়গায়? কেন ফাঁসি দেওয়া হয় না ধর্ষণকারীদের?
খানিকক্ষণ ঘরের মধ্যেই উদ্ভ্রান্তভাবে ঘুরে বেড়াল বীণা। বড় অস্থির লাগছিল তার। তারপর হঠাৎ জ্বালা, রাগ, বিদ্বেষ উড়ে গেল। একা ঘরে তার হঠাৎ ভীষণ ভয় করতে লাগল। তার নিরাপত্তা বলতে তো কিছুই নেই। সামান্য এই ঘরখানা কত পলকা। ধর্ষণকারী তে ইচ্ছে করলে ঘরেই এসে তাকে আক্রমণ করতে পারে। যেমাঠের রাস্তায় আজ রেপ শুল সেখান দিয়ে তো তাকেও একা ফিরতে হয় মাঝে মাঝে। তা হল সেও কি একদিন পলের মতো শিকার হয়ে যেতে পারে?
এই ভয় এমন ঠাণ্ডা করে দিল তাকে যে, বীণা সারা রাত ঘুমমাতে পারল না। শীত পড়েছে, কিন্তু শরীরের এই ঠাণ্ডা বেই সে ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল।
পরদিন সকালে সে কাকার ঠেক-এ হাজির হল গিয়ে।
কাকা, একটা ব্যবস্থা করো।
কিসের ব্যবস্থা বীণা?
শোনোনি কাল রাতে পারুল রেপ হয়েছে?
কে পারুল?
মহেন্দ্রবাবুর মেয়ে।
কী মুশকিল! মহেন্দ্রবাবুটাই বা কে?
আমাদের পাড়ার।
তিনি তো বিখ্যাত লোক নন যে চিনব।
বিখ্যাত না-ই বা হল। আমি তো চিনি।
রেপ হল কি করে?
স্যাটিনি শো দেখে সন্ধেবেলায় ফিরছিল, তখন হয়েছে।
তার আমি কী ব্যবস্থা করব?
তার ব্যবস্থার কথা বলিনি। পারুলের ব্যবস্থা যা করার ডাক্তার আর পুলিশ করবে। ব্যবস্থা আসলে কিছুই হবে না। রেপিস্টদের চিনলেও পুলিশ ধরবে না। ধরলেও কেস ঝুলে থাকবে। আমি আমার ব্যবস্থার কথা বলছি। আমার আর ও-পাড়ায় থাকতে সাহস হচ্ছে না।
কাকা একটু হেসে বলে, অত ভয় পেলে চলবে কেন? রেপ তো হয়েই থাকে। তা বলে মেয়েরা তো আর ঘরে বসে নেই।
এটা কথা নয় কাকা। তুমি এমনভাবে বলছ যেন রেপটা জলভাত।
আরে, রাগ করছ কেন? শেফালি রেপ হয়েছে বলেই যে আর সবাই হবে তার কোনও মানে নেই।
শেফালি নয়, পারুল।
ওই হল। খোঁজ নিয়ে দেখ, হয়তো মেয়েটা ছেলেগুলোর সঙ্গে মিশত-টিশত। হয়তো একটু অ্যাডভেনচারাস টাইপের ছিল। সেই সব মেয়েই রেপ হয় যারা ওটা ইনভাইট করে।
বীণা ফুঁসে উঠল, কাল ঠিক এরকমই একটা কথা বলছিল একটা লোকতোমরা পুরুষমানুষেরা আসলে সবাই একরকম। তোমার কেন ধারণা হল যে, মেয়েটাই খারাপ?
আচ্ছা মানছি, মেয়েটা ভাল। কিন্তু রেপ হওয়ার মতো একটা পরিস্থিতি তো চাই। নইলে সব মেয়েই তো হত। তা যখন হচ্ছে না তখন ধরতে হবে–
দয়া করে চুপ করবে?
কেন, কী হল।
তুমিও ওই লোকটার মতোই খারাপ। শোনো কাকা, মেয়েরা সবাই জানে, পুরুষেরা কী রকম। সুযোগ পেলেই যে ভারা মেয়েদের হরির লুটের বাতাসা মনে করে তা আমি জানি।
