চয়ন উদ্বেগের সঙ্গে একটা শ্বাস ছাড়ল।
চারুশীলা আরও কিছু একটা গুরুতর এবং পাগুলে প্রস্তাব করতে যাচ্ছিল, ঠিক এমন সময় একটা মেয়ে ঘরে ঢুকে বলল, মাসি, আমি তোমাকে সারা বাড়ি খুঁজে বেড়াচ্ছি যে! এখানে বসে আছ!
ওঃ ঝুমকি! আমার যে কী বিপদ যাচ্ছে! চলো, ও ঘরে গিয়ে বসি।
ঝুমকিকেও চেনে চয়ন। তার দিকে চেয়ে চমৎকার দাঁতে ঝলমল করে হেসে বলল, ভাল আছেন চয়নবাবু?
সয়ন তটস্থ হয়ে বলল, আজ্ঞে হ্যাঁ।
ওরা উঠে যাওয়ার পর খানিকটা স্বস্তি বোধ করতে লাগল সে। এই খ্যাপাটে মহিলার সঙ্গ যদিও উদ্বেগজনক, তবু চারুশীলাকে কখনও অপছন্দও করতে পারে না চয়ন। অনেকটা এক ঝলক টাটকা হাওয়ার মতোই এসে সব ওলট-পালট
শনিবার সকালে খুব উদ্বেগের সঙ্গেই রওনা হল চয়ন। কলকাতার বাইরে সে কমই গেছে। সুন্দরবণ তার সম্পূর্ণ অচেনা রাজ্য। প্রথম প্রথম ভয়-ভয় করছিল। তারপর ট্রেনে হাজারো রকমের লোক দেখে তার মনে হল, মানুষ কত কাজে কত দিকে যায়, ভয়ের কী!
ভয় শুধু একটা। যদি হঠাৎ মাঝপথে অজ্ঞান হয়ে যায়। তার মৃগী রোগের তো কোনও সৌজন্য বোধ বা লজ্জা নেই। যেখানে সেখানে প্রকাশ ঘটে। এবারে অনেকদিন ঘাপটি মেরে আছে। হঠাৎ কখন যে লাফিয়ে পড়বে ঘাড়ে তার ঠিক নেই।
ক্যানিং পৌঁছে সে খোঁজ নিল। তারপর মজার নৌকো ভটভটিতে চেপে বসল। সাতার জানে না, তবু খুব একটা ভয় হচ্ছিল না তার। ভয় আসলে বসে আছে সামনের কোনও তীরবতী গ্রামে, হেমাঙ্গ সেজে। লোকটা এমনিতে ভদ্র ও সুজন। কিন্তু আজকের পর থেকে হেমাঙ্গ আর সুজন থাকবে না। তার কাছে। একটা লোকের সঙ্গে তার চিরবিচ্ছেদ ঘটবেই ঘটবে।
খুবই সাফল্যের সঙ্গে সে উদ্দিষ্ট গায়ের ঘাটে ভটভটি থেকে নামল। তারপর সামান্য খোঁজ নিতেই হেমাঙ্গর ঘরখানা খুঁজে পেল। নদীর ধারেই ঘর। একটু গাছপালা আছে। ফাঁকা ও সুন্দর জায়গায় ঘরখানা দেখেই ভাল লাগল। তার। বাঃ, বেশ তো! এরকম জায়গায় এসে থাকতে ভালই লাগার কথা।
উঠোনে ঢুকে চয়ন একটু গলাখীকারি দিয়ে মৃদু স্বরে ডাকল, হেমাঙ্গবাবু!
কেউ সাড়া দিল না। ঘরের দরজা বন্ধ।
হেমাঙ্গীবাবু কি আছেন?
আরও কয়েকবার ডাকার পর দরজাটা খুলে হেমাঙ্গ বেরিয়ে এল। তবে প্রথম দর্শনেই যেন চিনতে পারল না। কিছুক্ষণ অবাক চোখে চেয়ে থেকে বলল, আরে!
চয়নের পালানোর বা পিছোনোর উপায় নেই। সুতরাং সে দুপা এগিয়ে বলল, আমি চয়ন।
হেমাঙ্গ হঠাৎ হাসল। সমস্ত মুখটা উদ্ভাসিত হল সেই হাসিতে। বলল, ইটস এ প্লেজান্ট সারপ্রাইজ! আপনি এখানে কি করে এলেন?
চয়ন আমতা আমতা করে বলল, এদিকটা দেখা ছিল না। তাই—
সে তো বটেই। এটা বেড়ানোর মতো জায়গাও নয়। শহুরে মানুষের কাছে। কিন্তু আমি এখানে থাকি কে বলল তাপনাকে?
শুনলাম।
আসুন, আসুন।
ঘরে তেমন আসবাব কিছু নেই। বেশ নাড়া। একখানা তক্তপোশ, একখানা মোড়া এবং খুবই পলকা ধরনের একখানা টেবিল আর চেয়ার। চেয়ারে তাকে বসতে দিয়ে হেমাঙ্গ বিছানায় বসল। বলল, কিছু খাবেন?
না। একটু জল খেলেই হবে।
জলটা দিয়ে হেমাঙ্গ খুব স্বাভাবিক গলায় বলে, চারুদি আপনাকে পাঠিয়েছে, না?
বিষম খেয়ে সামলে নিয়ে চয়ন বলে, কথাটা কবুল করা বারণ।
হেমাঙ্গ হাসল, কবুল করতে হবে না। আমি জানি।
চয়ন গেলাসটা রেখে বলল, আমি আসতে চাইনি। উনি জোর করে
বুঝতে পারছি। তবু মন্দের ভাল। আপনার বদলে চারুদি এলে অবস্থাটা খারাপ হত।
উনি কিছু জানতে চান!
হেমাঙ্গ একটু মাথা নেড়ে বলে, তাও জানি। চারুদি অনেক কিছু জানতে চায়। কিন্তু কি জানাবো তাই যে আমি জানি!
চয়ন সভয়ে বলল, উনি খুব ইনসিস্ট্যান্ট।
আপনি বিয়ে করেছেন?
আজ্ঞে না।
হেমাঙ্গ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, বিয়ে ছাড়া মানুষের আর কিছু করার আছে কিনা তাই আমি জানতে চাই। আপনি কী বলেন।
আমি চয়ন একটু হাসল, আমি কিছু জানি না।
আপনি আজ আমার কাছেই থাকুন।
থাকব? কিন্তু—
থাকবেন। আপনাকে দেখে কেন যেন আমার ভাল লাগছে। কাল থেকে মনটা ভীষণ খারাপ ছিল।
০৫৮. ঘটনাটা ঘটল সন্ধেবেলায়
ঘটনাটা ঘটল সন্ধেবেলায়। খুব দূরেও নয়। পারুল বলতে গেলে বীণাপাণির খুব নিকট পড়শী, মহেন্দ্রবাবুর মেজো মেয়ে। একটু কেমনধারা যেন মেয়েটা। বড় খোলামেলা, সবসময়ে বোকার মতো হিহি হাসি। যখন তখন সিনেমায় যাবে। যাত্রা, জলসা কিছু বাকি রাখবে না। একটু ঢলানিও আছে।
পারুল ম্যাটিনি শো দেখে ফিরছিল। বড় রাস্তা থেকে মাঠের পথে নেমে বাড়ি ফিরছে, এমন সময় চারটে ছোকরা তাকে ধরে টেনে নিয়ে যায়। বেশি দূরেও নয়। মৈনুদ্দিনের বাঁশঝাড়ের পিছনে একটা পতিত জমিতে নিয়ে কাপড়জামা টেনে ছিঁড়ে খুলে ফেলে পারুলকে ছিবড়ে করে ফেলে রেখে গিয়েছিল তারা। মেয়েটার জ্ঞান ছিল না।
একটু রাতের দিকে চেঁচামেচি ডাক খোঁজ শুরু হল। বীণাপাণির বাড়িতেও খোঁজ করতে এলেন মহেন্দ্রবাবু।
পারুলকে দেখেছ বীণা? শুনছি সিনেমায় গিয়েছিল, এখনও ফেরেনি।
না তো কাকাবাবু, দেখিনি।
বড় ভয়ের কথা হল। রাত প্রায় দশটা বাজে।
বীণা তার টর্চ বাতিটা নিয়ে ঘরে তালা দিয়ে বেরিয়ে এল, চলুন তো দেখি।
দাঁড়াও। খড়ের গাদায় উঁচ খোজা হবে। পাড়ার ছেলেদের জানাবো না ভেবেছিলাম। এখন ভাবছি জানানোই ভাল। বড় ভয় হচ্ছে।
কিছু বলে যায়নি? দেরি হবে বলে কিছু বলেনি?
না। ম্যাটিনি শোয়ে গিয়েছিল। দেরি হওয়ার কথা নয়।
তা হলে ক্লাবের ছেলেদের খবর দেওয়াই ভাল।
