চয়নের ষষ্ঠ ইন্দ্ৰিয় নেই ঠিকই, কিন্তু সে ন্যালাখ্যাপাও নয়। দুইয়ে দুইয়ে চার হয় এই কাণ্ডজ্ঞান তার আছে। সে বুঝতে পারছিল এই আবেগতাড়িত মহিলা হেমাঙ্গকে বোধ হয় আদৌ অনুধাবন করেননি। একটি সুন্দরী ও শিক্ষিতা মেয়েকে তার ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে চাইছেন মাত্র এবং তাতে যে আত্মপ্রসাদ অনুভব করতে চাইছেন তার মধ্যে একটু অহংবোধ কাজ করছে। আমি যা বলব হেমাঙ্গ তাই শুনবে এরকম একটা কর্তৃত্বের ভাবও হয়তো আছে। চারুশীলা অত্যন্ত ভাল মহিলা। কিন্তু তিনি নিজের চশমায় দুনিয়াকে দেখেন। অন্যকে কমই অনুধাবন করার ক্ষমতা আছে। ওঁর।
চয়ন খুব বিনয়ের সঙ্গে বলল, বিপদ কেন বলছেন?
চারুশীলা চোখ বড় বড় করে বলে, বিপদ নয়? বিয়ে যদি ভাণ্ডুল হয় তা হলে সব দোষ যে আমার ঘাড়ে এসে পড়বে!
চয়ন খুব সমবেদনার গলায় বলল, তা-ই বা কেন? এই যে বললেন ওঁদের মধ্যে একটা আন্ডারস্ট্যান্ডিংও হয়েছে!
তা তো হয়েছে।
মাথা চুলকে চয়ন বলে, তা হলে ওঁরাই দুজনে ওঁদের সম্পর্কটা সর্ট আউট করবেন।
চারুশীলা বিস্মিত হয়ে বলে, মধ্যাস্থের বিপদ নেই বলছেন?
থাকার কথা নয়। ওঁরা তো অ্যাডাল্ট।
কিন্তু আমি যে ভীষণভাবে চাই, বিয়েটা হোক।
যদি হয়তো ওঁরাই সেটা ঘটাবেন। না ঘটলেও আপনাকে দোষ দেওয়ার কিছু নেই।
আপনি ভীষণ নেগেটিভ কথা বলেন। আচ্ছা আপনাকে ঠিকানা দিলে আপনি হেমাঙ্গর হাইড আউটটা খুঁজে বের করতে পারবেন?
আমি!
কেন, আপনার কি ভয় করবে?
চয়ন মহা ফাঁপরে পড়ে বলল, উনি যখন লুকিয়েই থাকছেন তখন সেখানে গিয়ে হাজির হওয়াটা কি ভাল হবে? উনি হয়তো রাগ করবেন।
হেমাঙ্গ তেমন রাগী মানুষ নয়। তা ছাড়া একটু রিস্ক তো নিতেই হবে!
উনি কি কলকাতায় থাকছেন না?
কবে আসছে, কবে চলে যাচ্ছে বুঝতে পারছি না। টেলিফোনে ধরতে পারলেও বেশি কথা বলতে চাইছে না।
আর রশ্মিদেবী কি ওঁর মনোভাব জানেন?
এখনও নয়। রশ্মি একটা রিসার্চ পেপার নিয়ে খুব ব্যস্ত। তবে মাঝে মাঝে হেমাঙ্গর সঙ্গে ফোনে কথা হয়।
চয়ন একটু হেসে বলে, তা হলে ভাবছেন কেন? ওঁরা তো সম্পর্ক রেখেই চলেছেন।
চারুশীলা খুব বিরক্তির গলায় বলে, তা রাখলেই বা লাভটা কি? হেমাঙ্গ যে আরও সময় চাইছে। অথচ রশ্মির হাতে যে মোটেই সময় নেই। বিয়েটা হয়ে গেলেই ও বিলেত চলে যাবে। এদিকে এই হাঁদারামটা বিলেত যেতে চাইছে না। আচ্ছা, এদেশে আছেটা কী বলুন তো! আইন নেই, শৃঙ্খলা নেই, ভিখিরি আর রোগভোগে ভরা, চারদিকে বিচ্ছিরি সব লোকজন, ধুলো, ধোঁয়া, এদেশে কিসের মধু? বিলেতে গেলে কত ভাল থাকতে পারবে। অথচ কিছুতেই যেতে রাজি হচ্ছে না। কী করে যে ওর মত করাই ভেবে পাচ্ছি না। ওকে যে গিয়ে একদিন ধরব তাও সময় পাচ্ছি না। আমার হাজব্যান্ড আসায় এখন বড ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে। তিন চার মাস বাদে আমরা ওর সঙ্গেই আবার কিছুদিনের জন্য বিদেশ চলে যাব। সেসব নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। আর ওই হাঁদারামটা আমার জন্য আর একটা প্রবলেম তৈরি করে রেখেছে। আপনি প্লিজ, আমাকে একটু হেল্প করুন না।
চয়ন বিপন্ন বোধ করতে লাগল। সে বুঝতে পারছে ভদ্রমহিলা পৃথিবীকে তাঁর নিজের মতো করে চালাতে চান। সে নিজে এঁর আজ্ঞাবহ হতে রাজি আছে। কিন্তু তাতে যে কী লাভ হবে তা বোঝবার সাধ্যই তার নেই। সে তবু বিনীতভাবে বলল, যে আজ্ঞে। হাইড আউটটায় গিয়ে আমার কী কাজ হবে তা যদি বলেন তো ভাল হয়।
আমি জানতে চাই ওখানে ও কী করছে। কেনই-বা ও-জায়গাটা ও পছন্দ করল। আরও জানতে চাই, ও বিলেত যেতে চাইছে না কেন এবং বিয়েটাই বা কেন পিছোতে চাইছে। পারবেন না জেনে আসতে?
চেষ্টা করতে পারি। কিন্তু আমাকে উনি হয়তো গুরুত্বই দেবেন না।
আপনাকেও খুব ভোলমানুষ বলে জানে। তা ছাড়া আপনি ইনোসেন্ট থার্ড পার্টি। আপনাকে বলতে ওর আপত্তি হবে না। শুধু মনে রাখবেন, আমি পাঠিয়েছি বলে যেন টের না পায়।
মানুষ তো আত্মহত্যাও করে, চয়নের এই অভিযান না হয় সেরকমই একটা কিছু হবে। মরিয়া হয়ে সে ঘাড় কাত করে দিয়ে বলল, ঠিক আছে।
চারুশীলা উজ্জ্বল হয়ে বলল, বাঁচালেন। কি ভাবে যাবেন বলুন তো? আপনি বরং আমাদের গাড়িটা নিয়ে শনিবার সকালে ক্যানিং চলে যান। সেখান থেকে বোধ হয় লঞ্চ ছাড়ে। জিজ্ঞেস করে করে চলে যাবেন। গাড়িটা ওখানেই থাকবে। কাজ সেরে ফিরে আসবেন।
চয়ন ম্লান একটু হেসে বলে, গাড়ি! গাড়ির কোনও দরকার নেই। ক্যানিং-এ অজস্র ট্রেন যায়।
ভ্রূ কুঁচকে চারুশীলা বলে, আপনি আমার কাজে যাচ্ছেন! আমার দায়িত্ব।
চয়ন বিনীতভাবে বলল, গাড়িতে সময় বেশি লাগবে। অকারণ অপচয়। কোনও দরকার নেই।
ঠিক আছে, তা হলে যাতায়াতের জন্য আমি আপনাকে এক হাজার টাকা দিয়ে দিচ্ছি।
চয়ন আতঙ্কিত হয়ে বলে, দশ বিশ টাকার বেশি লাগবে না।
আপনি কি ভিখিরির মতো যাবেন নাকি? রাস্তায় খেতেও তো হবে।
খেতে ধরুন আর দশ টাকা লাগতে পারে।
তবু রাখুন। পথে বেরোতে সব সময়ে বেশি টাকা সঙ্গে রাখতে হয়।
আপত্তি করা সত্ত্বেও চারুশীলা হাজার টাকাই গছিয়ে ছাড়ল। বলল, সবটাই খরচ করবেন। কৃপণের মতো হিসেব করবেন না। ট্রেনে অবশ্যই ফাস্ট ক্লাসে যাবেন।
লোকাল ট্রেনে ফাস্ট ক্লাস নেই যে।
ট্যাক্সি করে যাবেন তা হলে। যা খুশি করবেন, কিন্তু কিছু ফেরত দিতে পারবেন না।
শনিবারের তো এখনও দেরি আছে।
দেরি! কোথায় দেরি? মাঝখানে তো মোটে দুটো দিন!
