না, তা কেন? আসলে, এখানে ঠিক প্রাইভেসি নেই তো। লোকজন আসছে যাচ্ছে।
গড়চার বাড়িটা আমার আর ভাড়া দেওয়ার ইচ্ছে নেই। খালিও ফেলে রাখা যাচ্ছে না। তুমি সেখানে গিয়ে থাকতে পার। তবে একটা শর্ত আছে।
শর্ত! শর্ত কিসের?
তুমি এখনও ব্যাচেলর। তোমার পক্ষে একা থাকা বিপজ্জনক। তুমি বরং চট করে বিয়েটা সেরে ফেল, তারপর বউ নিয়ে ও বাড়িতে গিয়ে থাক।
আতঙ্কিত হেমাঙ্গ বলল, আমার ও বাড়িতে যাওয়ার আর কোনও ইচ্ছে নেই। বাবা। আমি এখানেই বেশ আছি।
দুৰ্গানাথ ছেলের অবস্থা দেখে হাসলেন, বিয়ের কথায় ভয় পেয়ে গেলে দেখছি।
আজ্ঞে আমি ওনাদের খুবই ভয় পাই।
শুনেছি। মহিলাদের সম্পর্কে তোমার একটু অ্যালার্জি আছে। নারীর প্রতি সম্মান, শ্রদ্ধা এবং তাদের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখা খুবই ভাল। কিন্তু আতঙ্ক থাকা ভাল নয়। তোমার এই স্বভাবের জন্য তোমার মা-ও কিছু চিন্তিত। থাকগে, তা হলে বিয়েটা করতে চাইছ না?
আজ্ঞে না।
গড়চার বাড়িটা বেশ বড়ই। ওপর নিচে বোধহয় সাত-আটটা ঘর। এতগুলি ঘর নিয়ে একাই থাকবে?
যে আজ্ঞে!
একা থাকা আমার খুবই প্রিয়।
দুৰ্গানাথ একটু হেসে বললেন, গড়চার গলির মধ্যে বাড়ি বলে তোমার বিবাহিত দাদারা কেউই ও বাড়িতে যেতে চাইছেন না। তাদের প্রত্যেকের নিজস্ব ফ্ল্যাটও ফাঁকা পড়ে আছে। বাধ্য হয়ে এখন তোমাকেই পাঠাতে হবে দেখছি। তা ওখানেই রান্নাবান্না হবে, নাকি এ বাড়িতে এসে খেয়ে যাবে! সকালের চা ইত্যাদি করে দেওয়ারও তো লোক চাই।
আজ্ঞে লোক রাখলে একা থাকার ব্যাপারটা নষ্ট হয়ে যায়। রান্না আমি নিজেই করে নেবো।
বলো কি? রান্না নিজে করে নোবে!
চেষ্টা করলে পারব।
পুরুষ মানুষ রাঁধে এ তো কস্মিনকালেও শুনিনি।
হেমাঙ্গ অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বলল, বাবা, দুনিয়ার যত বড় বড় হোটেলের ওস্তাদ রাঁধুনীরা সবাই পুরুষ।
দুর্গানাথ একটু হোঁচটি খেয়ে গেলেন এ কথায়। বললেন, তা বটে। খেয়াল ছিল না। মহাভারতের ভীমসেনও মস্ত রাঁধুনী ছিলেন। কিন্তু তুমি কি পারবে? সবাই সব কিছু পারে না। তোমার মা শুনলে তো মূৰ্ছা যাবেন। ভাল করে ভেবে দেখি।
আমি ভাল করে ভেবে দেখেছি। একা থাকব এবং নিজের সব কাজ নিজেই করে নেবো।
ঘর ঝাঁট দেওয়া, বাসনামাজা এসবও করবে নাকি?
ওসবের জন্য একজন ঠিকে লোক রাখলেই হবে।
তার দরকার নেই। বুড়ো দারোয়ান ফটিক আউট হাউসে থাকে। ও সব করে দেবেখন।
হেমাঙ্গ অবাক হয়ে বলে, ও বাড়িতে দারোয়ানও আছে নাকি?
ছিল না। বাড়ি খালি হয়ে যাওয়ার পর ফটিককে কারখানা থেকে ওখানে বদলি করেছি। পাহারা না রাখলে বিপদ। ফটিক বিশ্বাসী লোক, সে তোমাকে ডিস্টার্ব করবে না। ফটকের পাশে একটা কুঠুরি মতো আছে। একা মানুষ, সেখানেই দিব্যি থাকে। তোমার হঠাৎ একা থাকার বাই যে কেন উঠল কে জানে! শুনেছি তুমি কিছুটা বায়ুগ্ৰস্ত, সত্যি নাকি?
আপনাকে কে বলেছে?
তোমাকে যারা অহৰ্নিশ লক্ষ করে তাদেরই এরকম ধারণা।
হেমাঙ্গ সামান্য অভিমানী গলায় বলল, আমাকে অহৰ্নিশ লক্ষ করাটা কি সকলের উচিত? সেইজন্যই তো আমি একা থাকতে চাই।
তোমাকে লক্ষ করা হয় লক্ষ করার মতো কিছু আচরণের জন্যই। সেইসব আচরণ যদি একা থাকলে বেড়ে যায়?
আমি কি অ্যাবনরমাল বলে আপনার ধারণা?
দুৰ্গানাথ ঘন ঘন মাথা নেড়ে বলেন, আরে না না। অল্পবিস্তর অ্যাবনরমাল আমরা সকলেই। বাড়াবাড়ি না করলেই হল। আমি তো অত্যন্ত ব্যস্ত মানুষ, তাই সন্তানরা কে কেমন হল তা লক্ষও করি না, মাথাও তেমন ঘামাই না। এ ব্যাপারে যাবতীয় চিন্তা থেকে তোমাদের মা, কাকা আর দাদু আমাকে অনেকদিন আগেই রেহাই দিয়েছেন। তাই তোমরা আমার কাছে কিছুটা অচেনা রয়ে গেছে। সেইজন্যই কথাগুলো বলতে হল। আর একটা কথা, ও বাড়িতে যাওয়ার ব্যাপারে তোমার মা আর কাকার মতামত নেওয়াটাও দরকার।
হেমাঙ্গ জানে, সেটাই শক্ত কাজ। খুবই শক্ত।
মা শুনেই বলল, ওসব চিন্তা মাথা থেকে তাড়া। কিছুতেই তোকে আমি একা থাকতে দেব না। পাগল নাকি?
হেমাঙ্গকে আবার পিছোতে হল। হতাশ এবং ব্যৰ্থ। সে প্রাপ্তবয়স্ক, উপার্জনশীল এবং যোগ্যতাসম্পন্ন একজন মানুষ হওয়া সত্ত্বেও এ বাড়িতে তার প্রতি নাবালকের মতোই আচরণ করা হয়ে থাকে। বিশেষ করে মা। মায়ের কাছে থেকে সে কখনোই পূৰ্ণবয়স্ক মানুষের মর্যাদা আদায় করতে পারেনি।
মানুষের জীবনে নানা ধরনের দুঃখ থাকে। হেমাঙ্গর জীবনে এইটেইছিল সাংঘাতিক দুঃখ। মাথার ওপর এতগুলো অভিভাবকের ভার সে আর বহন করতে পারছিল না। নিজেকে তার মনে হত ইটচাপা ঘাস। বিবৰ্ণ, খৰ্বটে, ভবিষ্যৎ-হীন।
হঠাৎ হেমাঙ্গর ভাগ্যাকাশে পূর্ণচন্দ্রের উদয় হল। কিছুদিন বাদে খবর এল গড়চা বাই লেনের বাড়িটার একজন দাবীদার উঠেছে। লোকটা বলছে, তার কােকা মহিমবাবু বাড়িটা আদৌ ছাড়েননি, বরং তাকেই থাকতে দিয়ে গেছেন। বাড়ির তার কাকার ব্যবহৃত জিনিসপত্রও কিছু আছে।
কথাটা মিথ্যে নয়। বাস্তবিকই মহিমবাবুর খাঁটি আলমারি চেয়ার টেবিল ইত্যাদি কিছু জিনিস তাড়াতাড়িতে বিলিব্যবস্থা করা যায়নি বলে ফেলেই গেছেন তিনি। দুর্গানাথকে বলে গেছেন, ওগুলোর একটা গতি যেন তিনিই করেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেল, লোকটি সত্যিই মহিমবাবুর ভাইপো। সে পাড়ার লোক এবং একজন পাকা উঁকিলের সহায়তায় বাড়ি দখলের জন্য নানা হুজ্জত শুরু করে দিল। তালা ভেঙে ঢোকার চেষ্টাও হল একটা। পুলিশ এল, কিন্তু কেমন যেন গা-ছাড়া ভাব তাদের।
