আমি কিছু বুঝতে পারছি না।
চয়ন সময়োচিত গাম্ভীর্য এবং একটা দুঃখের ভাব মুখে ফুটিয়ে রাখার চেষ্টা করতে লাগল। কে কাকে বিয়ে করতে চায় বা চায় না। এটা নিয়ে এত মাথা ঘামানোর কী আছে সেটা সে জানে না। এদের সমস্যাও এত শৌখিন ও ফিনফিনে যে, সে অবাক না হয়ে পারে না। তার মতো সমস্যা তো এরা কখনও ভোগ করবে না। বিশ্বাসঘাতক এক শরীর নিয়ে সে যে টিকে আছে, প্রতি মুহূর্তে যার আশ্রয় হারানোর ভয়, যাকে প্রতিদিন হাজারো অভাবের সঙ্গে লড়াই করতে হয়, যে কখনও তার যৌবনকে টেরই পায় না, উপভোগ তো দূরস্থান। সুতরাং তার কাছে এসব সমস্যা অবান্তর ও বাহুল্য। মানুষ তার সঙ্গে হেসে কথা বললে, ভাল ব্যবহার করলে, সমবেদনা প্রকাশ করলেই সে ভীষণ খুশি হয়ে যায়, তার বুকে যেন পূর্ণিমার জ্যোস্না এসে পড়ে।
আচ্ছা, আপনার সিক্সথ সেন্স নেই?
চয়ন দুঃখের সঙ্গে মাথা নেড়ে বলে, আজ্ঞে না।
আপনি জ্যোতিষী জানেন?
আজেও না।
কিন্তু আমার যে এখন এরকম একটা কিছু দরকার।
চারুশীলা বিরক্তির সঙ্গে বলে, সে আমিও জানি। একজন বিখ্যাত জ্যোতিষীকে আমি হাত দেখিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আচ্ছা আমার হাজব্যান্ড কবে চাকরি পাবে বলুন তো, আর কি চাকরি পাবে? জ্যোতিষী অনেকক্ষণ দেখেটেখে বলল, আর দেড় বছরের মাথায় পাবে। কী চাকরি সেটা আর বলেনি। তখন আমার হাজব্যান্ড দুহাতে পয়সা রোজগার করছে।
চয়ন জ্যোতিষীদের ব্যর্থতার কাহিনী শুনে দুঃখিতভাবে বলল, তাহলে কি করা যায়?
চারুশীলা হঠাৎ তার মুখোমুখি একটা চেয়ারে ধাপ করে বসে বলল, আচ্ছা আমার কেন কেবলই মনে হয় বলুন তো, যে, আপনার বোধ হয়। সত্যিই ষষ্ঠ ইন্দ্ৰিয় আছে।
চয়নের একবার বলতে ইচ্ছে হল, সিক্সথ সেন্স আপনারই আছে, তাই বোধ হয় আমার ষষ্ঠ ইন্দ্ৰিয় টের পান। কিন্তু সেটা বলে ফেললে স্পর্ধার প্রকাশ হয়ে যেত। তাই সে আপাদমস্তক লজ্জিত হয়ে বলে, আজ্ঞে, আমি অতি সামান্য মানুষ। আমার কোনও ক্ষমতা নেই।
চারুশীলা তার এলো চুল অবিন্যস্ত হাতে পাট করতে করতে বলল, আপনার বিনয় ব্যাপারটা আমার একদম সহ্য হয় না। ওরকম বিনয় করবেন না তো! মেরুদণ্ডটা নুয়ে যাবে যে! একটু অহঙ্কারী হতে পারেন না?
কী বলবে তা ভেবেই পেল না চয়ন। অসহায়ভাবে শুধু বলল, অহঙ্কার!
অহঙ্কার না থাকলে পুরুষমানুষকে কি মানায়? মেয়েদেরও মানায় না। একটু অহঙ্কার থাকলে দেখবেন লোকে আর অবহেলা করতে সাহস পায় না। তবে অহঙ্কার করতে হলে বুদ্ধি চাই। অনেকে বোকার মতো নিজের গল্প নিজেই করে বেড়ায়। তাদের নিয়ে লোকে হাসোহাসি করে। ওরকম নয়, একটু মাথা উঁচু করে, নিজের ওপর বিশ্বাস আর শ্রদ্ধা রেখে এবং কাউকেই— সে যত বড়ই হোক না কেন, বেশি মাথায় উঠতে না দিয়ে যদি চলেন তা হলে দেখবেন সবাই আপনার ওপর মনোযোগ দিচ্ছে।
প্রকাশ্যে নয়, তবে সংগোপনে চয়ন একটি হতাশার শ্বাস মোচন করল।
আর শুনুন, আমরা কিন্তু আপনার বস নই, বন্ধু। আমার হাজব্যান্ড লেফটিস্ট, একটু কমিউনিস্ট মাইন্ডেড। উনি শ্রমের মর্যাদা জানেন। আমি অবশ্য ওঁর মতো নই, তবু আমি কোনও মানুষকেই সাফারিং আর বন্ডেড দেখতে ভালবাসি না।
চয়ন বিব্রত হয়ে বলে, তা জানি। আপনারা খুবই মহৎ।
ফের? ওরকম বললে আপনার সঙ্গে বন্ধুত্ব হবে কি করে?
আজ্ঞে, আর একটু সময় দিন।
হেসে ফেলল, বলল, সময় দিলে আরও বাজে লোক হয়ে যাবেন। মনোভাবটা শুধু পালটে ফেলুন। আপনি
আমার বাড়িতে এসে আপনার শ্রম ও মেধা দান করছেন। প্রাপ্য দক্ষিণা নিচ্ছেন। এর বেশি তো কিছু নয়।
যে আজ্ঞে।
এবার আমার সমস্যাটার কথা একটু বলুন। এভাবে তো বসে থাকলে হবে না। হেমাঙ্গ আমার রাতের ঘুম কেড়ে দুঙ্গু, আপনি পুরুষমানুষ বলেই জানতে চাইছি, ও আসলে কী চায়। আমি মেয়ে বলেই হয়তো এর ব্যাপারটা বুঝতে পারছি না।
চয়ন একটু সতর্কতামূলক নীরব থেকে বলল, হেমাঙ্গীবাবুর সঙ্গে আমার এতই সামান্য পরিচয় যে, ওঁকে ঠিক বুঝবার মতো সময় পাইনি।
তাই তো বলছি, আপনার ষষ্ঠ ইন্দ্ৰিয় কি বলে?
বিপন্ন চয়ন বলল, বরং আমাকে ওঁর ঠিকানাটা দিন, একবার গিয়ে ভাল করে আলাপ করে আসি।
মাথা নেড়ে বলে, তাতে লাভ নেই। ও একজন অপরিচিতের কাছে কি মনের কথা খুলে বলবে?
তা হলে কি করব?
সামনের শনিবার ওর হাইড আউটে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু কী হয়েছে জানেন! আমার হাজব্যান্ড অনেকদিন বাদে দেশে এলেন তো। এখন বড় বড় ক্লায়েন্টরা ঘন ঘন পার্টি দিচ্ছে। এমন সব ক্লায়েন্ট যাদের অ্যাভয়েড করা যায় না। আমার হাজব্যান্ডের অনারেই সব পার্টি। শনি রবি দুটোদিনই আমরা ভীষণ এনগেজড়। পরের উইক এন্ডেও।
প্রবলেমটা আমি অবশ্য ঠিক ধরতে পারিনি। হেমাঙ্গীবাবু কি বিয়ে করতে চাইছেন না?
সে তো কোনও পুরুষমানুষই প্রথমে চায় না। পরে সুড়সুড়ি করে গিয়ে পিড়িতে বসে। এটা একটু অন্য ব্যাপার। প্ৰেম, কিন্তু বিয়ে নয়।
এ সমস্যার সঙ্গেও চয়নের পরিচয় নেই। সে তবু অত্যন্ত সমঝদারের মতো মাথা নাড়ল।
চারুশীলা বলল, দেখুন, এটা একটা প্রেস্টিজ ইসু। যদি হেমাঙ্গ বিয়ে না করে তা হলে আমাদের মাথা কাটা যাবে। রশ্মির মতো মেয়েকে বিয়ে না করতে চাওয়াটাই একটা অবাক কাণ্ড।
চয়ন যদিও এ ব্যাপারে কিছুই জানে না, তবু হঠাৎ বলে ফেলল, হেমাঙ্গীবাবু আর কাউকে ভালবাসেন না তো!
বিস্মিত চারুশীলা কিছুক্ষণ চয়নের মুখের দিকে চেয়ে থেকে বলল, আর কাউকে? পাগল নাকি? ওর ভিতরে ভালবাসা জিনিসটাই নেই। মেয়েদের ভয় পায়, এড়িয়ে চলে। রশ্মির সঙ্গেও তো কিছু ছিল না। আমিই বলে-কয়ে ব্যাপারটা প্রায় ঘটিয়ে তুলেছিলাম। এখন কী হবে বলুন তো! আমার যে ভীষণ বিপদ!
