হ্যাঁ, মাকে আগে জিজ্ঞেস করে নিস। নইলে হিতে বিপরীত হয়ে বসবে।
পরদিন মায়ের মেজাজ ঠাণ্ডা বলে পটল কথাটা বলল, মা, দাদুর কাছে পড়া বুঝে নেবো?
রাঙা প্রথমটায় ভ্রূ কোঁচকাল, তোর দাদু আবার কি পড়াবে?
বাঃ, দাদু যে ইস্কুলে মাস্টারি করত।
রাঙা একটু তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলল, ওঃ ভারি তো মাস্টারি! গায়ের প্রাইমারি স্কুল। তা তোর ইচ্ছে হলে পড়িস।
পটল সোৎসাহে বইখাতা নিয়ে দাদুর কাছে হাজির হল, দাদু, পাড়াও, মা বলেছে।
দিন সাতেক যেতে না যেতেই পটল বুঝতে পারল তার মাথায় পড়া ঢুকছে। সে বুঝতে পারছে। অঙ্ক কষে যাচ্ছে, ভুল হচ্ছে না, কয়েকটা বাক্যরচনা লিখে স্কুলে বাংলা স্যারের তারিফ পেয়ে গেল।
দাদুর পড়ানোটা এত ভাল যে, পটল ভারি উৎসাহ পায়। দাদু কখনও বকে না, বা একথা বলে না যে, তোর দ্বারা হওয়ার নয়। দাদু কেবলই বলে, বাঃ, এই তো পারছিস, এই তো হচ্ছে। এমন কি ভুল অঙ্ক করলেও দাদু রাইট দিয়ে দেয়। তারপর খুব আদর করে ভুলটা ধরিয়ে আবার অঙ্কটা কষায়। তার যে হবে, তার যে হচ্ছে একথাটা দাদু ছাড়া কেউ এতকাল বলেনি।
একদিন অঙ্কের স্যার অবধি বাহবা দিয়ে বলল, বাঃ, আজ যে সবকটা অঙ্ক রাইট করেছিস!
০৫৭. চয়ন যখন পড়ায়
চয়ন যখন পড়ায় তখন বিভোর হয়ে পড়ায়। পড়ানোর মধ্যেই এক মাদকতা পেয়ে যায় সে। বিশেষ করে ছাত্র বঃ ছাত্রীটি ভাল পেলে। চারুশীলার দেবশিশুর মতো ছেলেটি সেদিক দিয়ে তার অতিশয় প্ৰিয়।
সন্ধেবেলা যখন ছাত্র আর মাস্টারমশাই মগ্ন হয়ে আছে ঠিক সেই সময়ে চারুশীলা অনেকটা স্বপ্নের ঘোরের মধ্যে অবিন্যস্ত পায়ে ঘরে এসে ঢুকল। এবং অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বেশ কষ্ট করেই যেন চয়নকে চিনতে পারল। তারপর ভ্রূ কুচকে হঠাৎ বলল, আচ্ছা, মেয়েটা কেমন বলুন তো?
চয়নকেও তার ঘোর থেকে বেরিয়ে আসতে হল। খুব অবাক হয়ে খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে বলল, কোন মেয়ের কথা বলছেন?
যেন একটু বিরক্তি বা ধৈর্যহীনতা স্পর্শ করল, কণ্ঠস্বরকে, আপনি কিছু মনে রাখতে পারেন না। আমি রশ্মির কথা বলছি!
চয়নের স্মৃতিশক্তি চমৎকার। তার মনে পড়ল। বাস্তবিক এদের বিরাট দলের সঙ্গে বনভোজনে গিয়ে সে এতই কৃতজ্ঞতা বোধ করেছিল যে বলার নয়। চারদিকে যেন মানুষ-বনস্পতি, আর সে যেন সামান্য তৃণ, তাই এইসব মহা মহা পুরুষ ও মহিলার প্রত্যেককে লক্ষ করেছিল সে। রশ্মিকে তার খুব মনে আছে। দলের মধ্যে সে ছিল সবচেয়ে কম কথা আর বেশি হাসির মেয়ে। দেখতে ভীষণ সুন্দর। তবে সে সৌন্দর্য উত্তেজক বা উত্তপ্ত নয়। একটু যেন শীতলতা মাখনো। হয়তো ক্লাসিক, কিন্তু এরোটিক কিছুতেই নয়।
খুব বিনয়ের সঙ্গে চয়ন বলল, দেখতে কেমন জিজ্ঞেস করছেন? দেখতে তো সুন্দরীই উনি। তবে উনি কেমন মানুষ তা তো জানি না।
আচ্ছা, আপনি কী বলুন তো! সিক্সথ সেনস নেই? মানুষকে দেখে কি কিছু বোঝা যায় না? মুখ নাকি মানুষের চরিত্রের দর্পণ!
চয়ন এই ছিটিয়াল, খামখেয়ালী ও অত্যন্ত উদার অর্থাৎ নানা বিপরীত গুণান্বিতা মহিলার সামনে খুবই কুণ্ঠিতহয়ে পড়ল। সে এক প্রায়-অচেনা মহিলা সম্পর্কে কী মতামত দেবে! কিন্তু না দিলেও কি ছাড়বেন চারুশীলা? সে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বলে, উনি তো মনে হয় অত্যন্ত বুদ্ধিমতী, রিজার্ভড্ আর অত্যন্ত ভদ্র।
তা হলে?
এ প্রশ্নে আবার বাক্যহারা হওয়ার কথা চয়নের। তবু সে কেবল মাত্র প্রতিধ্বনি করল, তা হলে?
তা হলে ওর সঙ্গে হেমাঙ্গর বিয়ের বাধা কিসের? কোথায় আটকায় বলুন তো! নিশ্চয়ই ওকে হেমাঙ্গর পছন্দ, তাই না?
এরকম একটা ক্ষীণ আভাস চয়নও পেয়েছে। সে অত্যন্ত উদারতার সঙ্গে বলল, হওয়ারই তো কথা।
আপনার কি মনে হয় না যে, ওরা মেড ফর ইচ আদার?
হয়।
চারুশীলা উজ্জ্বল হয়ে বলে, হয়? তাহলে আমি নিশ্চয়ই ভুল করিনি! আচ্ছা, আপনি কথা চেপে রাখতে পারেন?
চয়ন উদ্বেগের সঙ্গে বলে, এসব কি গোপনীয় কথা?
না, এসব নয়। আপনি বোধ হয় জানেন না, হেমাঙ্গ বিয়ের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। উইক এন্ডে কোথায় চলে যাচ্ছে।
হ্যাঁ, আপনি হেমাঙ্গীবাবুর হাইড আউটের কথা আমাকে বলেছেন। সামনের শনিবার সেখানে আপনার যাওয়ার কথা।
হ্যাঁ, বাঁকা মিঞার গ্রামে। সেখানে ও একটা বাড়ি কিনেছে। শুধু তাই নয়, করবে বলে অনেকটা জমি কেনার চেষ্টাও করছে। বাঁকা মিঞা হেমাঙ্গর এসব কাণ্ড দেখে ভয় পেয়ে মামাকে জানিয়ে গেছে। তখনই ওর হাইড আউটের কথা আমরা জানতে পারি। হেমাঙ্গকে কি আপনার পাগলাটে বলে মনে হয়?
না তো! উনি তো বেশ স্মাট আর ড্যাসিং।
ছাই জানেন। আসলে একটা হাঁদারাম। ওকে আমার মতো কেউ চেনে না। যখন এইটুকু ছিল তখন আমার সঙ্গে ছায়ার মতো ঘুরত। সারাদিন কেবল চারুদি আর চারুদি।
সেকথাও বোধ হয় একদিন বলেছেন।
বলেছি? ওটাই আমার দোষ। বলে ভুলে যাই। ডোন্ট মাইন্ড। এসব কথা কিন্তু খুব গোপন রাখবেন।
খুব বিনয়ের সঙ্গে চয়ন বলে, গোপনই থাকবে। বলার মতো আমার কেউ নেইও।
আচ্ছা, হেমাঙ্গ কেন পালাচ্ছে বলুন তো! ব্যাপারটা খুব পাজলিং এবং অস্বস্তিকরও। একটা মেয়ের সঙ্গে ওর একটা আন্ডারাষ্ট্যান্ডিং হয়েছে, গার্জিয়ানরা সবাই মত দিয়েছে, তা হলে ও পালাচ্ছে কেন বলতে পারেন?
না, চয়ন তা বলতে পারে না। কিন্তু সে কথা কবুল করাটা যে ঠিক হবে না। এ কাণ্ডজ্ঞান তার আছে। সুতরাং অত্যন্ত গভীরভাবে ব্যাপারটা যেন ভেবে দেখার একটা ভান করল সে। তারপর বলল, তাই তো!
