ইস্কুলে ঢুকেই সে পেট পুরে টিউবওয়েল থেকে জল খেয়ে নিল। তারপর জামায় মুখ মুছে ক্লাসে গিয়ে ঢুকল। মাথা বিমঝিম করছে। একটা বমি-বমি ভাব হচ্ছে।
সে শুনেছে, বড় জ্যাঠাও না খেয়ে বহু দিন ইস্কুলে গেছে। তখন এমন অবস্থা যে, রোজ ভাত রান্নাই হত না। জ্যাঠা শুধু পড়তই না, নিজের হাতে জমিতে লাঙল দিত, টিউশনি করত; জুতো জামারও জোগাড় ছিল না। জ্যাঠা পারলে সে পুকুর কেন? তবে একটু কথা, জ্যাঠা প্রতি পরীক্ষায় ফষ্ট হত, সে টেনমেনে পাস করে মাত্র। জ্যাঠার মাথা ছিল, তার নেই।
পড়াশুনোয় কেন যে সে মন দিতে পারে না তা বোঝে না পটল। যতবার কোমর বেঁধে জোর করে মন দিতে গেছে, কিছুক্ষণ পরেই টের পেয়েছে, তার মনে নানা আজেবাজে চিন্তা চলে আসছে। আনমনা হয়ে যাচ্ছে সে। এক পড়া চৌদবার পড়েও মুখস্থ হচ্ছে না।
আজও ইংরেজি কবিতা মুখস্থ বলতে গিয়ে ঠেকে গেল পটল। বেঞ্চের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে হল। অঙ্ক ক্লাসে একটা গাটা খেতে হল মাথায়। কেম ঝুটা ছিল ছিলের। ছিল সার নেই বলে দুটি হয়ে গেল আজ। বাড়িতে যখন ফিরল তখন শরীরটা বেশ লাগছে।
রান্নাঘরে গিয়ে ভয়ে ভয়ে দেখল, না, ভাত ঢাকা রয়েছে। উপোস থাকতে হবে না। হাতমুখ ধুয়ে এসে ভাত কটা গোগ্ৰাসে খেল সে। ঘরে গিয়ে দেখল মা আর গোপাল জড়োজড়ি করে ঘুমোচ্ছে। দৃশ্যটা বড় ভাল লাগে তার। মাকে সে বড্ড। মাও তাকে বাসে। তবু মাঝে মাঝে কী যে সব ঘটে যায়! গোপালটা তো অবোধ, ও যখন মার খায় তখন বড় কষ্ট হয় তার।
বিকেলে আজকাল বড্ড তাড়াতাড়ি সন্ধে হয়ে যায়। শীত পড়েছে খুব, কিছুক্ষণ মাঠে ফুটবল খেলে যখন ঘরে ফিরল পটল, তখন বাড়ির উঠোনে অন্ধকার জমে উঠেছে। বারান্দায় মুড়িসুড়ি দিয়ে দাদু বসে আছে। ঘর থেকে ঠাকুমার পাঁচালি পড়ার আওয়াজ আসছে যেন।
হাতমুখ ধুয়ে কুয়োতলা থেকে আসার পথে দাদুর কাছে একটু দাঁড়াল পটল, দাদু, কী করো?
এই তো বসে আছি। কী আর করব?
একটা গল্প বলবো?
দাদু একটু হাসে, আমার কোন গল্পটা তোর শোনা নেই। আমার স্টক ফুরিয়ে গেছে।
পুরনো গল্পই বলো না!
পড়তে বসবি না এখন?
বসবখন। গল্পটা আগে শুনে নিই?
তোর মা রাগ করবে। যে! আজি রেগে আছে।
কথাটা মানতে হল পটলকে। মা রেগে থাকলে সামান্য কারণেই বিরাট চোঁচামেচি লাগিয়ে দেবে।
তা হলে গল্প থাক। তোমার কাছে এসে পড়ব?
বিষ্ণুপদ একটু অসহায় গলায় বলে, সেও বুঝে সুঝে আসতে পারিস।
মা খুব রেগে আছে? দুপুরে কি ঝগড়া হয়েছে ফের?
বিষ্ণুপদ একটু হেসে বলে, ওসব শুনে তোর কি হবে?
মা দুপুরে খেয়েছে?
বোধ হয় না।
বাবা দুপুরে বাড়ি এসেছিল?
এসেছিল।
তখন কি ফের ঝগড়া হয়েছে দাদু?
সেসব শুনে কি করাবি?
পটলের বুক কাঁপছিল। সভয়ে বলল, খুব ঝগড়া হয়েছে নাকি? ফাটাফাটি?
ওই একটু কথা কাটাকাটি।
তুমি বাবাকে বাকো না কেন দাদু?
বকব? আমি তো কখনও কাউকে বকিনি।
কখনও না?
না। তোমার রাগ হয় না। দাদু?
বিষ্ণুপদ খুব হাসল, আমার বোধ হয় ওটাই একটা রোগ। কত কী রাগ করার মতো ঘটে। কিন্তু আমার কেন যেন রাগ হয় না। আমার রক্তটাই ঠাণ্ডা। তোর বাপ কাকা জ্যাঠাকে আমি কখনও শাসন-টাশন করিনি। যে যার মতো মানুষ হয়েছে।
পটল একটু চাপা গলায় বলে, বাবা যে মদ খায় দাদু, তুমি বারণ করো না কেন?
বারণ করলে কি শোনে? তবে বারণ করিনি তা নয়। এক-আধবার বলেছি। কিন্তু শোনেনি। রোখা চড়ে গিয়েছিল তো। দাদার সঙ্গে হিংসে করত। কিন্তু কৃষ্ণজীবনের সঙ্গে লেখাপড়ায় তো এঁটে উঠত না। তাই রাগে আক্ৰোশে নানা রকম করত। একবার রাগের চোটে ব্লেড দিয়ে নিজের হাত কেটে ফালা ফালা করেছিল।
বাবা ভীষণ রাগী, না দাদু?
পুরুষের রাগ নানা রকম হয়। রাগে কেউ নিজেকে মারে, কেউ আবার রাগের ঠেলায় কেষ্টবিষ্ট হয়ে পড়ে। রাগেরও নানা রকম আছে।
তোমার রাগ হয় না কেন দাদু?
তা কি জানি! আমার ভেতরটা সবসময়ে কেমন যেন ঠাণ্ডা। দেখ না, সবসময়ে নিষ্কর্মর মতো কেমন বসে থাকি। ভাবি এ সময়ে কত কাজও তো করতে পারতাম। ইচ্ছেই যায় না, আমি হলাম জড়ভরত। আমার মতো কখনও হোসনি দাদা, আমাকে দেখে শিখতে হয় কেমনটি হতে নেই।
পটল দাদুর কথায় হি হি করে হাসল।
বিষ্ণুপদ নিজেও হাসল, তোর কি মা-বাবাকে খুব ভয়?
রেগে গেলে ভয় করে। নইলে নয়। আর বাবা মদ খেলে কেমন যেন হয়ে যায়। কী সব খারাপ খারাপ কথা বলে।
ভাবিস না। তাড়াতাড়ি বড় হ। মা-বোপকে জুড়িয়ে দেওয়ার মতো কিছু কর, তা হলেই হবে। আমি আমার মা-বোপকে খুব ভালবাসতাম।
আমিও বাসি দাদু।
বাসবিই তো। বাসবারই কথা কিনা। তোর বাবাও বাসে। এত ভালবাসে যে তার জন্য কথা শুনতে হয়, তাও বাসে। দুনিয়ার ভাল-মন্দ আমি তেমন বুঝি না রে দাদু, তবে মনে হয়, মা-বোপকে ভালবাসলে মানুষের ভালই হয়।
জ্যাঠা তোমাকে কেমন বাসে দাদু?
কৃষ্ণ! সে তো ভালইবাসত। কিন্তু থাকতে পারল না তো কাছে। দূরের মানুষ হয়ে গেল।
আমার খুব জ্যাঠার মতো হতে ইচ্ছে যায়।
সে তো খুব ভাল কথা।
জ্যাঠা কি তোমার কাছে পড়ত?
তা পড়ত। প্রথম প্রথম আমি পড়া দেখিয়ে দিতাম। তারপর নিজেই পড়ত। মাথাটাই এত ভাল ছিল যে, পড়াতে হত না।
তা হলে তোমার কাছে আমিও পড়ি না কেন দাদু?
বিষ্ণুপদ একটু হাসল, আমি যে একসময়ে পড়াতাম তা আজকাল কারও মনেই নেই। আমিও সব ভুলে গেছি।
মাকে জিজ্ঞেস করে আমি এবার থেকে তোমার কাছেই পড়বা দাদু। তাতে বোধ হয় ভালই হবে।
