খিদে পেলে সবসময়েই ভাল ভাল খাবারের কথা মনে পড়ে। এই যে কিছুদিন আগে মামাবাড়ি গিয়েছিল তখন একদিন ছোটমামা তাকে আর গোপালকে নিয়ে গিয়ে হিং-এর কচুরি খাইয়েছিল একটা দোকানে। সেই স্বাদটা যেন এখনও জিবে লেগে রয়েছে, নাকে গন্ধটাও আসছে যেন। এখন সেই কচুরি পেলে কখানা খাবে পটল? গোটা কুড়ি উড়িয়ে দিতে পারবে না? খুব পারবে।
একমুঠো মুড়ি পেলেও এখন হত। কিন্তু মা নিয়ম বেঁধে দিয়েছে জিজ্ঞেস না করে কোনও খাবার জিনিসে হাত দেওয়া যাবে না। কিন্তু জিজ্ঞেস করাটাই এখন সমস্যা। মা আর বাবায় যেদিন খুব ঝগড়া হয় তার পর দিন দুই সময়টা ভাল যায় না তাদের।
ও দাদু!
বিষ্ণুপদ ওপাশের দাওয়ায় বসে হাঁ করে পেঁপেগাছের ডগার দিকেই চেয়ে ছিল বুঝি। দাদু যে সারাদিন কি করে এত বসে থাকতে পারে সেটাই পটল বুঝতে পারে না। বসে থাকে। আর চেয়ে থাকে। এ গায়ের অন্যসব দাদুরা তার দাদুর মতো নয়। তারা নাতিপুতির সঙ্গে খুব মেলামেশা করে, গল্প করে, বেড়াতে নিয়ে যায়, লাঠিপেটাও করে। তার দাদু যেন বড্ড দূরের মানুষ। কোথা থেকে বেড়াতে এসেছে, আবার চলে যাবে। দাদু এ বাড়ির একমাত্র লোক যার সঙ্গে কারও ঝগড়া নেই, তর্ক নেই। দাদুকে যে যা বলে মুখ বুজে সয়ে যায়।
দাদু সাড়া দিল না দেখে পটল ফের চাপা গলায় ডাকে, ও দাদু!
সাড়া নেই। বেশি জোরে ডাকাও যাচ্ছে না। মারা হয়তো ঘুম ভেঙে যাবে। দাদু বা ঠাকুমার ওপর মা মোটেই খুশি নয়। আড়ালে সবসময়ে রাগে গরগর করে। কেন যে রাগ তা বুঝতে পারে না পটল। দাদু ভালমন্দ খায় বলেই কি? এই যে তার বাবা সবসময়ে দাদু আর ঠাকুমার জন্য ভালটা মন্দটা নিয়ে আসে এটা কি খারাপ কাজ? দাদু আর ঠাকুমাকে একটুও খারাপ লাগে না পটলের।
পটল আর দাদুকে ডাকল না। সন্তৰ্পণে দাওয়া থেকে নামল, তারপর উঠোন পেরিয়ে সোজা ঠাকুমার ঘরে গিয়ে ঢুকল।
ও ঠাকুমা, এখনও ঘুমোচ্ছে যে?
নয়নতারা পাশ ফিরে বলল, এই উঠছি। কেন রে?
মা ওঠেনি। বড্ড খিদে পেয়েছে যে।
তোর মা ওঠেনি কেন?
মনে হয় উঠবে না। বাবার সঙ্গে রাতে ঝগড়া হয়েছে।
নয়নতারা একটু যেন কষ্ট করে উঠে বসিল, কোমরটায় রস নেমে এমন অবস্থা যে, শোয়া থেকে উঠতে গেলে প্ৰাণটা বেরিয়ে যায়। তা কি নিয়ে ঝগড়া হল আবার?
চালাক পটল সেটা ভাঙল না। বলল, তা জানি না।
ঝগড়ায় ঝগড়ায় সংসারটাই ঝাঁঝরা হয়ে গেল। গোপালটার মুখ তো দেখছি শুকিয়ে গেছে। আহা, অবোলা ছেলে। এইখন দেখ তো, তাকের ওপর কমলালেবু রাখা আছে, দুটা নিয়ে গিয়ে দুজনে খা। আমি ঠাকুর পূজাে সেরে রুটি করে।
কমলালেবুর ছিবড়ে কখনও ফেলে না তারা। সবটা গিলে ফেলে। জোটে অবশ্য খুবই কম। দুভাই গপগপ কমলালেবু খেয়ে ফেলল। কিন্তু একটু ভুল করে ফেলল। পটল। খোসাগুলো সময়মতো ফেলে দিয়ে আসেনি। মাদুরের ওপরেই রেখে দিয়েছিল জড়ো করে, পরে ফেলবে বলে। কিন্তু সময় পাওয়া গেল না।
হঠাৎ রাঙা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে থমকে দাঁড়াল, এসব কি?
এ মা তার রোজকার চেনা মা নয়। রেগে থাকলে তার মা একদম অন্য রকম। সবসময়ে ফুসছে, দাঁত কিড়মিড় করছে সামান্য কারণেই, ফেটে পড়ছে রাগে। এ মাকে পটল ভীষণ ভয় পায়।
সে ভয়ে ভয়ে বলল, আমি চাইনি, ঠাকুমা দিল।
দিল! বলে মা মুখ ভেঙচে হঠাৎ নিচু হয়ে তার চুলের মুঠি ধরে মাথাটা নামিয়ে ঠাস ঠাস করে কয়েকটা থাপ্পড় বসাল পিঠে। পিঠ জ্বলে গেল পটলের।
লজ্জা করল না। ওই লেবু হাত পেতে নিতে? কাঙালী না ভিখিরি? কতকালের উপোসী তুই যে হ্যাংলার মতো নিলি? যাদের জন্য সোহাগ করে এনে দিয়েছে তারাই গিলুক, তোদের অত নোলা কিসের?
পটলকে ছেড়ে গুম গুম করে গোপালের পিঠেও কয়েকটা কিল বসোল রাঙা। গোপাল কাঁদতে পারে না। শুধু বু বু করে কয়েকটা শব্দ করল মুখ দিয়ে।
দাওয়া থেকে নেমেই রাঙা কুয়োতলার দিকে চেয়ে চেঁচিয়ে উঠল, খবরদার আপনি কখনও আমার ছেলেদের হাতে কোনও কিছু দেবেন না। কালীর দিব্যি রইল। আমার ছেলেরা ভিখিরি নয় যে দয়া করে তাদের এঁটোকাটা খাওয়াবেন। নিজেরা ঘরে বসে যেমন গিলছেন তেমনই গিলুন, আমাদের ভাগবাটোয়ারার দরকার নেই।
নয়নতারা বড্ড হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। কিছুক্ষণ। তারপর মুখ কুলকুচো করে বলল, কি হল হঠাৎ? দুটো কমলালেবু দিয়েছি, তাতে দোষটা কি হল?
আপনাদের দোষ হবে কেন? আপনারা তো গৃহদেবতা। আর আমরা সব বানের জলে ভেসে এসেছি। খবরদার বলে দিলাম, আর কখনও ওদের দয়া দেখাতে আসবেন না।
পটল দেখতে পেল তার দাদুর চোখ। পেঁপেগাছ থেকে নেমে এসেছে। চেয়ে আছে তার দিকে। চোখ দুটো বড্ড করুণ।
এ বাড়ি ছেড়ে পটল একদিন পালাবে। গোপালকেও সঙ্গে নিয়ে যাবে। এ বাড়িতে বড় অশান্তি। কখন যে কার সঙ্গে কার লেগে যায় তার কিছু ঠিক নেই। জ্যাঠার মতো লেখাপড়া জানা থাকলে কত ভাল হত। জ্যাঠা এ বাড়ি ছেড়ে কবে চলে গেছে। ছোটকাকা গেছে। একদিন তাকেও যেতে হবে।
ঘণ্টা খানেক বাদে উনুনে আগুন ধরল। ভাত চাপিল। কিন্তু তখন আর সময় নেই। পটলের। ইস্কুল বসে যাবে। সে নিঃশব্দে উঠে পোশাক পরে বেরিয়ে পড়ল। কেউ পিছু ডাকল না, কেউ ডেকে বলল না, ওরে, দুটো খেয়ে যা।
ইস্কুলে যেতে যেতে কত কী ভোবল পটল। সে একটা জিনিস টের পায়, তাদের বড় পয়সার অভাব। অনেক টাকা পয়সা থাকলে তাদের এত অশান্তি হত না।
ইস্কুলে হেঁটেই যায়। পটল। সাইকেল নিলে বন্ধুরা চড়তে চায়। চড়তে গিয়ে সাইকেল এখানে ওখানে ফেলে দেয় বা এবড়োখেবড়ো মাঠে চালাতে গিয়ে টায়ারের বারোটা বাজায়। কিন্তু হাঁটতে গিয়ে খিদেটা আজ চড়ে যাচ্ছে।
