সেরকম দিন অবশ্য কমই আসে। অনেক সময় দিনটা অর্ধেক তার মনের মতো হল, বাকি অর্ধেকটা হল অন্য রকম। কিংবা সকালটা ভাল গেল, বিকেলটা মনমরা।
আজকের দিনটা কেমন যাবে তা বুঝতে পারছিল না পটল। লক্ষণ মোটেই ভাল নয়। সকালে মায়ের হাতে চড়াচাপড় খেয়ে ঘুম থেকে উঠেছে। উঠতেই মা ধাক্কা দিয়ে তাকে আর গোপালকে নামিয়ে দিয়েছে। চৌকি থেকে, যা, যা, বেরো।
রাতে খুব ঝগড়া হচ্ছিল মা আর বাবাতে। প্রায়ই হয়। কাল লাগল কমলালেবু আর আঙুর নিয়ে। এ বাড়িতে ভাল জিনিস যা আসে তা দাদুকেই সবটা দেওয়া হয়। দাদু। ইচ্ছেমতো খেয়ে কিছু বাঁচলে তারা ভাগজোখ করে প্রসাদ পায়। কাল সন্ধেবেলা বাবা কয়েকটা কমলালেবু আর এক থোলো আঙুর নিয়ে এসেছিল দাদুর জন্য।
রাতে ঘরের দরজা বন্ধ হওয়ার পর মা ফোঁস করল, অতগুলো লেবু আর আঙুর শ্বশুরমশাইয়ের হাতে দিলে, আমার ছেলে দুটো জ্বলজুল করে চেয়ে দেখল। খুব ভাল করলে সেটা? উনি তো অনেক খেয়েছেন, খাচ্ছেন, আমার ছেলে দুটো কি খায়? সময়ের জিনিস একটু দিতে হয় না। ওদের?
চুপ করো তো! ওদের সামনে অনেক খাওয়া পড়ে আছে। বাবা-মার তা নেই। বাপ-মায়ের আশীর্বাদের একটা দাম আছে।
ছাই আছে! উনি তো খান আর হাগেন। কী লোভী লোক বাবা। যা আনা হচ্ছে পেটে সইবে না জেনেও হামলে পড়ে রাক্ষসের মতো খাবেন। পরদিন থেকেই হাগা ছোটে। আশীৰ্বাদ না হাতি! নজরও ছোট বাবা, দুটো অবোধ শিশু চেয়ে থাকে, কখনও বলেন না, ওরে পটল, ওরে গোপাল, নে একটু খা।
মিথ্যে কথা বোলো না। বাবা-মা কখনও ওদের না দিয়ে খায়?
দিয়ে মোটেই খায় না। আগে খায়, তারপর তলানি, কিছু পড়ে থাকলে দয়া করে দেয়। তা আমন অচ্ছেদার জিনিস আমার ছেলেরা খাবে কেন? ওরা কি ভিখিরি? ওদের বাপের পয়সাতেই তো ভালমন্দ জুটছে!
পটল সভয়ে বুঝতে পারছিল, আবহাওয়া গরম হচ্ছে। তার বাবা যেদিন মদ না খায় সেদিন মাটির মানুষ। খেলেই ং। কপাল খারাপ, মাতাল না হলেও বাবা একটু নেশা করে এসেছিল। হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল, চুপরও বেয়াদব, বাপ-মাকে খাওয়াই নিজের পয়সায়, তোমার বাপের পয়সায় নয়। বেশি কথা কইলে মুখ ভেঙে দেবো।
মাও ছাড়বার পাত্রী নয়। বলল, মুখ ভাঙবে! ইস কত মুরোদ, বটতলার গুণ্ডারা তো কান ধরে ওঠবোস করায়। তখন বীরত্ব কোথায় থাকে?
কে ওঠাবোস করায়, বল ম্যাগী। কে ওঠাবোস করায়? কোন সুমুন্দির পুত?
জানি, সব জানি। ভগবান সইবে না বুঝলে, ভগবান সইবে না। দুটো দুধের শিশুকে বঞ্চিত করে রোজ তাদের চোখের সামনে গাপ গপি করে খাওয়া-এরও বিচার আছে।
আলবাৎ খাবে। একশবার খাবে।
তারপর ঝগড়া কতদূর গড়িয়েছিল তা আর পটল জানে না। সে ঝগড়া শুনতে শুনতেই ঘুমিয়ে গিয়েছিল। সারাদিন মাঠ-ঘাট চাষে, সাইকেল চালিয়ে, বাজারহাট করে, সাতার কেটে তার শরীর সন্ধের পরই ভেঙে আসে ঘুমে।
সকালে পিঠে পটাপট চাঁটি খেয়ে ঘুম ভাঙতেই বুঝতে পেরেছিল, ঝগড়াটা সারা রাত ধরেই চলেছে বোধ হয়। মারধরও হয়ে থাকবে, সে টের পায়নি।
কুমড়ায় দাঁড়িয়ে সে আর গোপাল কাঠকয়লার উড়ো দিয়ে দাঁত মাজছিল। ফটাকরি আর কাঠকয়লা পিষে মাজনটা মা-ই বানিয়ে দেয়।
দাঁত মাজতে মাজতে অবোধ ভাইটারর দিকে চেয়ে পটল বলল, আজ দিনটা খারাপ যাবে রে গোপাল। বউনি ভাল হয়নি।
গোপাল খুব গম্ভীর হয়ে দাদার দিকে চেয়ে থাকে। শুনতে পায় না, বলতেও পারে না। কিন্তু গোপাল বুঝতে পারে। সব বুঝতে পারে।
কুয়ো থেকে জল তুলে আগে গোপালের মুখ ধুইয়ে দেয়। পটল। তারপর নিজে মুখ ধোয়। সকালে জলখাবারের পাট আছে কিনা তা বুঝতে পারে না। মা রেগে গেলে রান্নাঘরের দিক মাড়ায় না। বেলা অবধি দেখে ঠাকুমা উনুন ধরাতে বসে। তখন আর জলখাবারের আশা থাকে না।
রান্নাঘর থেকে উনুনের ধোঁয়া বেরোচ্ছে না দেখে পটল নিরাশ হয়ে দাওয়ায় মাদুর পেতে পড়তে বসে গেল। বাড়িতে গোলমাল বাধলে বরাবর সে বই নিয়ে বসে যায়। তাতে তার ওপর হামলা কম হয়। পড়ার সময় গোপাল তার গা ঘেষে চুপটি করে বসে থাকে। রোজ পটল পড়ে, গোপাল কি তা বুঝতে পারে?
হ্যাঁ রে গোপাল, তুই কিছু বুঝতে পারিস? এই খাতা নে, তো একটা অ লেখ দিকিনি।
গোপাল খাতা নেয়, পেনসিলও নেয়। কিন্তু কী করতে হবে তা বুঝতে পারে না। পটলের দিকে চেয়ে থাকে শুধু।
পটলের বিশ্বাস, গোপাল একদিন ভাল হয়ে যাবে। লেখাপড়া করবে। তার আশা, একদিন এক সন্ন্যাসী এসে হাজির হবেন। লম্বা জটাজুট, হাতে ত্রিশুল। গোপালকে শিকড়বাকড় বা মাদুলি দিয়ে ভাল করে দিয়ে যাবেন।
গোপালকে আরও কাছে টেনে নিয়ে একটু আদর করে পটল। যে যাই করুক, সে কখনও গোপালকে মারে না, বকে না, অবহেলা করে না। নিজের ভাগ থেকে ওকে খাবার দেয়। পটল। পয়সা থাকলে মারবেল, ঘুড়ি বা লান্টু এনে দেয়।
খিদের চোট সামলানো মুশকিল। পেটে চনচন করছে খিদে, কিন্তু রান্নাঘরে কোনও নড়াচড়া নেই। ওপাশের ঘরের দাওয়ায় দাদু বসে আছে রোদে পা মেলে। ঠাকুমা এখনও ওঠেনি। ঠাকুমা উঠে দাঁত মাজবে, কাপড় ছাড়বে, ঠাকুর পুজো করবে, তারপর রান্নাঘরে গিয়ে বউমার খোঁজ নেবে। উনুন ধরবে তারও পর।
পটল চাপা গলায় বলে, তোর খিদে পায়নি গোপাল?
একথাটা যেন গোপাল বুঝতে পারল। একটা অদ্ভুত ঘোৎ ঘোৎ শব্দ করল। হঠাৎ এ শব্দের মানে শুধু পটল জানে। তার মানে, গোপালের খিদে পেয়েছে।
বাবা বাড়ি নেই। মা বোধ হয় ঘুমোচ্ছে। কী যে হবে!
