ওরে শোন, তোদের হয়তো আরও একটু সময় দেওয়া উচিত ছিল। মানছি। তবে কী জানিস, রশ্মি তো কিছুদিনের মধ্যেই বিলেত চলে যাবে। ওর হাতে সময় নেই। মেয়েটাকে আমি হাতছাড়া করতে চাইনি। এত ভাল একটা মেয়েটাকে হাতছাড়া করা কি উচিত? মাথা ঠাণ্ডা করে একটু ভাব তো!
আমার হয়ে সব ভাবনা তো তোরাই। আমার জন্য তো ভাববার মতো আর কিছু রাখিসনি।
রাগ করিস না। একটু ভাববার চেষ্টা করা। তোদের সম্পর্কটা হয়তো এখনও ততটা ম্যাচিওর করেনি। কিন্তু একদিন তো করবেই। সিচুয়েশনটা এমন হল যে, ম্যাচিওর করার জন্য অপেক্ষা করা চলে না। রশ্মির মা-বাবাও ওকে প্ৰেশার দিচ্ছে তাড়াতাড়ি ডিসিসন নেওয়ার জন্য। ওরা বিয়ে না দিয়ে রশ্মিকে ছাড়বে না।
সেটা ওদের ব্যাপার। তার জন্য আমাকে স্কেপগোট করছিস কেন?
স্কেপগোট! সে কী রে! তুই স্কেপগোট হতে যাবি কেন? তোর সেন্টিমেন্ট না-থাক, রশ্মির যে ভীষণ আছে। ও যে তোকে ভালবাসে সেটা বুঝতে পারিস না বুদ্ধ কোথাকার? ওর ভালবাসার দাম দিবি না?
হেমাঙ্গ ফের অথৈ জলে পড়ে গেল। ভালবাসার ব্যাপারটা সে খুব জোরের সঙ্গে অস্বীকারও করতে পারছে না।
তখনই সে বুঝতে পারল, তার কিছুদিন একটু তফাত হওয়া দরকার। গর-ঠিকানিয়া হওয়া দরকার। নিজের সঙ্গে বোঝাঁপড়া দরকার। কলকাতার সিস্টেমের মধ্যে থেকে নিজেকে ঠিকমতো বুঝতে পারে না সে।
আজ সকালে বাধের ওপর দিয়ে ধীর পায়ে হাঁটতে হাটতে সে গোটা ব্যাপারটাকে বারবার ভাবছিল। সপ্তাহের শেষে দুটি দিন, শনি আর রবি তার পক্ষে একটু বিপজ্জনক। প্রায় প্রতি শনি আর রবিতেই রশ্মিদের বাড়িতে তার নিমন্ত্রণ হচ্ছে। সে এড়াতেও পারে না।
কিন্তু তার মন ভরে যায় বিস্বাদে। রশ্মিকে তার অপছন্দ নয়, কিন্তু এত তাড়াতাড়ি ধরে-বেঁধে তাকে রশ্মির সঙ্গে যুতে দেওয়া হচ্ছে বলেই তার ভিতরটা শক্ত হয়ে উঠছে। উপরন্তু ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিলেত-বাস।
হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূর গেল হেমাঙ্গ। চারদিকে নিস্তরঙ্গ জীবন-যাপন, উত্তেজনাহীন প্রকৃতি, ধীর নৌকা, স্থির আকাশ ক্রমে মাথা থেকে দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগকে উড়িয়ে দিল।
বা দিকের নাবালে ক্ষেতখামার আছে বটে। কিন্তু সবুজের তেমন সমারোহ নেই। গাছপালা তেমন ঘনবদ্ধ নয়। এসব জায়গায় আগে হয়তো ঘন বন ছিল। বসত হয়ে জঙ্গল পিছু হটে গেছে।
অনেকটা হেঁটে বেশ খিদে পেয়ে গেল তার। ফিরে এল।
ফজল তার জন্য নাস্তা নিয়ে এল সকাল আটটা নাগাদ। রুটি আর আলুর তরকারি। ছেলেটা লাজুক এবং স্বল্পভাষী। কিন্তু মুখে একটি মিষ্টি হাসি লেগেই আছে। পরণে লুঙ্গি আর একটা পাঞ্জাবি। নিতান্তই কিশোরবয়স্ক।–
কোন ক্লাসে পড়িসা রে ফজল?
ক্লাস সিক্সে।
বয়স কত হল?
পনেরো ষোলো হবে।
পাস করিস ঠিকমতো?
ফজল খুব লজ্জাটজ্জা পেয়ে বলে, দুবছর ফেল মেরেছি।
ফেল মারিস কেন?
ফজল নিরুত্তর।
খাওয়া শেষ করে হেমাঙ্গ বলল, যখন আমি এখানে আসব তখন আমার কাছে বই নিয়ে চলে আসবি। পড়া তৈরি করিয়ুদেবো। বুঝেছিল?
জী।
বাসন নিয়ে ফজল চলে গেল। জানালা খুলে ফের নদী দেখতে বসে গেল হেমাঙ্গ। ভাবল, কি দরকার তার কলকাতায় পড়ে থাকার? এই যে সভ্যতাবর্জিত, বিজ্ঞানরহিত, প্ৰগতিবিহীন একটি গরিব গ্রাম, সে তো বাকি জীবনটা এখানেই কাটাতে পারে। এখানে সে আবার পুরনো দিনের মতো অরণ্য সৃষ্টি করবে, খামার করবে, চারদিকে গাছপালা নিয়ে তার মধ্যে বসবাস করবে। খারাপ কি? যদি বিয়ে করতেই হয় সে তো এখানকার একটি গোয়ো মেয়েকেই বিয়ে করতে পারে। বেশ তো হবে তা হলে। শহরের কত লোক পালাচ্ছে প্রকৃতির কোলে।
দুপুরে খাওয়ার সময় সে বাঁকা মিঞাকে বলল, শোনো বাঁকা, যদি এখানে আরও জমি নিতে চাই ব্যবস্থা করে দেবে?
আরও জমি? বাবুর দেখি মাথাটাই খারাপ হল। এখানে জমি নিয়ে করবেনটা কী!
বাঁকা খুব হাসল, সে তো ভাল কথা। কিন্তু শহরে থাকবেন আর এখানে জমিদারি পত্তন করবেন তা কি হয়? দিনকাল খারাপ। বেদখল হয়ে যাবে, লোকে পিছনে লাগবে।
তার জন্য তুমি আছো। ঠেকাবে।
এ গাঁ আপনার মাথাটা খেয়েছে।
এ গাঁ বলে নয়। আমার আর শহরে থাকতে ইচ্ছে হয় না।
কলকাতা এখন একটা নরককুণ্ড তা ঠিক। তবে এখানে চট করে একগাদা টাকা ঢেলে বসবেন না। ভাল করে ভাবুন। বাবুর সঙ্গেও পরামর্শ করুন। আপনার হল ছেলেমানুষী বুদ্ধি।
আমার ওপর তোমার বিশ্বাস নেই?
বাঁকা হেসে ফেলল, শোনো কথা! আপনারা কত বিদ্যে ধরেন, কত মাথা খাটান, দেশটা তো আপনার মতো লোকেরাই চালায়। তবে কিনা আপনার ক্ষতি হয়ে গেলে এই বাঁকার ঘাড়েই দোষ চাপবে। লোকে বলবে, আমিই আপনাকে এইসব বুদ্ধি দিয়েছি।
সেটা আমি বুঝব। তোমাকে কেউ দোষ দেবে না।
এ হল নোনা মাটির জায়গা। ফসল ভাল হয় না।
ফসলের জন্য মাথাব্যথা নেই। বড় গাছ তো হয়।
সব গাছ হবে না। তবে কয়েক ধরনের গাছ হয়।
আমি বড় গাছ করতে চাই। জঙ্গল।
সে তো মেলা জমি লাগবে। জঙ্গল রক্ষা করা কঠিন কাজ।
তবু তুমি জমি দেখা। সস্তা যেন হয়। এক লপ্তে অনেকটা।
০৫৬. এক-একটা দিন আসে
এক-একটা দিন আসে সকাল থেকে রাত অবধি যেন ভাল জিনিসে ঠাসা। সেদিন যেন সুখ একেবারে উপচে পড়তে থাকে। সকালে সূৰ্যটা যেন অন্য রকম করে ওঠে, পাখি যেন অন্য রকম করে ডাকে, সেদিন মা সকালের জলখাবারে দুটোর বদলে তিনখানা রুটি দিয়ে ফেলে এক চিমটির বদলে এক ডেলা গুড়, সেদিন ইস্কুলে মাস্টারমশাইরা একবারও বেত মারেন না, সেদিন গোপাল সারাক্ষণ আনন্দের নানা রকম শব্দ করে, বাবা সেদিন একটুও মাতাল হয় না, নপাড়ার ছেলেদের সঙ্গে সেদিন হঠাৎ ভাবসাব হয়ে যায়, সন্ধের পর আধখানা চাঁদ ঠিক যেন সোনার নৌকোর মতো আকাশে ভেসে ভেসে বেড়ায়, বারান্দায় বসে দাদুর কাছে সেদিন ভারি চমৎকার একখানা রূপকথার গল্প পেয়ে যায় সে।
