হেমাঙ্গ গম্ভীর হল। কিংবা গাম্ভীর্যের মুখোস পরল। বলল, তোমরা কি বিয়ের কথা বলছে মা? কিন্তু আমি তো এখনও মনস্থির করিনি।
দুর্গানাথবাবু একটু অবাক হয়ে স্ত্রীর দিকে তাকালেন।
মা বলল, ওরে, অত লজ্জা পেতে হবে না। লাভ ম্যারেজ বলে কি আমরা কেউ কিছু আপত্তি করেছি? দিনকাল পাল্টেছে, এখন যুগের হাওয়া মেনে নিতে হবে বৈকি। মেয়েটাও ভারি চমৎকার।
হেমাঙ্গ দৃঢ়তার সঙ্গে বলল, মা, আমি কিন্তু মতামত এখনও দিইনি। আমাকে ভাববার সময় দাও।
দুর্গানাথবাবু অবাক হয়ে বললেন, ভাববে! ভাববে কি? তারা যে প্রস্তাব দিয়ে ফেলেছেন! চারু তো বলে গেছে, তোমার নাকি খুবই মত আছে।
চারুদিদি ঠিক কথা বলেনি।
দুর্গানাথবাবু ফের স্ত্রীর দিকে তাকালেন, কী বলছে এ?
মা বিরক্ত হয়ে বলল, তুমি মিটিঙে যাও তো। আমি সব বুঝে দেখছি।
দুর্গানাথবাবু একটু তাড়াহুড়ো করেই বেরিয়ে গেলেন। সংসারের সাতপাচের মধ্যে তিনি বিশেষ থাকতে চান না কখনও। তারপর মা ধরে পড়ল তাকে, কী হয়েছে বল তো! চারু বলছে তোর নাকি ও মেয়ের সঙ্গে খুব ভাব। পাত্রীর বাড়ির লোকেও বলছে তোদের নাকি বোঝাঁপড়া হয়ে গেছে। তাহলে আবার ওসব বলছিস কেন?
মা, বাঙালি ছেলেদের তো বিয়ে করা ছাড়া আর কোনও অ্যাচিভমেন্ট নেই। তা আমার সেটা হয়ে গেলে জীবনে আর কী থাকবে বলো!
বিয়ে করা ছাড়া আর কিছু থাকবে না কেন?
আর কী বলো তো! বাঙালিদের প্রেম হল সবচেয়ে বড় অ্যাডভেঞ্চার আর বিয়ে হল মস্ত কীর্তি। ব্যস জীবনের সব সার্থকতা হয়ে গেল।
কথা ঘোরাচ্ছিস! কী হয়েছে আমার চোখের দিকে তাকরিয়ে বল তো। মেয়েটার সঙ্গে ঝগড়া করেছিস নাকি? সে যে বড় ভাল মেয়ে। বিলেত-ফেরত বলে মনেই হয় না। সহবন্ত জানে খুব।
একটু অধৈৰ্য হয়ে হেমাঙ্গ বলে, রশ্মি খুব ভাল মেয়ে। তাকে বিয়ে করতেও আমার আপত্তি থাকা উচিত নয়। তবে আমার একটু সময় চাই।
সময়? সে মেয়ে যে আর কমাস পর বিলেত চলে যাবে। তার নাকি সেখানেও আরও কী সব পড়াশুনো করার আছে, চাকরিও পাকা। ওর বাপ-মা এবার ওকে একা ছাড়বে না, বিয়ে দিয়ে বরের সঙ্গে পাঠাবে।
সেটা ওদের দিককার কথা। ওরা যা বলবে তা-ই আমাকে করতে হবে নাকি? আর এখন আমি বিলেত গেলে তোমার মন খারাপ হবে না বুঝি? যখন গিয়েছিলাম তখন তো প্রতিটি চিঠিতে ফিরে আয়, ফিরে আয়।
মা হাসল, সে তখন একা ছিলি বলে। এখন তো তা নয়। বউ সঙ্গে থাকবে।
হেমাঙ্গ কথা খুঁজে পাচ্ছিল না। শুধু বলল, আমাকে বিলেত যেতে হবে কেন তা-ই তো বুঝতে পারছি না। বিলেতে থাকা আমার পছন্দ নয়। ওদের সেটা ভাল করে বুঝিয়ে দাও।
মা চোখ কপালে তুলে বলে, বোঝাঁপড়া তো তোরাই করেছিস। আমরা এর মধ্যে মতামত দিতে গেলে কি ভাল দেখায়? যা বলার সে তো তু-ই ওদের বলতে পারিস। কে কোথায় থাকবি না-থাকবি তা কি আমরা জানি?
হেমাঙ্গ এত অসহায় বোধ করতে লাগল যে আর কোনও কথাই বলতে পারল না। রশ্মির সঙ্গে তার একটা ভাবপ্রবণ সম্পর্ক গড়ে উঠতে না-উঠতেই যে সেটা বিয়ের দিকে এত তাড়াতাড়ি গড়িয়ে যাবে এ তো সে স্বপ্নেও ভাবেনি। সবাই কেন ধরেই নিল যে, সে বিয়েতে রাজি? একটা মতামত জিজ্ঞেস করারও কেন কেউ প্রয়োজন বোধ করল না? কেন রশ্মিও নয়?
বিডন স্ট্রিট থেকে সে উদভ্ৰান্তের মতো গরচায় ফিরে এল। বুঝতে পারল, তারা মাথা কাজ করছে না। তার মন অত্যন্ত চঞ্চল। সে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না।
রূকুরুদুল্লা নিজেই চারুশীলাকে ফোন করে বলল, তুই কী কাও করল বল দেখি।
কি করেছি?
রশ্মির আর আমার মধ্যে কেবলমাত্র বন্ধুত্ব ছিল। সেটাকে রোমান্টিক করে তুললি কেন বল তো! শোন, ইয়ার্কি করিস না। ইয়ার্কির সময় এটা নয়।
চারুশীলা সাবধানী গলায় বলল, কেন, কি হয়েছে?
আজ বিডন স্ট্রিটে গিয়েছিলাম। বাবা ডেকে পাঠিয়েছিল। ওখানে ফর্মাল বিয়ের প্রস্তাব গেছে। আর সেটা আমাকে না। জানিয়েই।
তাতে দোষটা কি হয়েছে? আমন সিরিয়াস হচ্ছিস কেন?
হবো না? বিয়ে করব আমি, আমাকে সেটা জানানোই হল না। বিয়ের পর আমি কোথায় থাকব না-থাকিব, ভারতে না বিলেতে তাও সব আমাকে না জানিয়েই ঠিক হয়ে যাচ্ছে! আমাকে কি পেয়েছিস তোরা?
সরি। কিন্তু তোকে নেগলেক্ট করে এসব করা হয়নি রে। আসলে সবাই ধরে নিয়েছে যে, বিলেতে থাকতে তোর আপত্তি হবে না।
সেটা কে ধরে নিল?
চারুশীলা একটু চুপ করে থেকে বলল, রশ্মি আমাকে বলেছিল, বিলেতে থাকা তোর পছন্দ নয়। তখন আমি বলেছিলাম যে, তোকে আমিই রাজি করাব।
বিলেতে থাকার প্রশ্নই ওঠে না। তারও আগে প্রশ্ন আছে। আমি বিয়ে করতে রাজি একথা আমি এখনও বলিনি।
সব কথা কি বলতে হয়? বোঝা যায় না?
ভুল বুঝেছিস।
মোটেই ভুল বুঝিনি। রশ্মি অত সস্তা মেয়ে নয় যে নিজেই বানিয়ে ওসব কথা বলবে।
রশ্মি কি বলেছে?
বলেছে, তোদের মধ্যে একটা আন্ডারাষ্ট্যান্ডিং হয়েছে।
ওটাকে আন্ডারস্ট্যান্ডিং বলে না। আমাদের সম্পর্কটা এখনও ভাল করে শুরুই হয়নি। উই আর স্টিল ওনলি ফ্রেন্ডস।
শোন লক্ষ্মী ভাই আমার, তোর ইগোতে একটু লেগেছে বুঝতে পারছি। কিন্তু ওটুকু ক্ষমা-ঘেন্না করে নে। রশ্মি যে ভীষণ ভাল মেয়ে তা তো জানিস। এ মেয়েটাকে কিন্তু ডিচ করিস না। প্লীজ!
ডিচ করব কেন? আমি তো কোনও কথা দিইনি। আমাকে কি জিজ্ঞেস করা উচিত ছিল না একবার?
ছিল। একশবার ছিল। কিন্তু তোর হয়ে আমিই যে সব বলে দিয়েছি।
সেটা বুঝতে পারছি। তুই সাজাতিক ভুল করেছিস।
