কেন বাঁকা মিঞা, পারব না কেন?
আপনার হল শখের থাকা। শখ তো দু-চার দিনের। তারপর আর গাঁ ভাল লাগে না।
হেমাঙ্গ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, দেখা যাক।
দেখুন। আপনারা এরকম মাঝে-মধ্যে এসে থাকলেও এদিককার লোকের ভাল হয়। তারা বল-ভরসা পায়। বাবুরা আসে না বলেই তো আমাদের দুঃখ।
বাবুরা এসে কি করবে?
কিছু করতে হবে না। আমাদের কোন তেপান্তরে বাস দেখছেন তো! এখানকার লোক ভাবে, আমরা বুঝি জন্তুই,…মনিষ্যি নয়। এ গায়ে গত পাঁচসাত বছরের মধ্যেও কোনও এম এল এ আসেনি, মন্ত্রী তো দূরস্থান। এখানকার সবচেয়ে বড় ভি আই পি হলেন পাশের গায়ের হাই স্কুলের কয়েকজন মাস্টারমশাই। তারাও তেমন কেষ্টবিষ্ট নন, এখানকারই লোক সব। আপনাদের আনাগোনা হলে আমাদের একটু কেমন যেন ভরসা হতে থাকে। সেটা যে কেমন তা বোঝানো যায় না।
দুধটা সত্যিই ভাল। অভ্যাস নেই বটে, কিন্তু খেতে বেশ লাগল।
বাঁকা মিঞা বলে, গেলাসটায় একটু জল ঢেলে তলানিটা খেয়ে নিন।
কেন?
দুধের পাত্ৰ-ধোওয়া জল খেলে খুব পোস্টাই।
হেমাঙ্গ এই গ্ৰাম্য সংস্কারের কথা শুনে হাসল। তবে খেলাও। হোয়েন ইন রোম, বিহেভ লাইক রোমানস।
দুপুরে কী খাবেন?
বেশি আয়োজন কোরো না। তোমরা যা খাও তা হলেই আমার হবে।
চালটা কি একটু মোটা ঠেকছে?
খারাপ লাগছে না।
মোটা চালের ভাত খেতে আপনাদের অসুবিধে হয়, কিন্তু এখানে মোটা চাল ছাড়া পাওয়া যায় না। সরু চাল খেতে হলে সেই সন্দেশখালি বা সোনাখালি যেতে হবে।
না না, তার দরকার নেই। আমার খেতে কোনও কষ্ট হচ্ছে না।
বাঁকা মিঞা একটু হাসল, আপনার দেখছি এ জায়গার ভূতে পেয়েছে। সবই ভাল লাগছে। এখানেই আমার হাড়ে ঘুণ ধরল, কিন্তু কই ভাল কিছু তো দেখলাম না। এ হল মরা জায়গা। যা ছিল তাই আছে। এ জায়গার কোনও উন্নতিও নেই, অধোগতিও নেই। অধোগতির আর আছেটাই বা কী বলুন, তলানিতে এসে ঠেকেছি, পাছবেড়ায় পিঠ।
তবু তো আগেকার মতো কলেরা বসন্তে গা কে গা সাফ হয়ে যাচ্ছে না। সেটাও তো একটা ভাল লক্ষণ।
তা যা বলেছেন। কলেরা-টলেরা হয় না। আজকাল। টিপকল হয়ে ইস্তক হচ্ছে না। কিন্তু বেঁচে থাকাটাও যে মরার মতোই হচ্ছে। ধুকতে ধুকতে টিকে থাকাকে কি আর বেঁচে থাকা বলে? বেড়াতে বেরোবেন নাকি?
নদীর ধার দিয়ে একটু হেঁটে এলে হয়।
তাহলে বেরিয়ে পড়ুন। ডান ধারে যাবেন না, ওদিকটায় লোকে হাগে। বা ধারে একখানা মেটে বাঁধ আছে, অনেক দূর অবধি গেছে। ওদিকটা তত অপরিষ্কার নয়। তবু সাবধানে যাবেন। বাঁধের ওপর রাস্তা আছে। লোক চলাচল আছে।
ঘরে তালা দিতে হবে নাকি?
না দিলেও হয়। তবে ভেজিয়ে রেখে শেকলটা তুলে দিয়ে যাবেন। কুকুর-টুকুর ঢুকে পড়তে পারে।
এই বলে বাঁকা মিঞা চলে গেল। হেমাঙ্গ পোশাক পরে ঘরে শেকল দিয়ে বেরিয়ে পড়ল। রোদ উঠেছে বটে, কিন্তু নদীর ওপর দিয়ে কনকনে বাতাসও আসছে। বাঁধটি চমৎকার। উঠে দাঁড়ালে নদীর বাকিটা বহু দূর অবধি দেখা যায়। জলে রুপোলি রোদুর খেলা করছে। উজান-ভাটেনে ভটভটি, নৌকো চলছে মন্থর গতিতে।
বাঁধের ধারেও মানুষ প্রাকৃতিক কোজ সারে। দমকা হাওয়ায় মাঝে মাঝে দুর্গন্ধ আসছে। নাকে রুমাল চাপা দিতে ইচ্ছে হল তার। আবার ভাবল, এসব সয়ে নেওয়াই ভাল। অত শুচিবাই হলে চলবে না।
এই অজ্ঞাতবাসের কথাও যে জানাজানি হয়ে যাবে তা হেমাঙ্গ জানে। হয়তো জানাজানি হয়েও গেছে এতক্ষণে।
এক রবিবার রাত্রে রশ্মির সঙ্গে তার যে প্রগাঢ় সংলাপ হয়েছিল টেলিফোনে সেটাই হেমাঙ্গকে এত দূর ছুটি করিয়েছে। উইক ডে-গুলো তত ভয়ের নয়। ভয় হল শুক্রবার বিকেল থেকে রবিবারের রাত অবধি। রশ্মির বাড়ি থেকে নিমন্ত্রণের পর নিমন্ত্রণ আসছে আজকাল। পার্টি হচ্ছে ঘন ঘন। বিয়ের কথাটা খুব স্পষ্টভাবে ওরা উচ্চারণ করছে না হেমাঙ্গর সামনে।
কিন্তু বিডন স্ট্রিটের বাড়িতে প্ৰস্তাব গেছে এবং হয়েছে।
স্বয়ং বাবাই ডেকে পাঠালেন এক রবিবারে। অতি ব্যস্ত ও অন্যমনস্ক মানুষ। অনেক কথা খেয়াল রাখতে পারেন না। সেদিনও তার কোথায় যেন একটা জরুরি মিটিং ছিল। হেমাঙ্গকে দেখে বেশ ব্যস্তসমস্ত হয়ে বললেন, ওরা এসেছিল। তা ভালই তো। সবই তো ঠিক আছে। তুমি কি বলো?
বিনা ভূমিকায় এরকম কথা বললে যে তার কোনও মানেই দাঁড়ায় না সেটা দুৰ্গানাথবাবুর মাথাতেই ছিল না। তিনি বোধ হয় মিটিঙের জরুরিতর বিষয়টি নিয়েই ভাবছিলেন।
হেমাঙ্গ অবাক হয়ে বলে, কিসের কি ঠিক আছে। বাবা?
দুর্গানাথবাবু ছেলের প্রশ্নটি অনুধাবন করতে পারলেন না। অত্যন্ত উদারভাবে বললেন, আমি অবশ্য আমার ছেলেমেয়েদের কেউ বিদেশে বসবাস করুক চাই না। কিন্তু কী আর করা যাবে! তবে আমি মনে করি ছেলেমেয়ে হলে তাদের আর বিলেতে রেখে না। অন্তত স্কুলিংটা এদেশে হলে ভাল হয়। মাতৃভাষাটাও শেখা হয়ে যাবে। তারপর মাধ্যমিক পাস করলে না হয় আবার ফিরে গিয়ে হায়ার এড়ুকেশন ওখানে নেবে। কি বলো?
হেমাঙ্গ একেবারেই বুঝতে পারছিল না তা নয়। সে অন্তত এটা বুঝতে পারছিল যে, তার ব্যস্ত বাবা ডিটেলসে না গিয়ে, ভূমিকা না করে শুধু স্যালিয়েন্ট পয়েন্টগুলো বলে যাচ্ছেন। বেশি কথায় সময় নষ্ট হয়।
হেমাঙ্গ অবাক হওয়ার ভান করে বলল, আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।
দুর্গানাথবাবু বিরক্ত হয়ে বললেন, সেরকমই তো সব ঠিক হয়েছে শুনলাম। আমরাও তো মত দিয়েছি।
ঠিক এই সময়ে মা এসে ঘরে ঢুকল। মুখে বেশ একটু হাসি-খুশি ভাব। উজ্জ্বলতাও দেখা যাচ্ছে। জোড় হাত কপালে ঠেকিয়ে বললেন, ওঃ, ঠাকুরের কাছে কত মানত করেছি। ছেলের এতদিনে মতি হল।
