আপনি খুব বক্তৃতা দেন, না?
এটা কে বলল?
মোহিনী। শি ইজ মাই বুজুম ফ্রেন্ড।
সে তো জানি।
আপনি কিন্তু ভীষণ আনসোশ্যাল।
কেন বলো তো!
বন্ধুর সঙ্গে রিলেশন রাখেন না। আমি কতবার ফোন করি আপনাকে। কই, আপনি তো করেন না!
কৃষ্ণজীবন একটু হেসে বলে, আমি ভাল কথা কইতে পারি না যে! তোমাকে ফোন করে কী বলব বলো তো!
খবর নেবেন। কথা বলতে পারেন না, তা হলে অত ভাল বক্তৃতা করেন কি করে?
বক্তৃতা তো সাজানো ব্যাপার। কথা তো তা নয়। কথা একটা আলাদা জিনিস। আমি ভাল পারি না।
মোহিনীও তাই বলে।
তোমার কী মত?
আমার মত হল, আপনি যা আছেন তাই ভাল।
তার মানে কি?
আপনাকে আমার বেশ পছন্দ। একটু চালোকও আছেন, একটু বোকাও আছেন।
দুরকম থাকাই ভাল বলছো?
হ্যাঁ। পুরুষদের ওরকমই আমার ভাল লাগে।
তুমি বেশ পাকা মেয়ে।
গাল দিচ্ছেন না তো!
না। পাকা মানে ম্যাচিওরড।
আজকাল সবাই ম্যাচিওরড বাবা। সবাই সব বোঝে।
তাই নাকি?
আমাদের জেনারেশনকে তো আপনি চেনেন না। চিনলে বুঝতেন। কবে দেখা হবে বলুন তো!
তোমার সময় হলেই হবে।
মোটেই না মশাই। পরীক্ষার পর হয়তো গিয়ে শুনবো, আপনি কামস্কাটকা না হয়। আজারবাইজান চলে গেছেন। যা গ্লোব-ট্রটার আপনি!
মোহিনীর কাছে খোঁজ নিয়ে এসো।
হঠাৎ কৃষ্ণজীবনের মনে হল, বাইরের ঘরের এক্সটেনশন লাইনটা কেউ ধরে আছে। শুনছে তাদের কথা। একটা তৃতীয় শ্বাসের শব্দ আসছে টেলিফোনে।
সে অভিনয় জানে না। এই বিপজ্জনক পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার উপায় তার নেই। কয়েক মাস আগে কর্ডলেস টেলিফোনটা সে এনে লাগিয়েছিল বাইরের ঘরে। খুব ভুল হয়েছিল বোধ হয়।
সে বলল, আজ ছাড়ছি অনু।
ওমা, এত তাড়া কিসের? এখনই তো কথা বলতে মজা, আর একটু জেগে থাকুন না প্লাজ! একটু আডা মারি।
অসহায় কৃষ্ণজীবন বলে, কিন্তু, রাত জাগা কি তোমার পক্ষে ভাল?
আমার যে আপনার সঙ্গে অনেক কথা আছে।
কি কথা?
আচ্ছা, আপনারা নাকি আজ খুব ভালবাসার কথা বলেছেন?
ভালবাসার কথা? ওঃ, হ্যাঁ। কিন্তু সেটা তো—
দাদা কিছুই বুঝতে পারেনি। খুব অ্যাজিটেটেড।
ওটা অন্য ধরনের ব্যাপার।
আমাকে একদিন ভালবাসার ব্যাপারটা বুঝিয়ে দেবেন?
তৃতীয় পক্ষ শুনছে। শঙ্কিত কৃষ্ণজীবন বলে, ওঃ, ওটা কোনও ব্যাপার নয়। আসলে ওটা হল…
কৃষ্ণজীবন এত নার্ভাস হয়ে গেল যে, কথাই খুঁজে পেল না। আর। অনু খুব হাসছিল।
ফোনটা তৃতীয় পক্ষ নামিয়ে রাখল। তারপর দরজায় আচমকা দেখা দিল রিয়া। চোখ জ্বলছে। মুখখানা টিকটক করছে লাল।
০৫৫. সারা রাত ঘরের কাছে জলের ঢেউ
প্রথম দিন। সারা রাত ঘরের কাছে জলের ঢেউ-ভাঙার অবিরল শব্দ শুনতে পেল সে। শুনল নিশুত রাতে বিচিত্র পাখির ড়াক। শুনল ওস্তাদি গানের ঝালার মতো তীব্র ঝিঁঝির শব্দ। কানে বিস্মৃতপ্রায় শেয়ালের দলবদ্ধ চিৎকার। আর বাতাস নানা বিচিত্ৰ হুতাশে কত ফাঁক-ফোকর দিয়ে বাঁশির শব্দ তুলে বয়ে গেল নিরন্তর। চালের টিনে খটাং খটাং কত যে শব্দ উঠল!
ভাল ঘুম হল না হেমাঙ্গর। বারবার উঠে বসল। বারবার জানালার ঝাঁপ তুলে কুয়াশায় আবছা অন্ধকার নদীকে দেখার চেষ্টা করল। টর্চ জ্বেলে ঘরে সাপ বা বিছে ঢুকেছে। কিনা তা তদারক করল। তারপর ফের শুল। উঠল। জল খেল। মাঝে মাঝে একটু একটু ভয়ও করল তার। এই বেড়ার ঘরের নিরাপত্তা কতটুকু? বেড়া কেটে ঘরে ঢুকে পড়তে পারে দুষ্ট লোক, চোর। দামাল নদী যদি হঠাৎ পাড় ভেঙে গ্রাস করে নেয়। ঘরসুন্ধু তাকে? যদি ঝড় এসে উড়িয়ে নেয়। ঘরের চাল?
সকালবেলা অন্ধকার থাকতেই উঠে পড়ল হেমাঙ্গ। জানালা খুলে সূর্যোদয়ের অপেক্ষায় বসে রইল। কালো আকাশে প্রথম দুখানা আবছা দিগন্তজোড়া পাখনার বিস্তার ফুটে উঠল। আলোর দুটি ডানা। সেই ডানা আকাশের অন্ধকারময়তায় রাতের তারাকে মুছে নিল। একেই কি ভোর বলে-যেমনটা সে কলকাতায় কখনও দেখতে পায় না? এত অপরূপ! দি থেকে দিগন্তে হালকা কুয়াশার মায়াজালে জড়িয়ে অস্ফুট ভোরের আলো কত ম্যাজিক দেখাতে থাকে। দুখানা চোখ আজ দৃশ্যের ঐশ্বর্যে ড়ুবে গেল তার। প্রকৃতির এত অলঙ্কার আছে জানত না সে। কালো নদীর ওপর আলপনা একে উঠে আসছে সূর্য। পলক ফেলতে পারে না হেমাঙ্গ। আবেগে তার শ্বাসকষ্ট হতে থাকে।
তারার আলোয় আলো হয়ে যেতে লাগল চারদিক। রবীন্দ্রনাথ রোজ কোন সূর্যোদয় দেখতেন তা হেমাঙ্গ যেন একটুখানি বুঝতে পারে।
এখানকার মানুষ রাত থাকতেই উঠে পড়ে। আলো ফুটতে না ফুটতেই বাঁকা মিঞা হাজিরা। সঙ্গে ছোট ছেলে ফজল। ফজলের হাতে কেটলি। তাতে গরম দুধ। একটা ঠোঙায় বেশ কয়েকটা দিশি নিমকি বিস্কুট।
খেয়ে নিন। এ আমার রাঙা গাইয়ের দুধ।
হেমাঙ্গ আতঙ্কিত স্বরে বলল, দুধ! ও তো আমি কখনও খাই না।
তা বললে চলবে কেন? এ দুধের স্বাদ একটু চোখেই দেখুন। হরিয়ানার গাই বা জার্সি গরু নয় যে, দশ-বিশ সের করে সাদা জল দেবে। এ দিশি গাই, দুধের স্বাদই আলাদা।
হেমাঙ্গ বিরস মুখে বলে, আচ্ছা রাখো। মুখটুখ আগে ধুই, চা খেয়ে নিই, তারপর খাবো।
ফজলকে বলতে হল না। সে বালতির বাসি জল ফেলে টাটকা জল এনে দিল টিপকাল থেকে। হেমাঙ্গ দাঁত ব্রাশ করল, মুখ ধুল। ফজলই এনে দিল চা। চায়ের পর দুধটাও খেতে হল তাকে।
কেমন বুঝছেন। এ জায়গা?
রাতে খুব শব্দ হয়, না?
কিসের শব্দ?
জলের, বাতাসের, পাখির, ঝিঁঝির-অনেক শব্দ।
বাঁকা মিঞা খুব হাসল। বলল, ওসব সয়ে যায়। থাকুন, দেখবেন ওসব আর কানে আসছে না। তবে থাকতে পারবেন। কিনা তাই ভাবছি।
