খুব সম্প্রতি। কেন বলুন তো!
আপা আমাদের সব চেয়ে ভাল ছাত্রী। কিন্তু খুব একরোখা। ওকে নিয়ে ওইটেই প্রবলেম।
একরোখা হওয়াই তো ভাল।
প্রিন্সিপাল একটু চিন্তিতভাবে শুধু বললেন, হুঁ।
তাকে বাড়ি অবধি পৌঁছে দিয়ে গেল যে-দুটি ছেলেমেয়ে তাদের মধ্যে একজন আপা, অন্যজন অনুর দাদা বুবকা।
বুবকা বলল, আপা আমাকে খুব অদ্ভুত অদ্ভুত কথা বলে, যেগুলোর পসিবল নয়।
কি কথা বলে?
বলে যে, গড়ের মাঠে যত ঘাস আছে, তার ওপর যেসব গঙ্গাফড়িং লাফিয়ে বেড়ায়, আকাশে যে মেঘ ভাসছে বা টু মিলিয়ন লাইট ইয়ার দূরে যে স্টারটা মিটমিট করছে, এসবের সঙ্গে নাকি আমার রিলেশন আছে। এটা কি সত্যি হতে পারে?
জীবন একটু হাসল। তারপর বলল, আপা হয়তো খুব মিথ্যেও বলে না। কে জানে, হয়তো আছে।
কিরকমভাবে আছে? হোয়ার ইজ দি লজিক?
লজিক! না, লজিক নেই। তবে খুব সূক্ষ্ম জিনিস বুঝতে গেলে শুধু যুক্তি দিয়ে বোঝা যায় না। অনুভূতি চাই।
আপা বোঝে, আমি বুঝি না কেন? আমার কি ফাইনার ফিলিং নেই?
তা নয়। তবে সৃষ্টি জিনিসটাই তো অদ্ভুত। একদিক দিয়ে দেখতে গেলে এর কোনও মানেই হয় না। এই যে আমরা জন্মেছি, সভ্যতা তৈরি করছি, কথা কইছি—এসবের মানে কি বলো তো? কেন এই প্ৰাণ, এই শরীর, এই অনুভব, এইসব পারসেপশন? জড় বিশ্বে হঠাৎ এসব কোথা থেকে এল? কেনই বা এল?
কেমিক্যাল রি-অ্যাকশনস। ডায়ালেকটিক…
যদি তাই হয় তাও স্পষ্ট হল না। আবছা থেকে গেল।
কিন্তু স্টার বা ঘাসফড়িং-এর সঙ্গে আমার রিলেশন কি?
আমি তা জানি না। তবে এটা জানি, সারা পৃথিবীতে যে প্রাণের প্রকাশ দেখতে পাই তার মধ্যে একটা সূক্ষ্ম টিউনিং আছে। আছে প্রাণ ও জড়ের মধ্যেও একটা অদৃশ্য আত্মীয়তা। তুমি, আমি, গাছ, পাখি আলাদা ঠিকই, আবার খুব একটা অনাত্মীয়ও নই। গোটা দুনিয়াটাই যেন একটা ছক, একটা সুরে বাধা।
তবে আমি তা টের পাই না কেন?
চেষ্টা করলে হয়তো পাবে।
আপা পায়?
আপা হাসল না। গম্ভীর হয়ে বলল, শোনো বুন্ধুরাম, ভালবাসা ছাড়া ওসব টের পাওয়া যায় না।
কি বোগাস কথা দেখুন। হচ্ছে সায়েন্সের কথা, ও ভালবাসা এনে ফেলল!
কৃষ্ণজীবন তার দুপাশে বসা দুটি প্রতিপক্ষকে নিরস্ত করল না। কে জানে, হয়তো এই বিবাদই ওদের বন্ধুত্বে আটকে রেখেছে।
কৃষ্ণজীবন খানিকক্ষণ ওদের তর্ক শোনার পর বলল, আপা যে ভালবাসার কথা বলছে সেটা অলৌকিক কিছু নয়। আমার মনে হয় ভালবাসা একটা এমন জিনিস যা সব জ্ঞানকে গ্ৰাস করে নিতে পারে।
বুবকা উত্তেজিত গলায় বলে, হোয়াট ইজ দি মিনিং অফ দিস? আমি তো বুঝতে পারছি না।
কৃষ্ণজীবন বলে, আমিও বুঝতে পারি না। কিন্তু এটা জানি ভালবাসাই মানুষকে শেখায়, জানায়, ভালবাসাই মানুষকে মানুষ করে।
সেটা কিরকম ভালবাসা?
আপা অন্য পাশ থেকে বলে উঠল, তুমি বুঝবে না।
কেন বুঝবো না?
তার কারণ আছে। তুমি আজ সেমিনারে বক্তৃতা শুনে বেশ উদ্ধৃদ্ধ হয়েছিলে তো!
বুবকা বলল, ইট ওয়াজ ইমপ্রেসিভ, ইয়েস।
কিন্তু পৃথিবীর জন্য তুমি কিছু করবে কি?
কেন করব না?
করবে না। কারণ, তুমি কয়েকদিন পরেই সব ব্যাপারটা ভুলে যাবে। আমরা যে যার কেরিয়ার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ব। মুকু বুদ্ধি করব। আমাদের সব ফ্যামিলি হবে। তারপর পৃথিবী একদিকে থাকবে। আর আমরা থাকব নিজেদের ধান্ধা নিয়ে। তাই না!
আমি অত সেলফিস নাই।
মানছি বুবিকা। তুমি অন্তত তোমার বাবাকে ভীষণ ভালবাসো।
যাঃ, ওর সঙ্গে এর কী সম্পর্ক?
আছে। বাবাকে যখন ভালবাসো তখন তুমি সেলফিস নও। তাই না?
তা তো নই-ই।
এবার বুঝতে চেষ্টা করো, বাবা তোমার কাছে যেমন, এই পৃথিবীটা তোমার কাছে যদি তেমন হয়, তা হলে কেমন হবে? বাবার অসুখ হওয়ায় তুমি পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিলে, রাতে গিয়ে বসে থাকতে নার্সিংহোমের ফটকের বাইরে। মনে নেই?
থাকবে না কেন?
যখন পৃথিবীর গভীর, গভীরতর অসুখ টের পাও তখন কি ওরকম অস্থির হও?
মাথা নেড়ে বুবকা বলে, আমি কিছু বুঝতে পারছি না। দিস ইজ গ্ৰীক টু মি।
আপা বলল, সেইটেই তো সমস্যা। ইট ইজ গ্ৰীক টু এভরিবডি।–
কৃষ্ণজীবন একখানা হাত বুবকার পিঠে রেখে ধীর গলায় বলল, অত ভেবো না। রাগ করারও কিছু নেই। আপার মতো সূক্ষ্ম অনুভূতি আমারও নেই। কিন্তু আপা যা বলছে তার মধ্যে একটা সত্য থাকলেও থাকতে পারে। ব্যাপারটা তুমি হাইপথেটিক্যালি নাও।
নিতেই হবে? যদি না মানি?
তা হলেও ক্ষতি কিছু নেই।
বুবকা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, আপা খুব বিচ্ছু মেয়ে, জানেন? একটুও পড়াশোনা করে না, কিন্তু হায়ার সেকেন্ডারিতে ঠিক আমাদের বিট করবে। কি করে যে পারে কিছু বুঝতে পারি না। ও ব্ল্যাক আর্ট জানে বোধ হয়!
আপা বলল, তুমি একটি বোকারাম।
কৃষ্ণজীবন আবার নীরবে বসে। ওদের ঝগড়া শুনল কিছুক্ষণ। বুঝতে পারল, আপার কাছে তার বন্ধুরা নানাভাবে হেরে যাচ্ছে, রেগে যাচ্ছে। অথচ কিছু করতে পারছে না।
আজ রাতেও আপাকে নিয়ে খানিকক্ষণ ভাবল কৃষ্ণজীবন। তারপর বাড়ি নিঝুম হল। সে বসল। তার বইপত্র নিয়ে।
ফোনটা এল গভীর রাত্রে। বারোটার পর।
ফচকে গলায় মেয়েটা বলল, কী করছেন?
তটস্থ হয়ে কৃষ্ণজীবন বলে, আরে! তুমি এখনও জেগে আছো নাকি?
আমার একটা পরীক্ষা আছে সামনে। তাই পড়ছি।
ওঃ।
আচ্ছা, আপনি দাদাদের স্কুলে নাকি আজ একটা দারুণ বক্তৃতা দিয়েছেন?
কে বলল তোমাকে?
কী যে আপনি! দাদাই তো বলল!
ওঃ, তাও তো বটে!
