গৌরী-নামী মেয়েটি বলল, আপনি কিন্তু স্যার এটাই পছন্দ করে রেখেছেন। দিস ওয়ান ইজ দ্যা বেষ্ট। ফুললি অটোমেটিক, ব্ৰউনিং করা যায়, টাইমার আছে।
এ সবই হেমাঙ্গর মুখস্থ। সে সোফায় বসে গৌরীর মুখের দিকে সম্মোহিতের মতো চেয়ে থেকে অন্যমনস্ক হাতে ব্রিফকেস খুলে চেকবই বের করল।
কত যেন একজক্ট ফিগারটা?
উনিশ হাজার একশো…
সম্পূর্ণ আনমনা হাত চেকের ওপর অংকটা লিখল এবং সই করল, তারপর সেটা ছিঁড়ে মেয়েটার হাতে দিল। সবটাই করল। তার হাত। সে নয় যেন।
থ্যাঙ্ক ইউ স্যার, আপনার সঙ্গে কি গাড়ি আছে?
আছে।
গাড়িতেই তুলে দেবো তো! নাকি কাল হোম ডেলিভারিতে পাঠিয়ে দেবো?
না না, গাড়িতে তুলে দিন।
ভারী একটা স্বস্তিবোধ করে হেমাঙ্গ। যেন কিছুদিন ধরে একটা টেনশন ও টানাপোড়েন চলছিল মনে মনে। এই ট্র্যানজাকশনটা হয়ে যাওয়ার পর সে হালকাবোধ করছে। ব্রিফকেসটা বন্ধ করল তার দুটি হাত। হাতই, সে নয়।
ভ্রূ কুচকে সে ব্রিফকেসটার দিকে একটু চেয়ে থাকে। সিঙ্গাপুর থেকে কিনেছিল। আসল গুক্কি। এই ব্রিফকেসটাও তাকে ঠিক এরকমই টেনশনে ফেলে দিয়েছিল। কেনার পর শান্তি।
দত্ত এগিয়ে এল।
হয়ে গেল স্যার?
রুমালে ঘর্মাক্ত মুখ মুছে হেমাঙ্গ বলে, শুনেছি মাইক্রোওয়েভে খুব কমপ্লেন হয়। এদের সার্ভিস ভাল তো!
এ গ্রেড। তাছাড়া আমরা তো আছিই। কিছু হলে আমাদের কাছে কমপ্লেন করবেন, উই উইল সি টু ইট।
হেমাঙ্গ জানে, তাই মাইক্রোওয়েভে বিশেষ কমপ্লেন হবে না। প্রথম প্রথম কয়েকদিন শখ করে ব্যবহার করবে বটে, তারপর পড়ে থাকবে। যেমন তার অন্যান্য জিনিস রয়েছে পড়ে। মোটর ড্রিভূন ক্যামেরা, ওয়াশিং মেশিন, ভ্যাকুয়াম ক্লিনার, দুটো ফ্রিজ, দুটো টিভি, দুটো ভি সি আর, এগারোটা ব্রিফকেস, আরও কত কী!
বাড়িটা পাওয়া গিয়েছিল খুব বরাতজোরে। তাদের অনেক বাড়ি কলকাতায়। বেশীরভাগ বাড়িতেই বহু পুরনোকালের ভাড়াটেরা পনেরো বিশ ত্রিশ চল্লিশ টাকা ভাড়ায় বসে আছে। কাউকেই নড়ানো সম্ভব নয়।
আচমকা এই একখানা বাড়ি থেকে এক বহু পুরনো ভাড়াটে চলে গেল। হেমাঙ্গ তার বাবাকে গিয়ে বলল, বাড়িটা আমায় দেবেন? আমি থাকব।
তার মানে? আলাদা হতে চাও নাকি?
না। তবে একটু হাত-পা খেলিয়ে থাকব।
কেন এই এত বড় বাড়িটায় তোমার হাত-পা খেলানোর জায়গার অভাব হচ্ছে নাকি?
কথাটা ঠিক। তাদের বিশাল দুই মহলা বাড়িতে জায়গার অভাব নেই। হেমাঙ্গরা ছয় ভাই, চারজনই বিয়ে করেছে। প্ৰত্যেকেরই একাধিক কাচ্চাব্বাচ্চা। তবু জায়গার সমস্যা নেই। সামনের দিকের বাড়িটায় হেমাঙ্গ তিনখানা ঘর নিয়ে যথেষ্ট হাত-পা খেলিয়েই থাকে। তবে অসুবিধে একটাই, বাড়িতে তার অভিভাবকের সংখ্যা বড্ড বেশি। পাঁচ ভাই-ই তার বড়। তাছাড়া বাবা, বাবার ওপরে বিরানব্বই বছর বয়সী দাদু, বিধবা এক পিসি, এক ব্যাচেলর কাকা, মা, এক বিধবা কাকীমা, খুড়তুতো এক দাদা, তার নিজের এক অবিবাহিতা দিদি-সবাই তার অভিভাবক। ফলে প্রাপ্তবয়স্ক ও স্বাধীন হয়ে ওঠা তার কপালে হয়ে ওঠেনি।
কিন্তু কথাটা তো বাবাকে বলা যায় না। সে খুবই বিনয়ের সঙ্গে বলল, বাড়িটা ফাঁকা ফেলে রাখা ঠিক হবে না। আজকাল বাড়ি ফাঁকা রাখলে জোর করে লোক ঢুকে পড়ছে।
হেমাঙ্গর বাবা দুর্গানাথ খুবই অবাক হয়ে বললেন, এ খবর আবার কোথায় পেলে? এটা কি মগের মুলুক বলে তোমার ধারণা?
দুৰ্গানাথ যে খুব কড়া ধাতের লোক তা নয়। বরং রঙ্গরসিকতার দিকেই তার পক্ষপাত এবং স্বভাবে খানিকটা শিথিলতাও আছে। আবার অন্যদিকে অতিকায় ক্ষুরধার বুদ্ধি ও প্রবল পরিশ্রমী। তিন পুরুষের একটি ব্যবসাকে প্রায় একা হাতে ধরে রেখেছেন এবং ফলাও করে তুলেছেন। পশ্চিমবঙ্গের কারখানাগুলিতে শ্রমিক-অশান্তির যে প্রাবল্য রয়েছে, ধর্মঘট-ধীরে চলো-লকআউট ইত্যাদি দুৰ্গানাথের প্লাগ তৈরির কারখানায় নেই। কোনও অশান্তি নেই তাদের সার্জিক্যাল গুডসের দুটি এবং ওষুধের একটি দোকানেও। সবই নিখুঁতভাবে চলছে। সামান্য অশান্তি দেখা দিলেই দুর্গানাথ সেটিকে গোড়াতেই মেরে দেন। খুব জোরালো যুক্তি ছাড়া দুৰ্গানাথকে কাজ করা অসম্ভব। হেমাঙ্গ রণে ভঙ্গ দিল। জোরালো যুক্তি তার ছিল না, শুধু একা স্বাধীনভাবে থাকার একটা প্রবল ইচ্ছা ছিল মাত্র।
গড়চা বাই লেনের বাড়িটার মালিক যে তারাই এটা হেমাঙ্গরা ভুলেই গিয়েছিল একরকম। ভাড়াটে তোলার নিস্ফল চেষ্টা তারা কোনওদিন কোনও বাড়ির জন্যই করেনি। কিন্তু এই বাড়িটার ভাড়াটে মহিমবাবু একদম একা হয়ে গেলেন হঠাৎ। ছেলেমেয়ে দুজনেই অস্ট্রেলিয়ায়, হঠাৎ তার স্ত্রী-বিয়োগ ঘটল। একা বাড়িতে থাকতে পারছিলেন না। তখন ছেলে এসে স্থায়ীভাবে বাবাকে অস্ট্রেলিয়ায় নিয়ে গেল। তাদের যথেষ্ট টাকা, বাড়িটা নিয়ে তারা কোনও ঘোট পাকাতে চায়নি।
কিন্তু মুশকিল হল, বাড়ি খালি হওয়ার পর নানা লোক আসছে ভাড়া নেওয়ার জন্য। দুর্গানাথ বিরক্ত হচ্ছেন। আসছে দালাল, রাজনীতির লোক, লোকাল মস্তান। একখানা আস্ত দোতলা বাড়ি খালি পড়ে থাকা ও নয়। কলকাতায় যখন এত স্থানাভাব।
দুর্গানাথ একদিন হেমাঙ্গকে ডেকে বললেন, তুমি না। গড়চার বাড়িটায় থাকতে চেয়েছিলে?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
তোমার মতলবখানা কী?
হেমাঙ্গ একটু আশার আলো দেখতে পেয়ে বলল, আজ্ঞে আমার একটু নিরিবিলিতে থাকার শখ।
এ বাড়িতে কি সবাই তোমাকে উত্যক্ত করে?
