গণ্ডগোলটা কোথায় হল তা বুঝতে পারছিল না কৃষ্ণজীবন। একটা মিশনারি স্কুলের কর্তৃপক্ষ তাকে ডেকেছিল কুমিল্লাহ্মজীবন ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের সামনে তার কথা বলার সুযোগ কমই পায়। এই সুযোগটা পেয়ে সে খুশিই হয়েছিল।
অবাক হয়ে কৃষ্ণজীবন খুব সরলভাবে বলল, কোনও দোষ হয়েছে নাকি? বাচ্চাদের শেখানো তো ভালই। ওরাই তো ভবিষ্যৎ পৃথিবীকে দেখবে।
ছাই দেখবে! তোমার বকবকানি এক কান দিয়ে শুনে আর এক কান দিয়ে বের করে দিয়েছে এতক্ষণে। এসব আজেবাজে অনুষ্ঠানে যাচ্ছে, অথচ ইতুর বিয়ের নেমন্তনে গেলে না! কত দুঃখ পেল ওরা বলো তো! মেসোমশাই নিজে এসে নিমন্ত্রণ করে গিয়েছিলেন। তোমার জন্য আমাদেরও যাওয়া হল না।
কৃষ্ণজীবন সংসারী নয় বটে, কিন্তু খুব বোকাও নয়। ইতু হল রিয়ার এক মাসতুতো বোন। ব্যান্ডেলে ওদের বাড়ি। খুব একটা নেই। নেমন্তন্নে যাওয়ার ব্যাপারটা খুব জরুরী কিছু ছিল না। কিন্তু রিয়া হঠাৎ ব্যাপারটাকে ভীষণ গুরুত্ব দিতে যে কেন শুরু করল কে জানে! ব্যান্ডেল যেতে হলে পুরো দিনটা বরবাদ হত। সেমিনারে যাবে বলে কথা দেওয়া ছিল, কথার খেলাপ হত।
কৃষ্ণজীবন অপরাধীর মতো মুখ করে বলল, তুমি গেলে না কেন? তোমাকে তো যেতে বলে গিয়েছিলাম!
এত দারের রাস্তা বাচ্চাদের নিয়ে আমি একা যাবো? সেটা কি ভাল দেখাত?
তারা কি বুঝত না যে, কথার খেলাপ করাটা ঠিক নয়? তেমন হলে গাড়িটা নিয়েও যেতে পারতে। ড্রাইভার রতন থাকত।
গাড়ি অতদূর নিয়ে গেলে তুমি কি খুশি হতে?
না, গাড়ি নিয়ে বেরোনোর ব্যাপারে কৃষ্ণজীবনের আপত্তি আছে। পৃথিবীর ভারাক্রান্ত আবহাওয়ায় সে নিজের অবদান যোগ করতে চায় না। তবু গাড়িটা কেনা হয়েছে স্ট্যাটাস সিম্বল হিসেবে। কিনিয়েছে। রিয়াই। ওরাই ঘোরে বেড়ায়। কৃষ্ণজীবন কখনও আপত্তি করে না। তবে তেল পোড়ানো যে তার পছন্দ নয় এটা তার পরিবারের সবাই জানে।
কৃষ্ণজীবন কঁচুমাচু হয়ে বলে, খুশিই হতাম। তোমার তো প্রয়োজনটা জরুরীই ছিল।
সামান্য একটা স্কুলের সেমিনারে না-গেলেও তোমার চলত। ওই ক্যাংলাপিানা, কালো সাউথ ইন্ডিয়ান মেয়েটা যে তোমাকে কী মন্ত্র করল কে জানে!
কৃষ্ণজীবন একটু ব্যাকুল হয়ে বলে, সে বড় ভাল মেয়ে।
ভাল হোক না, কিন্তু স্কুলে পড়া মেয়ে তো! তার কথাটারই গুরুত্ব বেশি হল?
মেয়েটার গুরুত্ব যাই হোক, বিষয়টার গুরুত্ব ছিল।
দেখ, ওসব বোলো না। পৃথিবীর ভাল-মন্দ নিয়ে ভাববার জন্য অনেক বড় মাথা আছে। তোমার জন্য কিছুই ঠেকে থাকবে না একটি দিনের জন্য পৃথিবী ক্ষয় হয়েও যাচ্ছিল না।
কৃষ্ণজীবনের মুশকিল হল, সে ভাল অভিনেতা নয়। এ সময়ে তার হয়তো খুব নরম গলায় বলা উচিত ছিল, আই অ্যাম সরি রিয়া। আমি ঠিক বুঝতে পারিনি। কাম অন, লেট আস ফরগেট দি হোল থিং। কিন্তু সেটা ঠিক পেরে ওঠে না। সে। ওসব কৃত্রিম কথা বলতে গেলে সে মনে মনে হোঁচট খায়। রিয়ার এখন তাকে অপমান করার দরকার, তাই করছে। অপমানটা সে বরাবর মেনে এবং সায়েও নেয়। এসব ছোটখাটো ব্যাপার তাকে দমিত করে না।
ক্যাংলা কালো সাউথ ইন্ডিয়ান বাচ্চা মেয়েটার নাম আপা। অনুদের বাড়িতে পরিচয় হয়েছিল। এ বাড়িতে আজকাল প্রায়ই আসে। তারই জন্য তাদের স্কুলে যেতে রাজি হয়েছিল কৃষ্ণজীবন। সে জানে, রিয়া যতটা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করল ততটা তুচ্ছ আপা নয়। আপার ধাত অন্য। কৃষ্ণজীবন মানুষকে খানিকটা চেনে। অধ্যাপিকা রিয়া বুদ্ধিমতী, শিক্ষিতা, সম্প্রতি ডক্টরেটও পেয়েছে। তবু আপার পাশে তাকে দাঁড় করানোই যাবে না। আপার যা আছে তা খুব কম মেয়েরই আছে। সাধারণ মেয়েদের মতো কোনও দুর্বলতা তার নেই। এইটুকু বয়সেই সে অনেক বিস্তার লাভ করেছে হৃদয়বত্তায়।
তোমার সস্তা হাততালি পাওয়ার লোভ খুব বাড়ছে। বুঝলে! অহংকারও বেড়েছে।
কৃষ্ণজীবন একটা দীর্ঘশ্বাস খুব সন্তৰ্পণে ছাড়ল। তারপর হেলানো চেয়ারে এলিয়ে চোখ বুজে বাক্য-বুলেটে ঝাঁঝরা হতে লাগল নীরবে। তার মূক-বধিরতা আজকাল এইসব পরিস্থিতিতে কাজে লাগে।
আজ সে স্কুলের একরাশি ফুলের মতো ছেলেমেয়ের সামনে এক ঘন্টা ধরে বক্তৃতা দিয়েছে চোস্ত ইংরেজিতে। বিষয় ছিল, সেভ দি আৰ্থ। তার প্রিয় বিয়। বক্তৃতাও নয় ঠিক। একজন ব্যথিত মানুষের মুখ থেকে পৃথিবীর অন্তর্নিহিত যন্ত্রণাই যেন মথিত হয়ে বেরিয়ে এল। তার সঙ্গে মিশে গেল অবিমৃশ্যকারী মানুষের কৃতকর্মের জন্য মনস্তাপ। হল ফেটে পড়ল হাততালিতে।
বক্তৃতার পর আধা ঘন্টা ছিল প্রশ্নোত্তরের পালা। বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েরাও আজকাল পৃথিবীর সমস্যা নিয়ে কত ভাবছে। নানা সুন্দর ও প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করেছিল তারা। দিনটা অনেক দিন মনে থাকবে তার।
আপা সেমিনারের শেষে সোজা এসে তার হাত ধরল, আপনি আজ আমার কথাই যেন বললেন। আমিও কত ভাবি, কিন্তু এলোমেলোভাবে। আপনার চিন্তাগুলি খুব বিন্যস্ত।
কৃষ্ণজীবন হেসে বলেছিল, তুমি এরকম বাংলা শিখলে কোথায় থেকে?
কিছু ভুল বললাম?
না তো! তবে এরকম বাংলায় কেউ কথা বলে না।
আমি মনে করি একটা ভাষায় যত শব্দ আছে তার সব কিছুই মুখের ভাষায় প্রয়োগ করলে একঘেয়েমি কেটে যায়। ভাষা তো ব্যবহারের জন্যই, না?
তা বটে।
প্রিন্সিপালের ঘরে যখন চা কেক নিয়ে আপ্যায়িত করা হচ্ছিল তাকে তখন স্বয়ং প্রিন্সিপাল হঠাৎ প্রশ্ন করলেন, আপাকে আপনি কত দিন চেনেন?
