দুটো জ্বলন্ত চোখে অন্ধকার ফুটো করে পয়লা বাসটা এসে পড়ছিল। নদেকে ঠেলা দিয়ে উঠে পড়ল নিমাই, ওরে, এসে গেছে।
যখন ভোরবেলা এসে নিজের ঠেকাটিতে পৌঁছালো নিমাই তখন তার অ্যাসিস্ট্যান্ট বিশে। উনুনে আগুন দিয়েছে। কয়লার ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠছে মিষ্টি গন্ধ ছাড়তে ছাড়তে। ধোয়ার গন্ধ কারও মিষ্টি লাগে না, একমাত্র নিমাইয়েরই লাগে।
উনুন ধরতে না ধরতেই ঘুগনি বসিয়ে দিল নিমাই। পাউরুটি এসে গেল। তারপর কাজ আর কাজ। দম ফেলার ফুরসত নেই। আজকাল কুলি-কামিনরা ছাড়াও বাইরের লোক আসছে তার ঘুগনি খেতে। দু-চারজন বাবু মানুষও বসে যাচ্ছে সকালে এক কি দু ভাঁড় চা সেঁটে নিতে। খন্দেরে থই-থই করছে।
একজন সেদিন বলছিল, নিমাইবাবু, দুপুরে আর একটু ভারী টিফিন হলে সুবিধে হয়। পাউরুটি ফেনানো জিনিস, ওতে সুবিধে হয় না। হাতিরুটি চালু করে দিন, দেখবেন কেমন চলে।
কথাটা ভাবছে নিমাই। হাত রুটি বেচলে। লোভও বেশি হয়। কিন্তু খাটুনি বেশি। তবে ছাতুটা সে চালু করে দিয়েছে। পুকুও কম। কয়েকটা পেতলের কানা-উঁচু থালা কিনেছে। ছাত্ব, নুন, চাটনি, পেঁয়াজ আর লঙ্কা। পশ্চিমের মানুষেরা পেট ভরে খায়।
সারা দিন হাজারো কাজের মধ্যে বারবারই বীণাপাণি এসে হানা দিল আজ। কয়েকটা দিন চোখের আড়ালে থাকায় একটু ভুল পড়েছিল। কাল যাত্রায় তাকে দেখে আবার যেন একটা ছ্যাদা দিয়ে বেনো জলের মতো স্মৃতি ঢুকে পড়ছে।
দুপুরের পর একটু নিরালা হল নিমাই। নিবন্ত উনুনের পাশে বেঞ্চে বসে হাঁ করে ভাবতে লাগল। তার অনেক দোষ, অনেক খামতি। এত খামতি দিয়ে ভগবান যে কেন পাঠাল তাকে দুনিয়ায়! চারদিকে বড় বড় সব মানুষ। সে কেন একরাত্তি? সে কেন এত ভিতু? এত দুর্বল?
সন্ধের পর সারা রাত গুদাম চৌকি দিতে হবে। গতকাল যাত্রায় যাবে বলে অন্য লোককে টাকা দিয়ে মোতায়েন করে যেতে হয়েছে। আজ ফের তার পালা। দুপুরে একটু ঘুমানো দরকার। তা ঘুমটা আজ আর এল না। সন্ধের পর মাথায় কানে একটা কৰ্ম্মফর্টার জড়িয়ে হাতে খেটে লাঠি নিয়ে গুদামের বাইরে ছোট ছাউনিতে বসে রইল নিমাই। হাতে টর্চ। এ দিকে আজকাল খুব চুরি হচ্ছে। হওয়ারই কথা। বেকার বাড়ছে, রোজগার নেই মানুষের, কররোটা কী?
আজ বসে বসে অন্য চুরির কথা ভাবছিল নিমাই। বীণাকে চুরি করল কে? বিলিতি টাকা, নাটক, হাততালি? এই বীণাই তাকে না মর্যন্ত অবস্থা থেকে বুকে আগলে ফিরিয়ে এনেছিল! তখন ভালবাসত, এখন আর বাসে না নাকি? বীণার কি কখনও মনে পড়ে তার কথা?
ভাবতে ভাবতে রাত কেটে গেল। ঘুম এল না। মাথাটা বড় গরম। সকালবেলাতে ঠান্ত জলে চান করে কাজে লেগে পড়ল নিমাই।
একদিন নিরঞ্জনবাবু এসে তার ব্যবসা দেখলেন। বললেন, কেমন লাভ হচ্ছে?
নিমাই অপ্ৰস্তৃত হয়েই বলে, আজ্ঞে হিসেব তো করি না।
তোমাকে নিয়ে বড় মুশকিল দেখছি। হিসেব ছাড়া ব্যবসা হয়? হিসেব করেই করতে হয় সব কত যাচ্ছে কত আসছে কত পড়তা হল দেখবে না? একখানা খাতা করো।
যে আজ্ঞে।
নিমাই খাতা করল। তারপর হিসেব কষতে বসল। একখানা পুরনো প্লাস্টিকের ভেতর তার টাকা থাকে। সেখানা খুলে সব টাকা-পয়সা বের করে যখন গুনে-গেঁথে তুলল। তখন তার মাথাটা ঘুরেই গেল একটু। কম করেও মাসে হাজার খানেক টাকা তার আয় হচ্ছে যে! সত্যি না স্বপ্ন? হাজার টাকা যে অনেক টাকা।
আরও তিন দিন বাদে নদে এল। সব শুনে-টুনে বলল, ফুঃ। হাজার টাকা আবার এ বাজারে একটা টাকা নাকি?
ওরে, আমার যে এ-ই ঢের।
তোমার ঢের নিয়ে তুমি থাকো। ভাল করে ঘুগনি খাওয়াও তো!
বড় একটা প্লেটে ঘুগনি ঢেলে যত্ন করে দিল নিমাই। বলল, ব্যবসাটা আরও বাড়াবো, বুঝলি?
বুঝলাম। তোমাকে দেখে আমার হিংসে হয়। অল্পেই বেশ খুশি হয়ে যাও।
অনেকে যে বেশিতেও খুশি হয় না। তেষ্টা আরও বেড়ে যায়। অল্পে খুশি হই—এটাই আমার ভগবানের আশীৰ্বাদ।
এই ব্যবসাই যদি করবে তা হলে একটা দোকান দাও নিমাইদা। আর চৌকিদারের চাকরিটাও ছাড়ো।
ওরে না। চৌকিদারের চাকরি আমার লক্ষ্মী। এই চাকরি করতে করতেই বিয়ে হয়েছিল।
নদে হেসে বলল, তা হলে তো চাকরিটা অপয়াই। বিয়েটা তোমার ভাঙার মুখে।
ও কথা বলিসনি। নিরঞ্জনবাবু বড় ভাল লোক।
শোনো, আমি বনগী গিয়েছিলাম। বিশ্ববিজয় অপেরার এখন তুঙ্গে বৃহস্পতি। মেলা বায়না পাচ্ছে।
তা হোক। কাকা নাটকের জন্য প্ৰাণ দিতে পারে। ওর অপেরার ভাল হোক।
কিন্তু একটা খবর একটু খারাপ। বীণাপাণির সঙ্গে দেখা হয়েছিল।
নিমাইয়ের বুকটা একটু কেঁপে উঠল, তাই নাকি?
হ্যাঁ, সে তোমার নাম শুনলেই রেগে যাচ্ছে।
নিমাই মলিন একটু হাসল, নামটা তুললি কেন?
তোমার অবস্থা দেখে মায়া হচ্ছিল বলে। তা সে কোনও কথাই কানে তুলল না। বলল, ওর হয়ে দৃতিয়ালি করতে হবে না। ওই নিমকহারামকে আমি ভুলে গেছি।
নিমাই ফ্যাকাসে মুখে হাসবার আর একটা চেষ্টা করে বলল, কথাটা তো মিথ্যেও নয়। তার নুন অনেক খেয়েছি।
০৫৪. স্কুল-টুলেও বক্তৃতা
তুমি আজকাল স্কুল-টুলেও বক্তৃতা দিয়ে বেড়াচ্ছে! হল কি তোমার? প্রেস্টিজ বলে কিছু নেই নাকি? ডাকলেই যেতে হবে?
একটু থাতমত খেয়ে গেল কৃষ্ণজীবন। অপ্রস্তুত হয়ে বলল, প্রেস্টিজ! না, প্রেস্টিজের কি আছে? ওরা ডাকল, গেলাম।
সেটাই তো আমার আপত্তির কারণ। যাকে দেশ-বিদেশ থেকে ডেকে নিয়ে যাচ্ছে, যার ঘর-সংসারের দিকে মন দেওয়ার সময় নেই, সে যদি এখন এসব ছোটখাটো ব্যাপারেও তু বললেই ছুটে যায় তা হলে সেটা কেমন দেখায় বলো তো!
