নদেরচাঁদ কনুইয়ের ঠেলা দিয়ে বলে, কথা বলবে পালার পর?
ও বাবা, না।
বিয়ে-করা বউ, কথা কইবে না কেন?
ওরে না না। কথাই নেই।
পার্ট কেমন লাগল?
ভালই বোধ হয়, আমি কি অত বুঝি?
কেমন ক্ল্যাপ পাচ্ছিল দেখলে?
দেখলাম।
তোমার বউ কিন্তু জাতে উঠে গেল। আরও নাম হবে।
হোক। ওর ভাল হোক। কত কষ্ট করেছে। ভগবান এবার ওকে সুখশান্তি দিলে বড় ভাল হয়।
একবার দেখা করে গেলে ভাল করতে নিমাইদা।
ওরে দেখা করাটা একতরফা হলে হয় না। দু তরফেরই গরজ চাই। ওর গরজ নেই যে।
গরজ তোমারও নেই বোধ হয়?
আমি কি একটা মনিষ্যি রে? আমার কত কি মনে হয়। গরজ আছে, তবে ভয় লাগে। দেখা করে কোজ নেই। বীণা পছন্দ করবে না।
নদে মাথা নেড়ে বলে, কাজটা ঠিক হল না নিমাইদা।
নিমাইয়ের চোখে জল আসছিল। বীণাপাণি বড় অবহেলা করল তাকে। বড্ড দাগ দিল। এত তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য কি পাওনা ছিল তার? কিছু বিলিতি টাকাই যেন দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। মাঝখানে।
পালা শেষ হওয়ার পর আর কাঁচরাপাড়া ফেরার বাস নেই। রাত গভীর। চেনাজানা মেলা লোকের বাড়ি আছে রানাঘাটে। থাকার অসুবিধে নেই। নদে বলল, চলো, সুখরঞ্জনের বাড়ি যাই। তাকে বলা আছে।
নিমাই আনমনে বলল, তুই যা।
আর তুমি?
আমি! আমি একটু কোথাও বসে থাকব। আর ঘন্টাটাক পরেই তো বাস।
তোমার আত তাড়াহুড়োর কী আছে?
আছে। সকাল পাঁচটা ছাঁটার মধ্যে গিয়ে দোকান না খুললে অতগুলো লেবার খাবে কোথায়? ঘুগনির মটরদানা ভেজানো রয়েছে, পাউরুটির সাপ্লায়ার আসবে, দুধওলা আসবে।
তোমার অ্যাসিস্ট্যান্ট ছোড়াটা তো আছে।
ওরে না, ওকে দিয়ে কি কাজ হয়? আমি না থাকলে কাজে গা লাগবে না।
ভারি তো দোকান। দিলেই না হয় একদিন লোকসান।
লোকসান বলে নয়, পাঁচজন নির্ভর করে তো। ব্যবসা মানে কি শুধু পয়সা উপার্জন? একটু সেবাও তো দিই।
তোমাকে নিয়ে আর পারা যায় না।
যা না তুই সুখরঞ্জনের বাড়ি। আমি ঠিক চলে যাবোখন।
নদে মুখ ব্যাজার করে বলে, তা হয় নাকি? এক সঙ্গে এসেছি, একসঙ্গেই ফিরব। চলো তা হলে কোথাও বসে মশা তাড়াই।
বড় রাস্তায় বাস রুটের ধারে একটা দোকানের বারান্দা পেয়ে গেল তারা। ফাঁকা নয়, বারান্দাতেও জনাকয়েক শুয়ে আছে মুড়িসুড়ি দিয়ে। সন্তৰ্পণেই বসল তারা।
নদে বলল, বীণাপাণি আজ কিন্তু ফাটিয়ে দিয়েছে।
নিমাই বলল, হ্যাঁ।
আমন মিয়োনো গলায় বলছো কেন? তোমার ভাল লাগেনি?
লেগেছে। তবে বড় উগ্র পার্ট।
তার মানে?
যে পার্টটা করল সে মেয়েটা যেন হান্টারওয়ালি। কী তেজ বাবা! সব যেন জ্বলিয়ে পুড়িয়ে দিতে চায়।
ওরকমই তো চাই।
কোন চাস?
ওরকম না হলে এত অন্যায়ের সঙ্গে লড়াই করা যায়?
তোর বউদি। যদি ওরকমটি হয় তবে তোর কেমন লাগবে।
একটু ভেবে বলিস। কথায় কথায় ফোঁস করা কি ভাল?
নদে একটু হাসল। বলল, তোমার মতো মাটির হলে অবশ্য ওরকম তেজী মেয়েকে সামাল দেওয়া মুশকিল।
নিমাই মাথা নেড়ে বলে, তেজ অন্য জিনিস। এ তেজ নয়, এ হল ঝাঝ। ভেতর থেকে যেন সবসময়ে হাল্কা বেরোচ্ছে।
একটু ভেবে নদে বলল, হ্যাঁ, নিমাইদা, তুমি কি সত্যি বীণাপাণিকে ত্যাগ দেওয়ার কথা ভাবছো?
আমি ত্যাগ দেওয়ার কে? ত্যাগ যদি দিতে চায় তো সে দেবে। আমি ওরকম পাপ-কথা ভাবি না।
তোমার রকমসকম আমার তো সেরকমই ঠেকছে। কী হয়েছিল সেটাও বলোনি আমাকে।
স্বামী-স্ত্রীর ভিতরকার কথা বলিই বা কী করে? একদিন যদি গুছিয়ে বলতে পারি তো বলব। তবে এটুকু মনে হয়, বীণাপাণি বিপদের মধ্যে বাস করছে।
তা বিপদে তাকে একা রেখে চলে এলে কেন?
সে তো ইচ্ছে করলেই বিপদ কাটাতে পারে। কিন্তু চাইল না। তাই নিয়েই ঝগড়া।
অন্য কোনও ছেলে-ছোকরা জুটেছে নাকি?
ওরে না। বীণার এখনও সে দোষটা নেই। বড় ভাল মেয়ে।
ভালও বলছো। আবার এক সঙ্গে থাকছো না এটা কী রকম ব্যাপার হচ্ছে বলো তো?
সে অনেক কথা। তোকে তো আমি বলেইছি, দোষটা আমারই বোধ হয়। আমি দুর্বল মানুষ, তেজ-টেজ নেই, খেটে খাওয়ার ক্ষমতা নেই। বীণাপাণির হাত-তোলা হয়ে বসে খেতাম। পোষা প্ৰাণী যেমনটা হয়।
আর নিজেকে আসামী বানিয়ে ভোলমানুষ সোজো না তো। তোমাকে আমি জন্ম ইস্তক চিনি। তা এখানে যা করছে। সেটা তো বনগীয়েও করতে পারতে। ব্যবসাই যদি করবে তো বনগীয়ে করতে কে মাথার দিব্যি দিয়ে নিষেধ করেছিল?
রাগিস না ভাই। বীণাপাণি দোকান দিয়ে দেবে বলেছিল। সেই আশায় ছিলাম। কিন্তু সেটা আর হয়ে ওঠেনি।
হল না কেন?
তার বড় নজর। মনোহরি দোকান দেবে বলে ঠিক করেছিল। অনেক টাকার ধাক্কা।
শুধু এইটেই কারণ নাকি?
আরও আছে।
যাকগে, তোমাকে আর বলতে হবে না। আমার খুব ঘুম পাচ্ছে। চোখ দুটো একটু বুজে নেই। বাস এলে ডেকে দিও।
ঘুমো।
বসে বসেই নদে ঘুমিয়ে পড়ল। এমনকি নাকও ডাকতে লাগল ঘড়ঘড় করে। নিমাই চুপ করে বসে রইল। অন্ধকার ঠাণ্ডা। রাত। একটু কুয়াশা হয়েছে। চারদিকটা ভারি নিঝুম। বসে বসে সে একটাই কথা ভাবতে লাগল। বীণাপাণি। আজকাল তার শয়নে, স্বপনে, জাগরণে কেবল বীণাপাণির কথা মনে হয়।
পাঁচজন বীণাপাণিকে বাহবা দিচ্ছে বলে তার একটুও হিংসে হয় না। বরং তার মনে হয়, বীণাপাণির মতো মেয়ের যোগ্যই সে নয়। সে অনেকটাই ছোটলোক। বীণাপাণি গরিব হলেও বড় ঘরের মেয়ে। তার সঙ্গে খাপ খায় না। বীণাপাণিকে বিয়ে করেই যেন অপরাধ হয়েছে তার। আজ যদি বীণা নিজের ভাগ্য নিজে গড়ে নেয় তা হলে নিমাইয়ের হিংসে হবে কেন? তবে সে বড় ভালবেসেছিল বীণাপাণিকে। অনেকটা ভালবাসা। সেইটো বড় মনে হয়। ফাঁকা লাগে, উদাস লাগে।
