সাত দিন পর যখন রিহার্সাল শুরু হল তখন তার পার্ট করা দেখে কাকা অবধি বলে ফেলল, নাঃ, বীণাটার হবে। খুব ওপরে উঠবে মেয়েটা। পালা প্ৰায় একাই জমিয়ে দিয়েছে।
এই প্রশংসাটুকুই বীণাপাণির মেডেল। আর সে কী চায়?
তাদের পালায় প্রম্পটারের বালাই থাকে না। নিতান্তই কেউ পার্ট ভুলে গেলে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য একটা লোক থাকে। সে বাজনাদারদের মধ্যে বসে থাকে ঘাপটি মেরে। কাজেই মুখস্থ রাখাই সবচেয়ে ভাল।
দিন কুড়ির মধ্যেই রানাঘাটে প্রথম পালা হবে। তার পর আরও দু-তিন জায়গায়। জমলে বায়না আসবে হু-হু করে। কলকাতার অপেরার খাই বেশি। বিশ্ববিজয়ের খাই কম, আন্তরিকতা বেশি।
একা ঘরে কেমন লাগছে বীণার? নিমাইকে ছাড়া কেমন হচ্ছে এই থাকাটা? এসব নিজেকেই জিজ্ঞেস করে সে। কিছু খারাপ তো লাগছে না তার! একা বলেও বোধ হয় না। দিনরাত নাটকের চরিত্ররাই তার আশেপাশে ঘুরে বেড়ায় যেন, কথাও কয়। একটু এক লাগে না তার।
তবে কেউ কেউ নিমাইয়ের খোঁজ করে। একদিন কাকাও জিজ্ঞেস করে বসল, আচ্ছা নিমাইকে তো দেখি না আজকাল! গেল কোথায়?
গেল কোথায় সে খোঁজ বীণাপাণিও রাখে না। তবে অনুমানের ওপর বলে, পালপাড়ায়। জমিজমা দেখতে গেছে।
একা আছো নাকি? ভয়টয় নেই তো ওখানে?
একা থাকতে ভয় কি?
কাকা জবাবটায় খুশি হল না। বলল, মেয়েদের ভয় থাকেই। নিমাই কবে ফিরবে?
বললাম তো চাষবাস দেখতে গেছে। ফিরতে দেরি হবে হয়তো।
কাকা একটু ভেবে বলে, চাও তো একটি মেয়েকে তোমার কাছে রাতে রাখতে পারো। পুটুকে তো জানো! ওর বর ওকে তাড়িয়ে দিয়েছে।
পুটুকে ভালই চেনে বীণা। মাথা নেড়ে বলল, কাউকে দরকার নেই। একা আমি বেশ আছি। সারা দিন পালাটা নিয়ে ভাবি, মুখস্থ করি, একা একা রিহার্সাল করি। অন্য লোক থাকলে বকবক করবে, গল্প হবে, আমার তাতে অসুবিধেই হবে বরং।
সঙ্গে সঙ্গে কাকা বলল, তা হলে থাক।
বীণা বলল, ভয়ের কিছু নেই। চারদিকে প্রতিবেশী রয়েছে। তারা লোক ভাল।
একা থাকার ভয়টা কাটিয়ে উঠছে বীণা।একা থাকতে সে এখন মজা পাচ্ছে। সময়মতো রান্নাবান্না করতে হবে, করতে হবে, কথা শুনে চলতে হবে, মতামতের দাম দিতে হবে এমন কোনও বাধ্যবাধীতকা আর নেই। কেমন অবাধ স্বাধীনতা! যা খুশি তাই করতে পারে বীণা।
রানাঘাটে যাওয়ার দিনটা যত এগিয়ে এল ততই বুকের চিবচিব বাড়তে লাগল। তার। একা ঘরে অতগুলো ডলার। আর পাউন্ড রেখে যাওয়া কি ঠিক হবে? রাতে কাউকে শুতে রাজি করানো যাবে ঠিকই, কিন্তু সারা দিন ঘরখানা ফাঁকা পড়ে থাকবে যে!
নতুন দুশ্চিন্তাটা যুক্ত হওয়ায় একা থাকার আনন্দটা অনেকটাই মাটি হয়ে গেল তার। লুকিয়ে রাখার মতো জায়গা তো আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। সঙ্গে নিলে হয়। তবে পালা করতে গেলে জিনিসপত্র বড় ঘাটা পড়ে যায়। এক সঙ্গে, থাকা, কখন কার চোখে পড়ে যাবে। চুরিও যে যেতে পারে না তা তো নয়!
বীণা খুব ভাবতে লাগল। রানাঘাটে দুই রাতের পালা। দুটো রাত কোনওরকমে কাটিয়ে দিতে পারবে সে। কিন্তু তার পর? আরও নানা জায়গায় একের পর এক পালা নামবে। তখন কী হবে? এই জন্যই না। আর একবার নিমাইকে হাতে পায়ে ধরে রেখে দিয়েছিল সে। যত অপদার্থই হোক, তবু তো পাহারাদার!
এখন কী করে বীণা?
যত তাড়াতাড়ি পারা যায় ডলারগুলো ভাঙানো দরকার। দেশি টাকা হলে ব্যাঙ্কে বা পোস্ট অফিসে রেখে দিতে পারবে। কেউ টেরও পাবে না। কিন্তু ভাঙানোতেই যে বারবার বাধা পড়ছে।
বীণা একবার ভাবল, পল্টুর কাছে যাবে। আবার ভাবল, থাকগে। পল্টু ছেলেটাকে তার মোটেই বিশ্বাস হয় না। বনগাঁয়ে ডলার ভাঙানোর বিপদ আছে। চাউর হয়ে যাবে।
রানাঘাটে যাওয়ার জন্য বাক্স গোছাতে গিয়ে সে ডলারের প্যাকেটটা একটা পুরনো ব্লাউজে জড়িয়ে বাক্সের তলায় রেখে ওপরে অন্য সব জিনিস চাপিয়ে নিল। যা হওয়ার হবে। প্যাকেটটা সঙ্গে না থাকলে সে মন দিয়ে পার্টও করতে পারবে না।
একখানা পুরনো বাস ভাড়া হল। তাইতে পিকনিক পার্টির মতো একদিন সকালে চেপে বসল। সবাই। ভারি হাসাহাসি, কথা চালাচালি করতে করতে এক বুক উত্তেজনা নিয়ে তারা পৌঁছে গেল দুপুরের আগেই। যে ক্লাব তাদের বায়না করে এনেছে তারা বেশ বড়সড় আয়োজন করেছে। বিশাল প্যান্ডেল। শোনা গেল টিকিট ভালই বিক্রি হয়েছে। দুপুরে খাওয়াল চমৎকার। খাণ্ডা খাণ্ডা মাছের টুকরো পড়ল পাতে, বড় বড় চটিজুতোর সাইজের বেগুণী, ঘন মুগডালে মাছের মাথা, টমেটোর চাটনি আর দই। কাকার বারণ আছে, পালার দিনে বেশি খেতে নেই। তাতে আইঢাই হয়, পার্ট করে জুত হয়না। বীণা তাই সাবধানে খেল। অম্বলের ব্যামোটাও বড্ড ভোগাচ্ছে।
একটু রাতের দিকে যখন ভরাভর্তি আসরে নামল বীণা তখন মনে হল, এই তো তার জগৎ। এ ছাড়া সে আর কী চায়? প্ৰাণ ঢেলে অভিনয় করল সে। কত যে ক্ল্যাপ পেল তার ইয়ত্তা নেই। পালা জমেছে। লোকে নিচ্ছে।
পালার এক ফাঁকে কাকা বলে গেল, কালকেও এই আসরেই পালা বসবে বীণা। সুপারহিট। কাকার মুখে তৃপ্তির হাসি দেখে বীণার বুকখানা জুড়িয়ে গেল। কাকা তার জন্য যা করেছে তা তার বাবাও করেনি, স্বামীও নয়। এ লোকটার জন্যই বেঁচে আছে বীণা। কৃতজ্ঞতায় তার চোখে জল আসতে চাইছিল।
যে হাজার খানেক লোক পালা দেখছিল তাদের মধ্যে রোগাভোগা ছোটখাটো, নিমাইও ছিল। সঙ্গে নদের চাঁদ। নিমাই মোটেই পালা দেখতে আসেনি। সে দেখতে এসেছিল বীণাপাণিকে। না, তেমন পরিবর্তন হয়নি। একই রকম আছে। তবে সাজগোজ করায় দেখাচ্ছিল ভারি সুন্দর। যেন এ তার বউ নয়, সিনেমার মেয়েছেলে। বেশ ভরা লাগছিল বুকখানা তার।
