চারুশীলা মাসখানেকের মধ্যে তাকে একটা নতুন টেরিটনের জামা, একজোড়া জুতো এবং একটা দামী জাপানী। ফাউন্টেন পেন উপহার দিয়ে ফেললেন। চয়নের হাফ ধরে যাচ্ছিল। রিয়া এবং মোহিনীরাও ভাল। তবে তাদের সংযম আছে। চারুশীলা অনেকটা উন্দাম।
প্রায় বছরখানেক বিদেশবাসের পর চারুশীলার স্বামী ফিরলেন দেশে। ভদ্রলোক বিদেশে একটা বিরাট কনস্ট্রাকশনের কাজ করছিলেন। প্রচুর টাকার কাজ। তার দেশে ফেরাটাকে চারুশীলা একটা উৎসব দিয়ে সেলিব্রেট করলেন। বিরাট পার্টি হল বাড়িতে। এবং এ্যান্ড হোটেলে হল আর একটা রিসেপশন। দুই জায়গাতেই হাজির ছিল চয়ন। পাটি এবং গ্র্যান্ড হোটলের অভ্যন্তর দুটোই যোগ হল তার অভিজ্ঞতায়।
আর যোগ হলেন সুব্ৰত! চারুশীলার স্বামী। এমন তদগত, কর্মপ্রাণ মানুষ সে বড় এ টা দেখেনি। মানুষটি খুব লম্বা চওড়া নন, বরং মাঝারি বা ছোটখাটো মাপেরই। কিন্তু মুখের আদলটি মায়ায় মাখানো! সর্বদাই মুখে হাসি। ইনি কয়েক কোটি টাকার মালিক এবং প্রতি বছরই কোটির কাছাকাছি আয় করেন তা চেহারা দেখে ধরাই যায় না।
চয়ন জীবনের অন্যান্য দিক দেখছে আর অবাক হচ্ছে। সে শুনেছে সুব্ৰত নকশাল আন্দোলন করতেন, একবার জেলও খেটেছেন। তাঁর এই রূপান্তর কিছু বিস্ময়কর।
সুব্রত দেশে ফেরার পর চয়নের ওপর থেকে চারুশীলার মনোযোগ একটু অপসৃত হল। চারুশীলা স্বামীর সঙ্গে নানা আউটিং ও নিমন্ত্রণে যেতে লাগলেন। চয়ন হাফ ছাড়ল।
তারপর চারুশীলা একদিন সুব্রতকে ডেকে আনল পড়ার ঘরে, একে তুমি একটা চাকরি দাও।
সুব্ৰত হাসছিলেন, বললেন, আচ্ছা আচ্ছা, হবে।
হবে-টবে নয়। এখনই দাও। এ ছেলেটা হাসতে ভুলে গেছে। ভীষণ দুঃখী হয়ে থাকতে ভালবাসে।
চয়ন লজ্জায় পড়ে গেল।
সুব্রত বললেন, একটু সময় দেবে তো।
সময় দিলে চলবে কি করে? ছেলেটা খুব ভাল, জানো? আমি পাঁচশো টাকা মাইনে দিতে চেয়েছিলাম, নেয়নি। কারটেল করে চারশোতে নামালো।
সুব্ৰত হাসতেই লাগলেন। কিছু বললেন না।
এর দিন সাতেক বাদে চারুশীলা আবার পড়ার ঘরে হানা দিয়ে বললেন, শুনুন, সামনের রবিবার আমরা ফের আউটিং-এ যাচ্ছি। সাজাতিক জায়গায়।
কোথায়?
তা কে জানে! আমার পাগল ভাই কোথায় অজ্ঞাতবাস করবে বলে জঙ্গলের মধ্যে একটা মাটির বাড়ি কিনেছে। কাউকে ঠিকানা বলছে না। আমি গোয়েন্দা লাগিয়ে ঠিকানা জোগাড় করেছি। ও শুক্রবার শুক্রবার সেখানে পালায়। আমরা রবিবার গিয়ে ওকে সারপ্রাইজ দেবো। আপনিও যাচ্ছেন কিন্তু।
০৫৩. কাকা ডেকে পাঠিয়েছিলেন
কাকা ডেকে পাঠিয়েছিলেন বটে, কিন্তু ভয়ের কিছু ছিল না। বিকেলের দিকে ভয়ে আধমরা বীণাপাণি যখন গিয়ে তার সামনে দাঁড়াল তখন কাকা হোসে-টেসে বলল, ভাল খবর আছে বীণা। নতুন পালার তিনটে আগাম বায়না পেয়েছি। আদাজল খেয়ে লাগতেই হবে। বাপের বাড়ি গিয়ে অনেক সময় নষ্ট করে এলে।
বুক থেকে যেন ভারী পাথর গড়িয়ে নেমে গেল। শ্বাস সহজ হল। বীণা বলল, পালা নামবে! উঃ, কতদিন পর।
কাকা বিষণ্ণ মুখে বলে, হ্যাঁ, এবারটা অনেকদিন ফাঁক পড়ে গেল। কত ঝামেলা হচ্ছিল! এবার আর চিন্তা নেই।
নায়িকার পার্ট নয়, তবে খুব বড় পার্টই দেওয়া হল বীণাকে। হাতে হাতে সবাইকে জেরক্স করা কাগজ বিলি করছিল কাকা। বলল, আগে নিজের নিজের পার্ট মুখস্থ করো, তারপর রিহার্সাল। সাত দিন সময় দিচ্ছি। তার মধ্যে কণ্ঠস্থ হওয়া চাই।
রাত্ৰিবেলা লন্ঠনের আলোয় পালাটা পড়ল বীণা, তার একাকী ঘরে বসে। পড়তে পড়তে চোখে জল এসে গেল। এক দুঃখী মেয়েকে নিয়ে সামাজিক নাটক। কাকার নিজের লেখা। এ পালা জমে যাবে খুব।
অনেক রাত অবধি জেগে পালাটা শেষ করে লন্ঠন কমিয়ে যখন বিছানায় শুয়ে পড়ল বীণা তখন তার বুকটা ছাৎ করে ভুল। বড্ড ফাঁকা লাগল বিছানাটা। পাশে লোকটা ছিল এতদিন। এবার থেকে কি ফাকাই থাকবে জায়গাটা? সারা জীবন।
থাকলে থাকবে। বীণা প্রথম প্রথম ভয় পাবে, মন খারাপ হবে। তার পর ধীরে ধীরে সব ঠিক হয়ে যাবে। একটা নিষ্কর্মী লোকের ঘর-সংসার করে সুন্দর জীবনটা নষ্ট করবে নাকি সে? তার জায়গা তো হাজারটা লোকের চোখের সামনে, মঞ্চের ওপর। নাটক ছাড়া বাঁচবে না সে। লোকটা থেকে বরং বাধা হচ্ছিল। নানা বায়নাক্কা। মূর্তিমান বিবেক। এই-ই ভাল হয়েছে।
সারাটা রাত খানিক ঘুমে, খানিক জাগরণে, আর ভয়-ভয় একটা ভাব নিয়ে কেটে গেল বীণার। পরদিন সকাল থেকে আর নাওয়া-খাওয়ার সময় রইল না। দিন-রাত মুখস্থ করতে লাগল পার্ট। প্রায় সব সিনেই ঘুরে ফিরে সে আছে। বলতে গেলে নায়িকার চেয়েও তার পার্ট বড়। গুরুতরও বটে। ধারতাইগুলো বুঝে নিতে আগুপিছু অন্য পার্টগুলোও প্রায় ঠোঁটস্থ করে ফেলতে লাগল। তার গলায় দুখানা গান আছে। সুর পরে বসবে। গানগুলোও সে মুখস্থ করে নিজের সুরে গুনগুন করে নিতে লাগল। নিমাইয়ের কথা বিস্মরণ হতে সাত দিনও লাগল না।
শুধু নিমাই কেন, বাবা-মা, ভাই-বোন, ডলার-পাউন্ড কিছুই আর মনে পড়ে না। কাকা ইচ্ছে করেই তার পার্টের মেয়েটার নামও রেখেছে বীণাপাণি। খুব তেজী মেয়ে। সব সময়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে তার লড়াই। নায়িকাটা একটু ছিচকাঁদুনে, আদুরি-আদুরি, ন্যাকা ধরনের পার্ট। দু নম্বর মেয়েটা ঠিক তার উল্টো এবং সে-ই নায়িকাকে প্রায় ঠেকা দিয়ে পাতে দেওয়ার যোগ্য করে তুলেছে।
বীণা নিজে তেজী ধরনের মেয়ে নয়। বরং ভিতু আর নরম ধরনের। কিন্তু নাটকের বীণাপাণির পার্ট মুখস্থ করতে করতে তারা যেন তেজ-বীৰ্য এসে যেতে লাগল।
