চয়ন সঙ্গে সঙ্গে আত্মরক্ষার পদ্ধতি নিয়ে বলে, না! আমি আবার ওসব খাই না। এটাই বেশ লাগে।
আপনি বোধ হয় আপনার বউদিকে ভয় পাচ্ছেন। যদি কিছু বলে, তাই না?
চয়ন মৃদু হাসল। তারপর বলল, যতদূর নির্দোষ থাকা যায় ততই ভাল।
আপনি খুব সাবধানী মানুষ।
না। আমি খুব ভিতু।
মেয়েটা তার পিঠের খুব কাছ ঘেঁষে দাঁড়ালো। এ ব্যাপারটাও তার পছন্দ হচ্ছে না। এ কি বড় গায়ে-পড়া? তাহলে তো ঝক্কিই হল একটা। রোজ জ্বালাবে।
ভদ্রতা বজায় রাখতে সে বলে, নতুন চাকরি কেমন?
খুব ভাল মনে হচ্ছে না। কাল একজন পেশেন্ট মারা যাওয়ায় খুব হামলা হল। পেশেন্টের হয়ে কিছু লোক ইট পাটকেল ছুঁড়ে ভাঙচুর করে গেছে। পুলিশ এসেছিল।
ও বাবা!
নার্সিং হোমে এসব অবশ্য হয়। পেশেন্টের ডেলিভারি হতে সময় লাগছিল। তারপর কী সব কমপ্লিকেশন দেখা দেয়। দোষটা ডাক্তারের নয়। আজকাল লোকেরা বড় অল্পে রেগে যায়। তাই না?
কথাটা বোধ হয় ঠিক।
খুব ঠিক। কারও ধৈর্য নেই। মা তো শুনে খুব ভয় পেয়ে গেছে। বলছে, চাকরি ছেড়ে দে। আমি বললাম, দেখি আরও কয়েকটা দিন। আটলোটা টাকা হুট করে ছাড়ব কেন?
আটশো!
ট্রেনিং পিরিয়ড বলে কম দিচ্ছে। বারোশো স্টার্টিং। কিছুদিন তো করে দেখি।
এইভাবে কথা গড়ায়। কোথাও পৌছোয় না। তবে চয়নের পুঁজিতে একটা অভিজ্ঞতা যোগ হতে থাকে।
নতুন আরও অভিজ্ঞতা যোগ হচ্ছিল অন্য দিক থেকেও। মোহিনীর মা তাকে আর একটা মোটা মাইনের টিউশনিতে নিয়োগ করেছেন। শুধু অঙ্ক এবং মাসে চারশো টাকা। বাড়িটা চয়নের একেবারে অচেনা নয়। মোহনীদেরই প্রতিবেশী। ছাত্রের মা চারুশীলার সঙ্গে সে একবার হেমাঙ্গবাবুর গাড়িতে চেপে হোমিওপ্যাথ ডাক্তারের কাছে গিয়েছিল। টিউশনিতে নিয়োগের আগে চারুশীলা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, শুধু অঙ্ক কতে আপনি কত নেবেন বলুন তো!
চয়ন বিনীতভাবে বলল, একটা তো মোটে সাবজেক্ট। দেড়শ দিতে কি আপনার অসুবিধে হবে?
চারুশীলা অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তার দিকে খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে বলে, দেড়শ? ওটা তো মেড সারভেন্টের চেয়ে কম মাইনে। আপনার সেলফ রেসপেক্ট বলে কিছু নেই দেখছি! ছিঃ, ওই জন্যই তো বাঙালীর উন্নতি হয় না।
চয়ন থমত খেয়ে বলল, না, ভুল বুঝবেন না। আমি তো মোহিনীকে পড়াতে এদিকে আসিই। এক্সট্রা কোনও পরিশ্রম তো নয়।
চারুশীলা অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে বলল, মেধার সঙ্গে পরিশ্রম এক করে ফেলবেন না। যাকগে, পাঁচশো টাকার নিচে আমি দিতে পারব না। দিতে আমার লজ্জা হবে।
চয়ন অত্যন্ত বিপাকে পড়ে বলল, এতটা যে রেট নয়। নিতে আমার ভীষণ লজ্জা হবে।
ওই জন্যই তো আপনার জীবনেও উন্নতি হবে না। ঠিক আছে, চারশো টাকা করে নেবেন। রাজি তো!
তাও বেশি হয়ে যাচ্ছে।
আমি কিন্তু মোটেই আপনাকে দয়া দেখাচ্ছি না। রেট এরকমই হওয়া উচিত বলে মনে করি।
বাচ্চা একটা ছেলেকে শুধুমাত্র অঙ্ক করানোর জন্য এত টাকা নিলে অন্যায় হবে না?
তাহলে আপনি ওকে ইংরেজি বা অন্য সাবজেক্টও একটু দেখবেন। ইংরিজির টিউটর ওর দরকার হয় না। ইংলিশ মিডিয়মেই পড়ে। তবু দেখবেন। শুনেছি আপনার বেসিক গ্রামারের নলেজ খুব ভাল।
প্ৰথম দৰ্শনেই পিন্টুকে ভীষণ পছন্দ করে ফেলল চয়ন। দেবশির মতো নিস্পাপ চেহারা। বুদ্ধিমান এবং মনোযোগী। একটু দুইও আছে। তবে সেটাও উপভোগ্য।
মুশকিল হল পিন্টুকে পড়ানোর সময় চারুশীলা প্রায়ই এসে হাজির হন। দ্রমহিলার নানারকমের খেয়াল। এসে বললেন, আচ্ছা, আপনার তো বোধহয় সোয়েটার নেই! সোয়েটার গায়ে দেন না কেন?
কলকাতার শীতে লাগে না। র্যাপারেই চলে যায়।
আপনার ব্যাপারটা ভাল নয়। চলুন তত, গড়িয়াহাটা থেকে আপনাকে একটু পুলওভার কিনে দিই।
চয়ন প্রমাদ গোনে। কোনও জিনিসের বাড়াবাড়ির ভাল নয়, সে জানে। পরে এই ভালবাসা বা করুণা উলটো রূপ নিতে পারে।
পুলওভার অবশেষে সত্যিই কিনে দিয়েছে চারুশীলা। এবং আজকাল রাতের খাবারও তাকে পেয়ে আসতে হচ্ছে সপ্তাহে তিনদিন।
চারুশীলা অত্যন্ত ছটফটে চঞ্চল মহিলা। এ-ঘর ও-ঘর সারাক্ষণ ঘুরে বেড়াচ্ছেন, মুহুর্মুহু টেলিফোন করছেন, যখন তখন কেনাকাটা করতে বেরিয়ে পড়ছেন। কিসের যে অতৃপ্তি, কেন যে এই অস্থিরতা তা অনুমান করতে পারে না চয়ন। তবু এই স্বাভাবিকতার অভাবের জন্যই বোধ হয় চারুশীলাকে তার খুবই ভাল লাগে। মনে হয়, আমার বউদি যদি এরকম হত!
শুনুন, সামনের শনিবার আপনি একটু তৈরি হয়ে আসবেন। আমরা এক জায়গায় যাবো। সকালে।
চয়ন অবাক হয়ে বলে, কোথায়?
ব্যাণ্ডেল। রিয়া আর ছেলেমেয়েরাও যাবে। আর আমার একটা ভাই আছে, হেমাঙ্গ—চেনেন তো! দারুণ আউটিং।
চয়ন মৃদুস্বরে বলে, কিন্তু আমি!
চারুশীলা হেসে বলে, কেন, আপনি কি অচ্ছ্যুৎ।
তা নয়। তবে–
ওসব শুনছি না। সবসময় অত দুঃখ-দুঃখ মুখ করে থাকবেন না তো! মুখে হাসি নেই কেন? জোর করে হাসবেন। হাসতে হাসতে ওটা অভ্যাস হয়ে যাবে। গোমড়া মুখ আমার একদম সয় না।
সুতরাং ব্যান্ডেলেও যেতে হয়েছিল তাকে। চারুশীলা আরও লোক জুটিয়েছিলেন। ঝুমকি আর অনু নামের দুই বোন। রশ্মি রায় নামে একজন প্রায়-মেমসাহেব মেয়ে। পুরুষ বলতে সে, হেমাঙ্গ আর দুইজন ড্রাইভার।
এই ব্যান্ডেলে যাওয়াটা চয়নের কাছে এক বিশাল উন্মােচন। সে জীবনে ব্যাভেলে আসেনি, চন্দননগর দেখেনি। কলকাতার বাইরে যাওয়ার সুযোেগ তার হয় না। তার ওপর গাড়িতে চড়ে, এত আরামে।
