কিন্তু চয়ন এত উদ্বিগ্ন কেন? চয়ন নিজেই নিজের এইসব উদ্ভট উৎকণ্ঠায় ভীষণ অবাক হয়। পরে যখন উদ্বেগটা প্রশমিত হয় তখন তার নিজের এইসব ছেলেমানুষি উৎকণ্ঠার জন্য সে লজ্জিত হয়। সে আসলে অচেনা লোকদের সম্পর্কে ভীষণ অস্বস্তিতে থাকে। চেনা হয়ে গেলে আর ভয়টা তত থাকে না।
চেনা হল আরও সাতদিন বাদে।
সকালে টিউশনিতে বেরোবার সময়ে দরজায় তালা লাগাচ্ছিল চয়ন, ঠিক এই সময়ে মেয়েটা এক রাশ ভেজা জামাকাপড় নিয়ে ওপরে এল। একেবারে মুখোমুখি দেখা।
মেয়েটা নিঃসঙ্কোচে বলে উঠল, আপনিই চয়ন তো! অয়নদার ভাই?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
আমরা নিচে নতুন ভাড়া এলাম।
জানি।
আমার নাম অনিন্দিতা। আপনি তো টিউশনি করেন, না?
হ্যাঁ। আমিও করতাম। সবে একটা চাকরি পেয়েছি।
ওঃ।
মেয়েটি হাসল। রোগা মুখখানায় শ্রী বলতে ওই হাসিটি। দাঁতগুলির সেটিং খুব ভাল। এবং ঝকঝকে। বলল, তা বলে সাঘাতিক কিছু নয়। একটা নার্সিং হোম-এর রিসেপশনিস্ট। কেমন হবে কে জানে! নিয়ে তো নিলাম।
ভালই করেছেন।
টিউশনি আর ভাল লাগছিল না। এ বাড়ি ও বাড়ি দৌড়োদৗড়ি করা কি সোজা? বাস-ট্রামের অবস্থাও তো ভাল নয়। সবসময়ে ভিড়।
ঠিক কথাই তো।
প্রথম পরিচয়ে এরকম নিঃসঙ্কোচে কথাবার্তা বলতে পারাটা আধুনিক যুগের মেয়েদের একটি ভাল লক্ষণ। অকারণ লজ্জা-সংকোচের বালাই নেই। একটু প্রসন্নতার সঙ্গেই চয়ন মেয়েটির দিকে চেয়ে রইল।
আপনার তো শুনেছি শরীর ভাল নয়।
শরীরের কথায় নিবে গেল চয়ন। দুঃখের সঙ্গে মাথা নেড়ে বলল, না, শরীর ভাল নয়। আমি এপিলেপটিক।
তাহলে তো টিউশনি করতে আপনার কষ্ট হয়।
কষ্ট! বলে চয়ন যেন একটু ভেবে বলল, অভ্যাস হয়ে গেছে।
আমাদের ঘরে আসবেন। গল্প করা যাবে।
যাবে।
মেয়েটির সঙ্গে আলাপ করে মনটা বেশ ভাল লাগছিল চয়নের। আলাপ হওয়াটাই ছিল দরকার। অচেনা থাকলে তার ভয় আর উদ্বেগটা যেত না। এরা বোধহয় তেমন খারাপ লোক নয়। গত সাতদিন ধরে সে নিচের বাথরুমটা ব্যবহার করে আসছে। একটু ভয়ে ভয়েই। কিন্তু কেউ কিছু বলেনি। না, সে অবশ্য ওদের ঘরে গিয়ে গল্প করতে বসবে না। বউদি তাতে বিগড়ে যেতে পারে। এই আলাপ-পরিচয়-ঘনিষ্ঠতা জিনিসটার মেয়ে-মহলে অন্যরকমের ব্যাখ্যা হয়, সে জানে।
মেয়েটির বাবা এবং মায়ের সঙ্গে পর্যায়ক্রমে চেনা হয়ে গেল তার। আরও দিন চারেকের মধ্যে। সত্যেশবাবু হিসেবি লোক। বাড়ি করার জন্য প্রস্তুতি হিসেবে টাকা জমাচ্ছেন। প্রথম আলাপের পাঁচ মিনিটের মধ্যে বলে ফেললেন, এখন ইটের দর কত করে যাচ্ছে জানো? আট আনা করে। আমি যখন বাড়ি শুরু করব তখন কোথায় ঠেলে উঠবে তাই ভাবছি। আচ্ছা, ফ্লাই অ্যাশ দিয়ে কোথায় ইট তৈরি হয় জানো?
চয়ন জানে না। তাই মাথা নেড়ে বলল, আজ্ঞে না।
বাপ আর মেয়ের মুখশ্রীতে খুব মিল। হনু উঁচু, রোগা, ভাঙা মুখ। তবে মেয়ের মতো বাপেও দাঁতের সেটিং ডাল। এবং ঝকঝকে।
সত্যেশবাবু বললেন, বাড়ি করতে গেলে মেয়ের বিয়ের টাকা থাকে না। মেয়ের বিয়ে দিলে বাড়ির টাকা থাকে না। অথচ দুটোই দরকার।
চয়নকে কথাটা স্বীকার করতে হল।
সত্যেশবাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, এইজন্যই লোকে ঘুষ খায়। বুঝলে? কিন্তু সরকারকে কথাটা কে বোঝবে বলো তো! আমি অবশ্য ওসব টাকা দুই না। কিন্তু তাতে লাভটা কী হল?
চয়নকে একথাটাও মানতে হয় যে, সততার কোনও দাম নেই।
ভদ্রমহিলা পরদিন তাকে চা খাওয়ালেন। সত্যেশবাবু ছিলেন না। অনিন্দিতা আর তার মা ছিল। চা খুব খারাপ কোয়ালিটির সঙ্গে বিট ছিল, সেটা খেতে ইচ্ছে করল না চয়নের।
তোমার মায়ের কথা শুনলাম। তুমি নাকি মায়ের খুব ন্যাওটা ছিলে!
চয়ন কী বলবে। না ভেবেচিন্তেই বলল, আমি রোগা বলে মায়ের একটা টান ছিল হয়তো।
ওটাই তো হয়। কমজোরি সন্তানের ওপর মায়ের মায়া বেশি। দাদা-বউদির সঙ্গে তোমার বনিবনা কেমন?
চয়ন সতর্ক হল। সে জানে, চায়ের নেমন্তনের সময়টা ওরা বেশ ভালই বেছেছে। আজ দাদা-বউদি সিনেমায় গেছে। বাড়ির ঝি শুধু আছে ওপরে। কূটকালির প্রকৃষ্ট সময়। সে উদাসভাবে বলে, আমার সঙ্গে সম্পর্ক তো খুবই ভাল।
ভাল হলে বুঝি তোমাকে বেঁধে খেতে হত।
অনিন্দিতা মৃদু ধমক দিল, আঃ মা। ওসব কথা থাক।
ভদ্রমহিলা থেমে গেলেন।
মাকে সরিয়ে মেয়ে তার ভূমিকা নিল, আপনি তো গ্র্যাজুয়েট, না?
হ্যাঁ।
দিদি বলছিল, আপনি ইংরিজি আর অঙ্কে খুব স্ট্রং! তাহলে কম্পিটিটিভ দেননি কেন?
চয়ন মৃদু হেসে বলল, দেওয়া হয়নি নানা কারণে।
সংসারের অশান্তি বুঝি?
পোড়-খাওয়া চয়ন শুধু একটু হাসল। কিছু বলল না। এরা তার কাছ থেকে কথা আদায় করতে চায় নাকি? তাহলে এদের সম্পর্কে তাকে আরও সজাগ থাকতে হবে।
সতর্কই ছিল চয়ন। তবু সম্পূর্ণ এড়ানো যায় না। নার্সিং হোমে মেয়েটির শিফট ডিউটি। চয়ন যখন সকালের টিউশনি সেরে এসে দুপুরের ভাত রাঁধতে বসে তখন ডিউটি অফ থাকলে মেয়েটি ছাদে শাড়িটাড়ি মেলতে এসে পিঠের কাছে দাঁড়িয়ে গল্প করে।
কী রাঁধছেন? আচ্ছা, রোজ ওই খিচুড়ির মতো কী একটা করেন বলুন তো?
চয়ন বলে, এটা খুব স্বাস্থ্যকর। চালডাল সবজি সব একসঙ্গে চাপিয়ে দিই। একবারেই হয়ে যায়।
এমা! রোজ একরকম খান কী করে?
আমার তো খারাপ লাগে না।
একটু ঘি দিলেও না হয় হত।
ওসব আমার সহ্য হয় না।
মশলা লাগে না?
না, তাও লাগে না?
আপনাকে নিয়ে পারা গেল না। আচ্ছা, একটু শুকতো খাবেন? আমাদের আজ শুকতে হয়েছে।
