রাঙা খুব হাসল, তাহলে তো আমি হালকা হই। এর পর পটলের বাপ বা ঠাকুমা দাদু সবাইকেই নিয়ে যাওয়ার বায়না করবে না তো! সে ভাই পেরে উঠব না।
গোপালকে ঘুরে ঘুরে দেখে বীণা। একা বরে তাকে আদর করে, আর ভাবে, আহা! আমার এরকম একটা হল না।
সাত দিন পেরোনোর পর বীণাকে বনগাঁয়ে যেতেই হল। শেষ অবধি গোপালকে নেওয়া হল না। দোনোমোনো করে টাকাটাও সঙ্গেই রাখল। গচ্ছিত রেখে যেতে ভরসা হল না।
বনগাঁয়ে ফিরল সন্ধেবেলা। ঘর খুলল। হ্যারিকেন জ্বালল! চারপাশ ঘুরে ঘুরে দেখল। সবই এক আছে। তবু কঁকা। বড় ফাঁকা। নিমাই নেই।
রাতে আর রান্না করল না বীণা। কয়েকখান রুটি আর আলুর ঘাট রাস্তায় খাওয়ার জন্য করে দিয়েছিল মা। সেটা খাওয়া হয়েছিল না। রাতে সেই ঠাণ্ডা রুটি তরকারি খেয়ে শুয়ে রইল।
শ্যামল তার ফেরার কথা জানত না। রাতে শুতে এসে বলল, ও তুমি এসে গেছ? ভালই হয়েছে। কাকা তোমার খোঁজ করতে এসেছিল কাল।
ওঃ, কিছু দরকার আছে?
তা বলেনি। তবে মুখটা খুব গম্ভীর দেখছিলাম।
বীণা একটু ভয় পেয়ে গেল কি? মুখে কিছু বলল না। কিন্তু গভীর রাতে সে একটা নতুন গর্ত খুঁড়ে একটা মেটে হাঁড়ির মধ্যে সরা চাপা দিয়ে প্যাকেটটা রাখল। গর্ত ভরাট করে লেপে পুঁছে দিল। তারপর দুশ্চিন্তার পাথর বুকে নিয়ে শুয়ে রইল।
০৫২. চিলেকোঠাটা এত ছোটো
চিলেকোঠাটা এত ছোটো যে একটা চৌকিও ভাল করে আঁটে না। টেবিল চেয়ার বা আলনা গোছের কোনও আসবাব চয়নের নেই, তাই রক্ষা। চৌকিটা এটে গেল কোনওরকমে। একদিকের দেয়ালে সঁটিয়ে দেওয়ার পর অন্য দিকের দেয়ালের সঙ্গে দু বিঘং পরিমাণ ফাঁক রইল। লম্বালম্বির দিকটায় ফাঁক পাওয়া গেল ফুট দেড়েক। চয়নের মনে হল, এই ঢের। এর চেয়ে বেশি সে আর কী চায়? আঁটিয়ে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টাই তো সে করে এসেছে এতদিন। তার জীবনসগ্ৰাম তো এটুকুই। অল্পের মধ্যে, কমের মধ্যে নিজেকে সন্তৰ্পণে আঁটিয়ে নেওয়া। ঘরে জায়গা না থাক, ছাদটা আছে। খুব বড় নয়, তবু সেইটাই ঢের বেশি বলে মনে হয় তার। হু-হু করে হাওয়া বয়, বুক ভরে দম নিতে কোনও অসুবিধে নেই। চিলেকোঠার ছাদ নেই, অ্যাববেস্টস। একটা ফুটো-ফাটা আছে, বর্ষায় জল পড়বে। তা পড়লেও খুব একটা ক্ষতি নেই। বিছানাটা গুটিয়ে রাখলেই হল। সুবিধে রান্না নিয়ে। রাধবার জায়গা ওই ফুট দেড়েক জায়গা। তারও একটা সমাধান মাথা খাঁটিয়ে বের করে ফেলেছে সে। চৌকাঠে বসলে ঘরের দিকে মুখ করে ফুট দেড়েক জায়গায় স্টোভ জ্বেলে দুটি ডালভাত ফুটিয়ে নেওয়া শক্ত কাজ নয়। বাথরুমটা অবশ্য একতলায়। নতুন ভাড়াটে এলে সেটা ব্যবহার করতে দেবে কি না সন্দেহ থেকে যাচ্ছে। দাদা-বউদি এখন তেমন খারাপ ব্যবহার করছে না। হয়তো এই সমস্যারও একটা সমাধান হয়ে যাবে। আপাতত অত ভেবে মনকে ভারাক্রান্ত করে লাভ নেই। খোলা ছাদ ও এক চিলতে ঘর এখন তার কাছে লটারির ফার্স্ট প্রাইজ বলে মনে হচ্ছে। একতলার এঁদো ঘরের চেয়ে এ তো স্বৰ্গবাস। আরও একটা নিশ্চিন্দির কথা হল, বউদি একশ টাকা করে ভাড়া নিতে রাজি হয়েছে। প্রথমটায় রাজি হচ্ছিল না। বলেছিল, ভাড়া কেন? তুমি বরং এ পাড়াতেই একখানা ভাল ঘর দেখ। এ বাড়িতে তো তোমার অসুবিধেই হচ্ছে।
চয়ন বলেছে, তা নয় বউদি, অসুবিধে আমার নেই। বরং তোমাদেরই হচ্ছে, যতদিন ঘর না পাই ততদিন সামান্য কিছু নাও। ইলেকট্রিক বিল, বাড়ির ট্যাক্স বাবদও তো খরচ আছে।
তোমার সামান্য আয়।
চলে যাবে বউদি। আমার অল্পেই চলে। মা নেই বলে বরং খরচ বেঁচে গেছে খানিকটা।
বউদি দোনোমোনো করল। তারপর বলল, ঠিক আছে, একশ টাকা করে দিও। কিন্তু ঘরেরও খোঁজ রেখে। চিলেকোঠায় আমাদের সব পুরোনো জিনিসপত্র থাকে! তোমার জন্য সব সরাতে হয়েছে। দোতলায় আর কতটুকুই বা
জায়গা বলো। একতলায় ভাড়াটে আসছে, সেটা খালি করে দিতে হবে।
এ ঘরের মেয়াদ কতদিন চয়ন তা জানে না। একটা অনিশ্চয়তা থেকেই গেল। সম্পর্কটা হয়তো এই ঘরের দখলদারি নিয়েই ফের খারাপ হতে থাকবে।
এক রবিবারের সকালে ভাড়াটেরা এল। টেম্পো থেকে যখন তাদের তৈজসপত্র নামানো হচ্ছিল তখন ছাদ থেকে দেখছিল চয়ন। জিনিসপত্র দেখে অনুমান হল, এরাও নিছক মধ্যবিত্তই। এ বাড়িতে অবশ্য খুব পয়সাওলা লোকের ভাড়া আসবার কথা নয়। তবু প্রত্যাশা তো নানারকম থাকে।
লোকগুলোর চেহারাও মধ্যবিত্ত ধরনেরই। মাঝবয়সী একজন রোগা খেঁকুরে ধরনের লোক, তার সাধারণ চেহারার গিন্নি আর একটি যুবতী মেয়ে। মেয়েটিও কালো, রোগা এবং শ্রীহীন। তবে সে-ই সর্দারি করছিল। কুলিদের ধমক-ধামক দিল, মা-বাবাকেও শাসন করছিল রাস্তায় দাঁড়িয়েই। বেশ ডাকাবুকো এবং মুখরা মেয়ে। চয়ন যুবক হিসেবে কিছুই নয়। তার যৌবন বয়ে যাচ্ছে সে টেরও পায় না। কোনও যুবতীকে দেখলেও তার চাঞ্চল্য হয় না।
এ যুবতীটিকে দেখে অবশ্য চাঞ্চল্যের কারণও নেই।
সামান্য জিনিসপত্র। আধঘণ্টার মধ্যেই জিনিস উঠে গেল ঘরে। নিচের তলায় তেমন সোরগোল উঠল না। নিচের তলার বাথরুম এদের সঙ্গেই ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতে হবে তাকে—এই দুশ্চিন্তাটা রোববারের সকালটায় তাকে কিছু বিমর্ষ রাখল। এরা যদি আপত্তি করে? যদি অপমান করে তাকে?
ভিতরের উঠোনটা ছাদ থেকে দেখা যায়। চয়ন উঠোনের দিকে চেয়ে লোকগুলিকে অনুধাবন করার চেষ্টা করল। বউদিদের নতুন ঝি তিন কাপ চা আর কয়েকখানা বিস্কুট একটা ট্রেতে সাজিয়ে নিয়ে গিয়ে পৌঁছে দিল ঘরে। তারও কিছুক্ষণ পর বউদিও গেল। অনেকক্ষণ বাদে ভদ্রলোককে দেখা গেল, উঠোনে বেরিয়ে চৌবাচ্চার কাছে এসে এক মগ জল তুলে হাত ধুচ্ছে। ধুতির ওপর গেঞ্জি, তার ওপর একটা ফুলহাতা সোয়েটার। লোটা ভাল না মন্দ, রাগী না শান্ত তা অনুমান করা শক্ত। চয়ন শুনেছে, ভদ্রলোক বউদির দূরসম্পর্কের পিসেমশাই এবং রাইটার্সে কাজ করেন। শেয়ালদা নর্থ লাইনে সোদপুর বা কোথাও ভদ্রলোকের একটু জমি কেনা আছে, সেখানেই বাড়ি করে রিটায়ার করার পর চলে যাবেন। এইটুকু তথ্য একজনের চরিত্র সম্পর্কে অনুমান করার পক্ষে যথেষ্ট নয়।
