টাকাটা কত হতে পারে তাই ভাবছি।
হিসেব করিনি। তবে আমাদের কাছে অনেক।
আরও খুন হয়েছে নাকি?
হয়েছে। কিন্তু কোনটাই তো আমার দোষে হয়নি। আমি তো টাকাটা চুরি করিনি। তোমার জামাই তোমাকে উল্টো বোঝায়নি তো!
না। এরকমই যেন বলছিল।
তাহলে বাবা? টাকাটা রাখবে তোমার কাছে?
গচ্ছিত থাকলেই কি হয়? টাকা রক্ষা করার সাধ্যি কি আছে?
তার মানে?
টাকা রক্ষা করা এক মস্ত দায়। আমার বয়স চলে গেছে, মাথা কাজ করে না, চারদিকে সব লোভী চোখ। আমার কাছে কি রাখতে আছে? মোটাবুদ্ধির কাজ হবে না।
তাহলে কী হবে বাবা?
মাথা ঠাণ্ডা করে খানিক ভাব। টাকার সঙ্গে অনেক বিপদ-আপদ লেগে থকে। ও গুলোই টাকার ময়লা।
আমার যে বনগাঁয়ে ওই টাকা নিয়ে যেতে ভরসা হয় না।
বনগাঁ থেকে তাহলে বাস উঠিয়ে দে। পালপাড়ায় গিয়ে থাক।
তুমি যে কী বলো না, তার ঠিক নেই। বনগাঁ ছাড়লে মাসকাবারি মাইনে কে দেবে শুনি? সেটাই তো কঠিন প্রশ্ন।
কয়েকটা দিন বাবা। তারপর বিপদ কাটলে এসে নিয়ে যাবে।
কাটবে।
কাটবে বাবা। কদিন পর আর লোকে ও টাকার খোঁজও করবে না।
এই হুট করে বাপের বাড়ি এলি, এতে লোকের সন্দেহ হবে না?
অত কে ভাবছে বলো?
তুই কবে যাবি?
দিন সাতেকের কথা কাকাকে বলে এসেছিলাম। দু-চারদিন বেশী থাকলে দোষ হবে না।
তাহলে একটা দিন টাকার কথাটা ভুলে যা। ভাল করে খা, ঘুমো। আর কষে ভাবতে থাক।
আমার মাথায় অত ভাবনা আসে না। কী ভাববো?
টাকার কথাই ভাব। টাকাটা দিয়ে কী হবে, কী করতে চাস, এসবই ভাবতে থাক। টাকাটা পেয়ে তোর লাভ হল, না লোকসান হল, তাও ভাব।
লোকসান কেন হবে বাবা?
লোকসান নানারকম আছে। ভেবে দেব।
তোমার জামাই কোথায় গেছে, কিছু বলে গেছে?
স্পষ্ট করে নয়। তবে মনে হয় বাপ-মায়ের কাছেই যাবে প্রথমে। ওদিকে খুব টান।
সেটাই হয়েছে আমার আর এক জ্বালা।
বিষ্ণুপদ ভ্রূ কুঁচকে বলে, তোর শ্বশুর শাশুড়ি কি ভাল নয়?
ভাল হবে না কেন? ভালই। তবে তারা সব কাঙাল ধরনের লোক। সবসময়ে হাতজোড় করে আছে যেন।
সেটা তোর ভাল লাগে না?
কেন লাগবে? একটু লোভীও।
পয়সা না থাকলে মানুষ কি আর মানুষ থাকে? কি-রকম ধারা হয়ে যায় যেন। এখন যা, পুরনো খেলুড়ি আর বন্ধুদের সঙ্গে বেশ করে কয়েকটা দিন গল্প–টল্প কর। অত ভাবিস না।
তোমার জামাই যে নতুন চিন্তায় ফেলে গেল।
জামাই তোকে বিপদে ফেলবে না ইচ্ছে করে। সে তেমন লোক নয় বোধ হয়।
তার আহাম্মকিকেই যে ভয় পাই।
বিষ্ণুপদ একটু হাসল। বলল, আহাম্মক ছাড়া আর কী? খুব আহাম্মক। এ যুগে অচল।
বাপের বাড়ি সাতটা দিনই কাটাল বীণা। তবে খুব আনন্দে নয়। নিমাইয়ের কোনও খবর নেই। বনগাঁয়ে কী হচ্ছে কে জানে! ঘরে পাশের বাড়ির একটা ছেলের রাতে এসে শোওয়ার কথা, সে গুচ্ছে তো! নানা চিন্তা।
বনগাঁ যাওয়ার দু-দিন আগে রাঙা ফিরে এল।
মেজদা মেজবৌদি কথাই বলে না বীণার সঙ্গে। আলাদা ঘরে তারা নিজেদের মতে থাকে। এসে একবার গিয়ে প্ৰণাম করে এসেছিল তাদের। দায়সারা একটু কুশল প্রশ্ন করেছিল। দেখে খুশি হয়েছে বলে মনেও হল না। কেমন আলগা ভাব।
সেই তুলনায় সেজো রাঙা কিছু মিশুকে। বীণাকে দেখে জড়িয়ে ধরে বলল, ইস! কত দিন আসেনি।
বেশ গল্প হল রাঙার সঙ্গে। তার চেয়েও বেশী ভাল লাগল দুটো ভাইপোকে। তারা পিসির সঙ্গে সারাদিন লেগে থাকে। গোপাল কথা কইতে পারে না, কিন্তু তারও বুকে কথা আছে নিশ্চয়ই। সে চোখ দিয়ে সেই কথা বলে। তাই গোপালের চোখদুটো অমন মায়াবী বোধ হয়।
ও সেজবউদি, তোমার তো দু-দুটো আছে, গোপালকে দাও না আমায়। আমি পুষ্যি নেবো।
নাও না ঠাকুরঝি, নিলে তো বাঁচি। ওটার জন্য ভেবে ভেবেই তো আমার বুকের দোষ হওয়ার জোগাড়।
তুমি মুখে বলছে, সত্যিই কি আর দেবে?
রাঙা হেসে বলে, যার সম্পত্তি তাকে একবার জিজ্ঞেস করে নাও। ওর বাপকে।
সেজদা! সেজদা আপত্তি করবে না।
তাহলে তো ভালই। কিন্তু পুষ্যির কথা বলছো কেন গো? তোমার কি হতে নেই?
লজ্জা পেয়ে বীণা বলে, কই আর হল?
সে তুমি যাত্ৰা-থিয়েটার করে বলে হওয়াচ্ছে না। বাচ্চা হলে ফিগার নষ্ট হওয়ার ভয় থাকে, তাই না বলো!
না গো, বাচ্চার ঝক্কি আছে। দেখবে কে?
লোক রাখবে। পয়সার তো আর অভাব নেই!
না নেই! তোমাকে বলেছে। আমি কি সিনেমায় পার্ট করি যে, পয়সা থাকবে?
শুনি যে!
কী শোনো?
তোমার নাকি অনেক পয়সা!
ছাই শুনেছো। দাও না গো এটাকে। খুব আদর করে রাখব, দেখো।
নিমাইবাবুর অনুমতি নিয়েছো?
নিমাইবাবুর অনুমতি! কেন বলো তো! এতে তার অনুমতির আবার কী দরকার?
পুরুষ মানুষরা ভাই, অন্যের ছেলেপুলে ঘরে ঢোকানো পছন্দ করে না।
তোমার সব অদ্ভুত ভাবনা! সে লোক খারাপ নয়। বাচ্চা-কাচ্চা ভালও বাসে।
দেখো বাপু।
সে দেখব। আগে বলো দেবে কিনা।
রাঙা ফাঁপরে পড়ে বলে, দিতে আপত্তি নেই। কিন্তু তুমি সামলাতে পারলে হয়! বোবা বটে, কিন্তু ভীষণ দুষ্টু।
হোক গে। একটাকে ঠিক সামলে রাখব।
খুব বুঝে চলতে হবে কিন্তু। খিদে পেলে রেগে যায়।
তুমি এবার ফাঁড়া কাটছো।
না গো। বোবা ছেলের মনের কথা না বুঝলে বিপদ। এখানে সবাই মিলে দেখে রাখি। ওখানে তুমি আর নিমাইবাবু। তা বটে।
তাই বলছিলাম, নিতে চাচ্ছো নাও, কিন্তু কঠিন হবে। আরও একটা কথা আছে। ও সবচেয়ে বেশী ভালবাসে কাকে জানো? পটলকে। সারাদিন পটল ওকে বুকে-বুকে করে আগলে রাখে। দাদা ছাড়া গোপাল অচল।
তাহলে আমাকে দুটোই দাও।
