ওরে না, ভয় পাওয়ার মতো কথা নয়। মাঝে মাঝে বেবাক ভুল হয়ে যায়। বেঁচে আছি, না মরে গেছি। মাঝরাতে স্বপ্ন-টপ্ন দেখলে ওরকম হয়। তখন খিদে পেলে বা বাহ্যে পেচ্ছপের বেগ হলে বুঝতে পারি না, বেঁচেই আছি। তাই বলছিলাম।
বীণা ফিকে একটু হাসল, তোমার মাথায় সব উদ্ভট চিন্তা।
বিষ্ণুপদ নির্বিকারভাবে বলে, ওই ঘরখানার কাছে আমি কত কিছু শিখি!
ঘরের কাছে শেখো! সে কী গো বাবা! ঘরের কাছে আবার শিখবে কি? তোমার মাথাটাই গেছে।
তাও গেছে। মাথাটা চিরকালই গবেট। এ মাথা দিয়ে কিছু করতে পারলাম না মা।
দুঃখ পেলে বাবা? ওভাবে বলিনি।
ওরে না। দুঃখ-টুঃখ আজকাল আর তেমন হয় না। ওসব পার হয়ে এসেছি। এখন শুধু চারদিকটা চেয়ে চেয়ে দেখি। আগে যা সব দেখেও দেখতে পেতাম না, এখন তা পাই। সময় দিব্যি কেটে যায়।
বীণাপাণির ঘোর সন্দেহ হতে থাকে, তার বাবার মাথায় একটু ছিট দেখা দিয়েছে। বরাবরই একটু যেন ছিল, এখন বেড়েছে।
আমার কথা তোমার মনে হয় বাবা?
বিষ্ণুপদ ঘরখানার দিকে চেয়ে ছিল। বলল, হয়। সকলের কথাই মনে হয়। মনে-হওয়া নিয়েই তো আছি। এখন তোর কথা আরও বেশী মনে হয়।
কেন বাবা? বিষ্ণুপদ চোখ না ফিরিয়েই বলে, নিমাইকে ধরে রাখতে পারলি না মা! বীণা একটু চমকে উঠল, ধরে রাখব মানেতাকে তো একটা কাজে পাঠিয়েছি।
বিষ্ণুপদ নিরুত্তেজ গলায় বলে, তার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। অন্ধকারেই বেরিয়ে যাচ্ছিল, ডেকে বসিয়ে কথা কইলাম। তারপর টর্চ ধরে এগিয়ে দিলাম বটতলা অবধি। বড় দাগা পেয়েছে।
বীণা কিছুক্ষণ স্তব্ধ থেকে বলল, কি কথা হল?
সব কি মনে আছে! নানা কথাই হচ্ছিল।
এড়িয়ে যেও না বাবা। কী বলে গেল তোমাকে?
বিষ্ণুপদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, নিমাই কাঁদছিল।
বীণা পুরুষের কান্না সহ্য করতে পারে না। কান্নার কথায় তার রাগ হল। ঝাঁঝের গলায় বলল, ভ্যাত-কাঁদুনে পুরুষ দু চোখে দেখতে পারি না। কী বলে গেল তোমাকে? ডেকে তুলেছিল নাকি ঘুম থেকে।
না। আমার মাঝে মাঝে বায়ু চড়ে যায়। তখন বারান্দায় এসে বসে থাকি। হঠাৎ শুনলাম তোদর ঘরে দরজা খোলার শব্দ। তারপরই নিমাইয়ের কান্নার শব্দটা পাই। ডেকে বসালাম।
আমার নামে অনেক কুচ্ছো গেয়ে গেছে, না?
বিষ্ণুপদ যেন শঙ্কিত চোখে একবার মেয়ের দিকে তাকিয়ে নিল। তারপর ফের চোখ সরিয়ে নিয়ে বলল, তোমার বিয়েটা যে ভাল হয়নি মা, তার জন্য আমিই দায়ী। তুমি যদি আজ আমাকে খুব বকাকি করো, গালাগাল দাও, তাতে যদি তোমার বুকটা ঠাণ্ডা হয়, তো তাই করো না।
ও কথা কেন বলছে বাবা! তোমাকে বব কেন! আমারও কি কপালের লিখন বলে কিছু নেই?
কপালের কথা আজকাল আমার তেমন বিশ্বাস হয় না। কর্মফলে হয়। মানুষ মোটাবুদ্ধির হলে বড় ভয়ের কথা। সে যে কত অকাজ করে ফেলতে পারে। আমার মতো আহাম্মক নেই।
কথা ঘুরিয়ে ফেলছে কিন্তু বাবা। বলতে চাইছো না।
নিমাই তোর নামে বানিয়ে কিছু বলেনি। সে তেমন লোক নয়। সেও হয়তো আহাম্মক, কিন্তু পাজি নয়।
পাজি নানা রকমের হয়। তোমার জামাই আমার জন্য কী করেছে বলো তো! অন্য মেয়ে হলে কবে ছেড়ে চলে যেত। আমিই যে পেলে-পুষে রেখেছিলাম ওকে! শুধু ওকেই বা কেন, ওর বাপ-মা কার পয়সায় খেয়ে-পরে আছে বলো! তার এই প্রতিদান?
বিষ্ণুপদ একটু ভেবে নিয়ে বলল, তুই কি যাত্ৰাদলে অনেক টাকা মাইনে পাস?
না বাবা। কিন্তু কষ্ট করে হলেও তো পাঠাই!
তোকে কত করে মাইনে দেয়?
তার কি কিছু ঠিক আছে! পালা যখন চলে তখন কিছু বেশী দেয়, যখন পালা থাকে না, তখন তিনশো-চারশো, যখন যেমন হয়। তবে কাকা লোক ভীষণ ভাল। যাত্রা তার প্রাণ। আর আমাকেও খুব দেখে। তাই বেঁচে বর্তে আছি।
তুই কি এখন পালা ছাড়াও অন্য কাজ করে দিস?
দিই বাবা। কাকার টাকাপয়সার জিম্বা আর হিসেব রাখি। এ কাজটা তোমার জামাইয়ের করার কথা ছিল। সে পাপের টাকা বলে কাজটা নেয়নি। আমি নিয়েছি। কলিযুগে বেঁচে থাকা ছাড়া আর কোন ধর্ম আছে বলো! ধর্ম ধুয়ে কি জল খাবো
বিষ্ণুপদ মাথা নেড়ে বলে, ঠিকই কথা।
ধৰ্ম ধরে বসে থাকলে কোথায় তলিয়ে যেতাম তার ঠিক নেই। তোমার জামাই কথাটা বুঝতে চায় না। কেবল কোনটায় ধর্ম হল, কোনটায় অধর্ম হল, তাই বিচার করে মরছে। অথচ ফুটো পয়সার মুরোদ নেই।
তাই কি কাল ওকে বকেছিলি?
না বাবা। সব তুমি জানোনা। তোমার জামাই তোমাকে কী বলেছে কে জানে। তবে তার জবানিতে শুনেছে, এবার আমারটাও শোনো। আমার কাছে কিছু বিদেশি টাকা আছে। চুরিও করিনি, জোচ্চুরিও করিনি। একজন গচ্ছিত রেখেছিল। সে খুন হয়ে যায়। তার কোনও ওয়ারিশ নেই। এখন বলো টাকাটা আমি কাকে ফেরত দেবো? যারা টাকাটা চায় তাদের কারোই ওটা হকের টাকা নয়। তাহলে কি আমার অধর্ম হল নাকি? টাকার গায়ে কি কারও নাম লেখা আছে?
তা বটে। তুমি আমার কথাটা বুঝতে পারছে বাবা? পারছি। টাকা কি অনেক?
তা, খারাপ হবে না। ডলারের দাম ওঠে পড়ে। রোজ একরকম থাকে না।
কাঁচা ঘরে থাকিস, তোর চোর-বাটপাড়ের ভয় নেই?
নেই আবার! খুব আছে! সেইজন্যই তো তোমার কাছে গচ্ছিত রাখতে চেয়েছিলাম। রাখবে বাবা?
রাখলে তোর সুবিধে হবে?
হবে বাবা। বনগাঁয়েই তো বেশী ভয়। সেখানে ওই টাকা নিয়ে ধুন্ধুমার হচ্ছে। একটা পাজি লোক জেনেও গেছে। সেটা তোমার জামাইয়ের দোষেই। যদি বলে দেয় তো আমার ওপর হামলা হতে পারে।
বিষ্ণুপদ একটা হাসল।
হাসছে কেন বাবা?
