প্রথমটা ছিল প্রোলগ মাত্র। নেহাতই ভূমিকা। পীয়তারা। বহাস্ফোট। লড়াইটা তখন শুরুই হয়নি।
দ্বিতীয়টা এল দিগ্বিজয়ী ঘোড়সওয়ারের মতো। সারা পৃথিবী জুড়ে তার দাপট। বুড়ো-বাচ্চা, ধনী-নির্ধন, পাবলিক-ভি আই পি সকলেই নতজানু তার কাছে। হার্ট অ্যাটাক-এ দুটি শব্দ যেন দামামা বাজিয়ে দেয় বুকে।
কে জানে কেন, হার্ট অ্যাটাক কথাটা অপর্ণার ভাল লাগে। একটা স্পর্ধিত আভিজাত্য, একটা অমোঘ পরিণতির ধ্বনি আছে তাতে। অথচ কী সর্বনেশে ব্যাপার। একটা হার্ট অ্যাটাক মানে কত জন মানুষের কত কী বন্ধ হয়ে যাওয়া।
মণীশ যদি চলেও যায় তাদেরও কত কী বন্ধ করে দিতে হবে। প্রথমেই বন্ধ হবে সব বিলাসিত, বাহুল্য, বড়লোকী। তারপরও হিসেব করে টিপে টিপে চলা শুরু হবে। এখন যেমন তাদের ছেলেমেয়েরা পাতে মাছ বা ভাত ফেলে উঠে যায়, অপ্রয়োজন ফ্যাশনের জিনিস কিনে উড়িয়ে দেয় টাকা, অন্যায্য বায়না করে বসে, ঠিক তেমনটি তো আর হবে না!
মোহিনী উঠে এল রান্নাঘরের দরজায়, মাসীমা, যাচ্ছি। আঙ্কল তো এখন আউট অফ ডেনজার, তাই না?
কে জানে বাবা! তুমি কিন্তু রোজ এসো।
আমি প্রায় রোজই আসি। তবে টিউটর পড়াতে আসেন তো সন্ধেবেলায়, তাই এ সময়টায় আসা যায় না।
যখন খুশি এসো। আমি তো বাড়িতেই থাকি।
মোহিনী চলে গেল। আচমকা অপর্ণার মনে হল, আচ্ছা, মোহিনীর সঙ্গে অনীশের কোনও গোপন ভাবসাব নেই তো? আঠারো বছরের ছেলে, চৌদ্দ বছরের মেয়ে!
০০৫. দোকানটায় ঢুকতে একটু লজ্জা করছে
দোকানটায় ঢুকতে একটু লজ্জা করছে হেমাঙ্গর। প্রায় রোজই সন্ধের দিকে এসে হানা দিচ্ছে, একটি জিনিসই রোজ খুঁটিয়ে দেখছে এবং রোজই নানা নতুন প্রশ্ন করছে জিনিসটা সম্বন্ধে—এতে ওরা বিরক্ত হচ্ছে কি?
অবশ্য কোনও দোকানদারই হেমাঙ্গর ওপর বিরক্ত হয় না। যারা মোটামুটি ভাল দোকানদার তারা লোকের মুখ দেখেই অভ্যন্তরকে বুঝে নিতে পারে। এ দোকানটায় দত্ত বলে যে লোকটি আছে তার সঙ্গে সামান্য আলাপ হয়ে গেছে তারা। ধৈর্যশীল দত্ত রোজ তাকে মাইক্রোওয়েভ সম্পর্কে জ্ঞানদান করে। ছাত্রের মতো শেখে হেমাঙ্গ। আর জিনিসটাকে অত্যন্ত পরীক্ষামূলক চোখে দেখে। পরশু দত্ত একটা লাইভ ডেমনস্ট্রেশন দিয়ে দেখিয়েছে, মাইক্রোওয়েভে বাস্তবিকই ছমিনিটে ভাত রান্না হয়। এবং তার ফ্যান গালাবার দরকার হয় না। চাল আগে থেকে ভিজিয়ে রাখতে হয়। জলটা মেপে দিলে ফ্যান শুষে ভাত ঝরঝরে হয়ে যায়। ঠাণ্ডা। চায়ের কাপটি মাইক্রোওয়েভে রাখলে মাত্র কয়েক সেকেন্ডে চা আগুনগরম হয়ে যায় এবং চায়ের স্বাদগন্ধে কোনও অশুভ বদল ঘটে না। মিয়ানো মুড়ি বা ন্যান্তানো বিস্কুট ফের নতুন মুড়ি আর টাটকা বিস্কুট হয়ে ওঠে। ফ্রিজের ঠাণ্ডা জিনিস। কয়েক সেকেন্ডে হয়ে যায় পাইপিং হট। সবচেয়ে অদ্ভুত হল, মাইক্রোয়েভে জিনিসটাই গরম হয়, কিন্তু পাত্ৰটি নয়। যত দেখছে তত মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছে হেমাঙ্গ। যত মুগ্ধ হচ্ছে ততই লজ্জিত হয়ে পড়ছে ভিতরে ভিতরে। এই সব জিনিস—অত্যাধুনিক সব যন্ত্রপাতি বা ভোগ্যপণ্যের ছলাকলায় সে যে কেন এত সহজে বশ মানে তা সে ভাল বুঝতে পারে না। মদ মেয়েমানুষ মারিজুয়ানা কি এর চেয়ে বেশী বিপজ্জনক?
খুবই কুণ্ঠিতপায়ে, প্রায় নববধূর মতো সে প্রকাণ্ড দোকানঘরটায় ঢুকল। দিব্যি স্প্রিং এর দরজা। ভিতরটা ঠাণ্ডা এবং শব্দহীন। থরে থরে শুধু জিনিস আর জিনিস। যথেষ্ট খন্দেরের ভিড়।
দত্তই তাকে প্রথম দেখল। বোধহয় শিকারীর চোখে অপেক্ষা করছিল তারই জন্য। দত্তর অভিজ্ঞ চোখ হেমাঙ্গর নির্মোক এবং প্রতিরোধ ভেদ করে দেখতে পাচ্ছে, ভিতরে ভিতরে হেমাঙ্গ ক্ৰমে দুর্বল হয়ে পড়ছে। হার মেনে নিচ্ছে। দুমাস আগে এই দত্তই তাকে ওয়াশিং মেশিনটা গছিয়েছিল, ঠিক একইভাবে। ধীরে ধীরে। অপেক্ষা করে করে। সুতো ছেড়ে ছেড়ে। আপনজনের মতো, বাল্যবন্ধুর মতো ব্যবহার করে করে। আর ওয়াশিং মেশিনটাও নীরবে নিবেদন করেছিল তার হৃদয়, যদিদং হৃদয়ং তব, তদিদং…
আরে, আসুন স্যার। গুড ইভনিং।
ওই দুর্দান্ত স্মার্ট লোকটা আসলে মাকড়সা। তার চারদিকে এই সব অত্যাধুনিক জিনিসপত্রের মায়াজাল পাতা। আর হেমাঙ্গ নিয়তি-নির্দিষ্ট সেই পতঙ্গ। নইলে স্বক্ষেত্রে হেমাঙ্গ কিছু কম স্মার্ট নয়। নিজস্ব ক্ষেত্রে সেও তো লোককে হিপনোটাইজ করে। তবু এইসব ভোগ্যপণ্যের কাছাকাছি এসে যে কেমন যেন এলিয়ে পড়ে। কেমন যেন আনস্যাট, লজ্জাতুর, আত্মবিশ্বাসহীন লাগে নিজেকে।
জিনিস কিনতে সে ভীষণ ভালবাসে। অথচ খামোখা যে এত জিনিস কিনে ঘরে জঞ্জাল বাড়ানো উচিত নয় এটাও সে ভালই জানে। জিনিস কেনা নিয়ে বিভিন্ন মানুষের কাছে তাকে যথেষ্ট ভর্ৎসনা সহ্য করতে হচ্ছে। মনের এই দ্বান্দুক প্রতিক্রিয়া-টু বি অর নট টু বি—তাকে কাহিল করে ফেলছে কি? তাই দত্তের মুখোমুখি সে গোবেচারার মতো দাঁড়িয়ে আছে আজও।
দত্ত সামান্য উঁচু গলায় ডাকল, গৌরী, প্লীজ মিস্টার চট্টরাজকে একটু অ্যাটেন্ড করো।
সাইনবোর্ডের মতো মিষ্টি মেকানিক্যাল হাসি মুখে ঝুলিয়ে গৌরী এল, আসুন স্যার। মাইক্রোওয়েভ তো!
ওই আর কি! বলে হেমাঙ্গর মনে হল, কথাটার আদ্যন্ত কোনও মানেই হয় না। সে ভিতরে ভিতরে এত লজ্জিত ও কুণ্ঠিতহয়ে পড়েছে যে, ভেবেচিন্তে সাজিয়ে-গুছিয়ে কিছু বলছে না।
ডিসপ্লে সারকেলে চূড়ান্ত পোজ নিয়ে চারখানা মাইক্রোয়েভ তাকে একযোগে কটাক্ষে বিদ্ধ করল।
