যা খুশি। আবোল-তাবোল।
হেমাঙ্গর মন বার বার ব্ৰেক কষছে। এগোতে পারছে না। কথা হারিয়ে যাচ্ছে। ইচ্ছার বিরুদ্ধে, বুদ্ধি ও বিবেচনার বিরুদ্ধে এ সে কোন আবেগে ভেসে যাচ্ছে।
০৫১. নিমকহারাম শব্দটা
নিমকহারাম শব্দটাই বারবার মুখে উঠে আসতে চাইছে। এই লোককেই না বীণাপাণি মরণের হাত থেকে উদ্ধার করে এনেছিল? তার পাঠানো টাকাতেই না আজও প্রতিপালন হয় ওর বাপ-মা? তার পয়সাতেই না ও দিনের পর দিন ঠ্যাঙের ওপর ঠ্যাং তুলে বসে বসে খায়? মুখের একটা কথায় রাত না পোয়াতেই বিয়ে-করা বউকে ছেড়ে চলে গেল! গেল তো যাক! বীণাপাণিও জীবনে আর ওর মুখ দেখবে না।
সকালে ঘুম ভেঙে বিছানাটা খালি দেখেই বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠেছিল তার। নিমাই রোজই খুব ভোরে উঠে পড়ে। বাইরে-টাইরে খুটখাট কাজ করে। তার ঘর খালি দেখে চমকানোর কিছু ছিল না। কিন্তু কখনও কখনও মনটা যেন কু গেয়ে ওঠে। বীণাপাণি কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করতে পারল না। বাপের বাড়ি বলে কথা, জামাই চলে গেছে জানলে একটা সোরগোল উঠবে হয়তো। একটু খুঁজে দেখল, নিমাই তার সামান্য জামা আর ধুতি নিয়ে যায়নি। পরনে যা ছিল, তাই নিয়েই গেছে। পয়সাকড়িও হেঁয়নি। তবে সে যে বিদেয় হয়েছে তাতে সন্দেহ ছিল না বীণাপাণির। সে টের পাচ্ছিল। ঘরে একটা খা-খাঁ ভাবই জানান দিচ্ছে সে কথা।
আজ বীণা কদল না। তার জ্বলুনি হচ্ছিল বুকে। নিমকহারাম! নিমকহারাম! মুখচোখ স্বাভাবিক রেখে সে বেরোলো। পুকুরঘাট গেল। ফিরে এসে বাসি কাপড় ছাড়ল। তারপর রান্নাঘরের দরজায় গিয়ে বসে বলল, মাথাটা ধরে আছে। একটু চা দাও তো মা।
নয়নতারা জামাইয়ের জন্য হালুয়া আর রুটি তৈরি করছিল। বলল, দিই। জামাইকে ডাক তো, রুটি কটা গরম গরম খেয়ে নিক।
বীণা ভ্রূ কুঁচকে একটু ভাবল। তাহলে মাও টের পায়নি! অবশ্য পাবেই বা কী করে? নিমাই কি কাউকে বলে গেছে? তেজ করে বোধ হয় রাত থাকতেই রওনা দিয়েছে। বে-আবুেলে লোক, দরজা ভেজিয়ে রেখে গেছে। চোর-টোন আসতে পারত।
চোরের চিন্তাতেই হঠাৎ চমকে ওঠে বীণাপাণি। আসতে পারত কেন? এসেছিল কিনা তাই বা কে জানে! ডলার। পাউন্ডের প্যাকেটটা ছিল বালিশের তলায়। আছে তো?
প্রায় পাখির মতো উড়ে ঘরে এল বীণা। বালিশ উল্টে দেখল। প্যাকেট আছে। বুকটা হঠাৎ এত ধকধক করছিল যে বলার নয়।
আবার রান্নাঘরে এসে বসতেই নয়নতারা বলল, অমন হুড়ম করে কোথায় গিয়েছিলি?
একটা জিনিস দেখে এলাম। হা মা, এখানে চোর-ছাড়ের উদ্রব কেমন গো?
আছে মা, ভালই আছে। তবে আমাদের বাড়িতে আছেটাই বা কি? নেবেই বা কি? কিন্তু জামাই কোথায় গেল?
সকাল থেকে জামাই-জামাই করছে কেন? তাকে আমি একটা কাজে পাঠিয়েছি।
নয়নতারা অবাক হয়ে বলে, কোথায় পাঠালি আবার! আমি যে জলখাবার করে বসে আছি।
খাওয়ার লোক আছে মা। সে একটু বনগাঁয়ে গেছে।
বনগাঁ! বলে হাঁ করে থাকে নয়নতারা, হঠাৎ গেল কেন?
বললাম তো কাজ আছে।
তা কখন ফিরবে?
ফিরবে না।
দেখ কাণ্ড! কই, কালও তো কিছু বলিসনি!
বললাম তো, হঠাৎ একটা জরুরি দরকার পড়ে গেল।
জামাই নেই শুনে নয়নতারা ভারি হতাশ হয়েছে। মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, আমি সকাল থেকে রান্নাবান্নার জোগাড় করছি। নিমাই কচুর শাক খেতে ভালবাসে বলে এই উঁই কচুর শাক কেটে এনেছি। কী হবে এখন?
বীণা মুখ গোমড়া করে বলে, বলেছি তো, কিছুই ফেলা যাবে না। কচুর শাক ভারি তো একটা জিনিস!
সকালটা এভাবে পাশ কাটানো গেল। একটু বেলায় বারান্দায় যখন বাবাকে গভীর আর দুঃখী মুখে বসে থাকতে…দেখল, বীণা তখন কাছে গিয়ে ডাকল, বাবা!
বিষ্ণুপদ মেয়ের দিকে চোখ ফিরিয়ে একটু দেখল, তারপর বলল, আয়, বোস এসে এখানে। কিছু বলবি?
তুমি সারাক্ষণ একদৃষ্টে ওই ঘরখানার দিকে চেয়ে কি দেখ বাবা?
বিষ্ণুপদ ম্লান একটু হেসে বলে, ঘরখানা আর শেষ করতে পারল না রামজীবন। একটু করে হয়, আবার থেমে থাকে। তাই দেখি চেয়ে চেয়ে।
কাছটিতে মৃদু স্বরে বলল, ওটার মধ্যে মানুষের একটা লড়াই আছে যে। মানুষ কত চেষ্টা করে, সব কি হইয়ে তুলতে পারে? খানিকটা হয়, খানিকটা হয় না। চেয়ে চেয়ে দেখি। আমার আর কী দেখার আছে বল!
বীণাও ঘরখানার দিকে চেয়ে ছিল। অনেকটা উঠেছে। ছাদ ঢালাই বাকি। ভারার বাঁশ এখনও বাঁধা আছে, তাতে শ্যাওলা ধরেছে, পচেও গেছে অনেকটা। বীণা জানে, মেজদা যদি মদ-উদ না খেত, তাহলে হয়তো হয়ে যেত ঘরখানা। এই ঘরখানা নিয়ে মেজদা আর সেজদায় তুমুল ঝগড়া বেঁধেছে, তার খবরও বীণা পেয়েছে মায়ের কাছে।
বীণা হঠাৎ বলল, এ বাড়িতে কি আমার তাগ আছে বাবা?
বিষ্ণুপদ আনমনা ছিল। জবাবটা দিল একটু দেরিতে, আছে।
ভাগ হলে আমি কতটা জমি পাব?
পাবি খানিকটা। কেন রে, যাকবি এখানে এসে?
থাকি না থাকি, একখানা ঘর তুলে রাখতে পারলে হয়।
কেন, বনগাঁ, তোর ভাল লাগে না?
তাও লাগে।
আর পালপাড়া? সেখানে কেমন লাগে?
বীণা একটু মাথা নিচু করে থাকে। তারপর বলে, সেখানে অভাব ছাড়া আর কিছু নেই বাবা। সংসারটা যেন এক পেট খিদে নিয়ে বসে আছে।
বিষ্ণুপদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, মরে গেলে আর খিদেও থাকে না, তেষ্টাও থাকে না।
বীণা অবাক হয়ে বলে, হঠাৎ মরার কথা কেন বাবা?
বিষ্ণুপদ একটু যেন অপ্রস্তুত হল। বলল, বলছি কি, খিদেটা হল বেঁচে থাকার লক্ষণ। খিদে পায় মানে বেঁচে আছে।
তুমি মাঝে মাঝে বড় অদ্ভুত কথা বলো বাবা। ভয় করে।
