হেমাঙ্গ একটু শিহরিত হয়। তারপর চোখ সরিয়ে নিয়ে মাথা নেড়ে বলে, ভাল লাগবে না।
কেন?
নিজের দেশ ছাড়া আমার কোথাও ভাল লাগবে না। আমি একটু হোম-সিক।
ইংল্যান্ড থাকারও একটা আলাদা চার্ম আছে। আপনি তো মাত্র কিছু দিন ছিলেন। বেশী দিন থাকলে বুঝতে পারতেন।
গলাটা সামান্য বিষণ্ণ শোনাল কি রশ্মির? কানের ভুলও হতে পারে। খুব সংকোচের সঙ্গে হেমাঙ্গ বলল, হঠাৎ ইংল্যান্ডের কথা বললেন কেন?
রশ্মিও খুব সংকুচিত হয়ে বলল, এমনিই।
অজানা আশংকায় বুকের মধ্যে অস্থিরতাটা একটু বেড়ে গেল হেমাঙ্গর।
রশি কফির কাপটা রেখে বলল, কখনও তেমন দরকার হলেও ইংল্যান্ডে সেটল করতে পারবেন না।
বিস্ময়ের একটা ভান করতে হল হেমাঙ্গকে। বলল, ইংল্যান্ডে সেটল করার কোন দরকার হবে কেন তাই বুঝতে পারছি না। কেউ তো আমাকে ডাকাডাকি করছে না ইংল্যান্ড থেকে।
যদি করে?
হেমাঙ্গ এ প্রশ্নটার কোনও নির জবাব দিতে পারল না। রশ্মির অসাধারণ মুখশ্রী অবলোকন করতে করতে স্তিমিত গলায় বলল, আগে তো ডাকুক। সেখানেই কত লোক বেকার বসে আছে।
আমি শুধু যদি-র কথা বলছি। যদি ডাক পান, যাবেন?
হেমাঙ্গ বুঝতে পারছে, তার সঙ্গে রশ্মির যে খোলামেলা হাসিঠাট্টার সম্পর্কটা ছিল সেটা হঠাৎ বদলে গেছে। দুজনেরই কিছু সংকোচ বোধ করছে। একটা সূক্ষ্ম লজ্জার পর্দা দুজনের মাঝখানে বার বার উড়ে আসছে। রশ্মি যে আর এক বছরের মধ্যেই স্থায়ীভাবে ইংল্যান্ডে চলে যাবে তা জানে হেমাঙ্গ। হেমাঙ্গকে কে ডাকবে তাও সে বুঝতে পারছে। চারুদিদি কী যে অঘটন ঘটিয়ে দিল।
নেমন্তন্নটাও ছিল খানিকটা অদ্ভুত। হেমাঙ্গর বুঝতে অসুবিধে ছিল না যে, নেমস্তুন্নের মধ্যমণি সেদিন ছিল সে-ই। রশ্মির মা ব্রেকফাস্ট থেকেই তার ওপর অতিরিক্ত মনোযোগ দিতে শুরু করলেন। রশির রাশভারী বাবা অবধি তার সঙ্গে বেশ কয়েকটা প্রাসঙ্গিক কথা বলে ফেললেন।
বাগানবাড়িতে জড়ো-হওয়া আত্মীয়স্বজনরাও সেদিন সব ফেলে তার ওপর মনোযোগ দিতে লাগল। বহুকাল এরকম তি আই পি ট্রিটমেন্ট পায়নি সে। সবাই যেন তটস্থ, অতি অমায়িক, অতি সতর্ক। আর চারদিক থেকে জোড়ায় জোড়ায় কৌতূহলী চোখ তাকে বিদ্ধ করল সেদিন।
এমন অস্বস্তির মধ্যে যে আর কখনও পড়েনি। ভাল বাদ্যবস্তু তার অতিশয় প্রিয়। কিন্তু সেদিন সে খাবারের স্বাদগন্ধ বুঝতেই পারল না মানসিক উদ্বেগে। শুধু লক্ষ করল, লোকজনের সামনে রশ্মি তার কাছে বেশী আসছে না, কথাও বলছে না। কিন্তু দূর থেকে মাঝে মাঝে তাকে চেয়ে দেখছে। এক-আধবার তারা দুজনে দুজনের দিকে ৫ে কিছুক্ষণ এক দৃষ্টে চেয়েও রইল।
এক ফোঁটা মদও খায়নি হেমাঙ্গ, তবু যখন বাড়ি ফিরল তখন যেন টলোমলো অবস্থা। সে নয়, তার ভিতরটার অচেনা হেমাঙ্গ গলায় একটা ফাঁস আটকে বসে আছে।
সেই রাতেই ফোন করল চারুশীলা, এই গবেট, কেমন হল আজকের পিকনিক?
তোকে পিকনিকের কথা কে বলল?
আমার স্পাই আছে। বল না কেমন হল।
ভালই।
শুধু ভাল? আর কিছু নয়?
পিকনিকের মধ্যে আবার আর কিছু কি থাকবে?
তোকে কি সাধে গবেট বলি! তবু তরে গেছিল।
তার মানে?
যদিও তুই একটি আস্ত হাঁদারাম আর চূড়ান্ত অপদাৰ্থ, তবু কি করে যে পার পেয়ে যাস সেটা ভেবেই অবাক হই। বোকা আর অপদার্থের জন্যই বোধহয় ভগবান খেটে মরেন।
হেমাঙ্গ গম্ভীর হয়ে বলে, ব্যাপারটা কী খুলে বলবি?
অনেকবার বলেছি। এরপরও না বুঝলে বুঝতে হবে তোর মাথা একদম নিরেট। কি করে সি এ পাশ করলি রে? সি এ পড়তে বুঝি মগজ লাগে না?
বেশীই লাগে। সে কথা থাক। ব্যাপারটা কী ছিল?
ওদের সবারই তোকে দারুণ পছন্দ।
ওরা কারা?
রশ্মির মা বাবা আত্মীয়স্বজন। ওরাও আমাদের মতো একটু ক্ল্যানিশ। আত্মীয়স্বজনের মধ্যে খুব ভাল-ভালবাসা।
আমাকে পছন্দ করার ওরা কে?
কেন, তুই-ই বা এমন কে যে পছন্দটাও করা যাবে না তোকে?
কথা ঘুরিয়ে দিস না। আসলে কথাটা কী?
আহা, ন্যাকা! সবাই তো বুঝি, তবে অত বোকা সাজছিস কেন? রশ্মির মা-বাবার আগেই পছন্দ হয়েছিল। আজ আত্মীয়রাও দেখল। তাতে কি দোষ হয়েছে।
দোষী জানে না কী দোষ তাহার, বিচার হইয়া গেল? আমাকে পছন্দ করছে, কিন্তু আমার মতামতটাও তো নেওয়া দরকার।
তোর আবার অমতের কথা ওঠে কেন? ওরকম পাত্রী পাচ্ছিস সেই তোর ভাগ্য। তাই তো বলছিলাম, বোকাদের জন্য ভগবান আছেন।
বিয়ে আমি করছি না।
অত তড়পাতে হবে না। রশ্মিকে দেখলে তো চোখ দিয়ে নাল গড়ায়। বিডন স্ট্রিটে খবর হয়ে গেছে। বিয়ে করবি কি না করবি সেটা মামা বুঝবে। তোর ইচ্ছেয় সব হবে নাকি?
ইয়ার্কি করিস না চারুদি। আমার ব্যাপারটা ভাল লাগছে না।
রশ্মিকে তোর পছন্দ নয়?
রশ্মির কথা উঠছে কেন?
উঠবারই কথা কিনা। ওরকম মেয়ে লাখে একটা পাওয়া যায় না, তা জানিস? অমন চেহারা, ফিগার, কোয়ালিফিকেশন একসঙ্গে পাওয়া কি চাট্টিখানি কথা?
কথা এই পর্যন্তই হয়েছিল। সে রাতে হেমাঙ্গ ভাল করে ঘুমোতে পারল না।
পরের সপ্তাহের শনিবার রশ্মিই ফোন করল। রাত দশটার পর। প্রথম প্রশ্নটাই চমকে দিল তাকে।
কী করছো?
বিস্মিত হেমাঙ্গ আমতা আমতা করে বলে, টিভি দেখছি।
একটু কথা বলে আমার সঙ্গে।
কথা! বলে স্তব্ধ হয়ে গেল হেমাঙ্গ। ও তাকে তুমি করে বলছে, তারও কি বলা উচিত? গলা ঝেড়ে হেমাঙ্গ বলল, তোমার বুঝি ঘুম আসছে না?
না। হঠাৎ তোমার কথা মনে হল। একটু কথা বলবে? প্লীজ?
কী বলব বলো তো!
