বেলা আর একটু মরে এলে সে ঘরের বাইরে এসে তার তিন কাঠার সম্পত্তিটা ভাল করে আবার দেখল। চারদিকে বাঁশের নতুন বেড়া দেওয়া হয়েছে। গগন দাসের শখ আহ্রদ বিশেষ ছিল না। কয়েকটা গাদা গাছ লাগিয়েছিল, তাতে মরকুটে ফুল ফুটেছে। একখানা নারকেল গাছ আছে। আর কিছু আগাছা। গগন দাস এখাকার বাস তুলে বসিরহাট চলে গেল গুড়ের ব্যবসা করতে।
হেমাঙ্গকে দেখছিল আরও কয়েকজন। গুটিকয়েক বাচ্চা ছেলেমেয়ে আর একটা বউ-মানুষ। বেড়া ঘেঁষে যে মেটে রাস্তাটা আছে তার ওপাশে একটু ঢাল। সেইখানে তারা দাঁড়িয়ে। কলকাতার এক বাবু এ গায়ে ঘর কিনেছে—এটা একটা খবরের মতো খবর। হেমাঙ্গর একটু লজ্জা হল। সে ঘরে এসে ফের কিছুক্ষণ নদী দেখল। অনবরত ভটভটি, নৌকো আর লঞ্চের যাতায়াত। কত কাজে কত মানুষ কত দিকে যায়, আসে।
এখানে শীত বেশ চড়া। হাওয়াটা কনকন করছে বড়। হেমাঙ্গ জানালার ঝাঁপ ফেলে দিল। কিছুক্ষণ শুয়ে রইল চুপচাপ। এমন কাজহীন, ব্যস্ততাহীন সময় কি করে কাটাতে হয় তা সে এখনও শেখেনি। সময় লাগবে।
গত একমাস তার মন ভাল নেই। সে উদ্বিগ্ন, অশান্ত। তার একা এবং সুখী জীবনে কিছু একটা হানা দিচ্ছে। যেন কড়া নাড়ার শব্দ পাচ্ছে হেমাঙ্গ। সে চাক না-চাক ঘটনাটা হয়তো ঘটেই যাবে।
এটা ঠিক যে, হেমাঙ্গ চায় না। অন্তত তার মস্তিষ্ক চায় না। তার বোধ-বুদ্ধি-বিবেচনা দিয়ে সে প্রত্যাখ্যান করতে চায়। কিন্তু বুকের ভিতর কেন তবু একটা দুর্বলতা-রন্ধ্রপথও তৈরি হচ্ছে?
মাসখানেক আগে শনিবারের এক সকালে টেলিফোন এর, কী করছেন আজ?
কোনও প্রোগ্রাম করিনি তো!
আমি একটু এলে কি কিছু মনে করবেন? আমার একটা কথা আছে।
হেমাঙ্গর বুক নানা আশঙ্কায় একটু দুরুদুরু করে উঠল। কিন্তু বলতেই হল, আসুন।
রশ্মির আসতে ঘন্টা খানেক লাগল। বোধহয় সাজগোজের জন্য। এমনিতে কখনও তাকে সাজতে দেখেনি হেমাঙ্গ। মেদিন খুব ঝলমলে রেশমী শাড়ি পরেছে, চোখে বোধহয় কাজল বা সূৰ্মা জাতীয় কিছু। কিন্তু ভাল করে তাকাতেই পারছিল না হেমাঙ্গ। তার বুক বিট্রে করছিল। একটু শাসকষ্টও কি? কিছু একটা উথলে উঠছিল বুকের ভিতরে? ওই হেমাঙ্গকে তো সে চেনে না।
এ কী! পোশাক পরেননি যে এখনও? শীগগির করুন।
হেমাঙ্গ অবাক হয়ে বলে, আমার কি কোথাও যাওয়ার কথা?
ওঃ, বলিনি বুঝি। আজ যে আমাদের বাড়িতে আপনার ভীষণ নেমন্তন্ন।
আগে বলেননি তো!
মুখটা একটু করুণ করে রশ্মি বলল, সেটা আমার দোষ নয়। নেমন্তন্ন যিনি করেছেন দোষটা তাঁর।
কে করছেন নেমন্তন্ন?
আমার মা। কিন্তু মা ভীষণ ভুলো মনের মানুষ। নেমন্তন্ন করবেন বলে ভেবেছেন, প্রিপ্যারেশনও নিচ্ছেন, কিন্তু আসল কাজটাই করতে ভুলে গেছেন। ভুলটা আজ সকালে ধরা পড়ল। মা ভীষণ লজ্জায় আছেন। আপনি কি কিছু মনে করবেন?
নাঃ। বলে হেমাঙ্গ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, ব্যাচেলরদের তো মতামতের দাম নেই। আর নেমন্তন্ন খেতে আমি পছন্দ করি। কিন্তু এখন তো সকাল নটাও বাজেনি। এখনই কি?
নেমন্তন্নটা ব্রেকফাস্ট থেকে শুরু হবে যে। একদম সেই ডিনার অবধি। ও বাবা!
সেইজন্যই তো বলছিলাম ভীষণ নেমন্তন্ন। সহ্যশক্তির পরীক্ষা। আর শুনুন, ব্যাচেলর বলে কেউ আপনাকে কিন্তু বেশী অপমান করছি না। মায়ের ভুলো মন বলেই এই বিপত্তি।
একটু কাহিল মুখে হেমাঙ্গ বলে, ব্রেকফাস্টটা স্কিপ করলে হয় না? আমার যে সকালে খাওয়ার অভ্যাস বিশেষ নেই।
তাই কি হয়? পারফেস্ট ইংলিশ ব্রেকফাস্টটা তৈরি হচ্ছে দেখে এসেছি। শুধু আপনার জন্যই। ব্রেকফাস্টের পরই একটা আউটিং আছে। খাওয়া-দাওয়া সেখানেই।
কোথায় বলুন তো!
ডায়মন্ডহারবার রোডে। ঠাকুরপুকুর ছাড়িয়ে মাইল দুই গেলে একটা স্পষ্ট আছে। খুব সুন্দর একটা বাগানবাড়ি।
শুনে ভিতরটা নিয়ে ভরে গেল। সেই বাগানবাড়ি, সেই ফিস্টির মতো বিচ্ছিরি ব্যাপার, হয়তো বা সঙ্গে রবীন্দ্রসঙ্গীত বা তাস খেলার ব্যবস্থা, হয়তো মদের বোতল। সবচেয়ে বড় কথা নানা রঙের, হরেক চরিত্রের একগাদা লোক, সেঁতা হাসি, সাজানো সাজানো কথা।
শঙ্কিত হেমাঙ্গ জিজ্ঞেস করল, বনভোজন নয় তো!
কয়েকজন থাকবে। আপনার অসুবিধে হবে তাতে?
না। অসুবিধে আর কি?
আপনি যে বেশী হুল্লোড় পছন্দ করেন না তা আমি জানি। বেশী লোককে বলা হয়নি। কিছু ক্লোজ রিলেটিভকে নেমন্তন্ন করা হয়েছে। দশ বারোজন। প্লীজ, তৈরি হয়ে নিন।
নিচ্ছি। কিন্তু আপনি একটু বসুন। এক কাপ কফি খান। এর আগে একদিন তো ধুলো-পায়ে বিদায় নিলেন।
রশ্মি বসল। মিষ্টি হেসে বলল, চা বা কফিতে আমি কিন্তু চিনি পাই না।
এই ছুটির দিনটায় এরকমভাবে হুল্লোড়ে বেরোতে একটুও ভাল লাগছিল না হেমাঙ্গর। কিন্তু রশ্মিরশ্মিই তাকে টানছে। ভীষণ টানছে। কফি করতে করতে এই সত্যটা হঠাৎ টের পায় সে। সারা দিন ভিড়ের মধ্যেও রশ্মির সুন্দর মুখখানা মাঝে মাঝে দেখা যাবে—সেই লোভ ফণা তুলছে ভিতরে। সে কি ব্ৰতভ্রষ্ট হচ্ছে। সে কি কামুক বা সংসারমুখী হয়ে যাচ্ছে। সে কি প্রেমে পড়েছে।
এই চিন্তাই তাকে অস্থির করে তুলল।
কফি খেতে খেতে আচমকা রশ্মির আর একটা প্রশ্নও অগাধ জলের দিকে ঠেলে দিল তাকে। রশি খুব মৃদু লাজুক গোয় হঠাৎ জিজ্ঞেস করে, ইংল্যান্ড জায়গাটা আপনার কেমন লাগে?
ইংল্যান্ড! কেন, ভালই তো।
কতটা ভাল?
খুব ভাল। জিনিসপত্রের দাম একটু বেশী এই যা।
আমি সে কথা জানতে চাইছি না। ইংল্যান্ডে যদি সেটল করতে হয় তাহলে কেমন লাগবে আপনার?
