বাঁকা মিঞা বুঝবে না, কোনও কোনও জমির দাম শুধু টাকার নিরিখে হয় না। এইখানে নদী একখানা পেল্লায় বাঁক মেরেছে। বাকের একেবারে মুখে জমিখানা। আদিগন্ত থৈ থৈ করছে জল। নদীর দিকটায় একখানা দাওয়া ফুটিয়ে নিলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যাবে শুধু চেয়ে থেকে। নদী কখনও ক্লান্ত করে না, একঘেয়ে হয় না। হু হু করে পাগুলে হাওয়া বয় এইখানে। যদি ঝড় আসে তবে এইখানে বসে ঝড়ের আদিগন্ত রূপ দেখা যাবে। উথালপাথাল নদী, পাক খাওয়া মেঘ আর জলপ্রপ্রাতের মতো বৃষ্টি। গগন দাস দুপাঁচ হাজার টাকা বেশী নিয়ে থাকলেও হেমাঙ্গ সেটাকে ক্ষতি বলে মানে না। টাকা তত কাগুঁজে ভড়ং, কী দাম তার?
হেমাঙ্গ বাঁকা মিঞার দিকে তাকিয়ে বলে, একখানা বাথরুম করে দিতে পারবে।
বাঁকা মিঞা একটু হাসল, চাইলে পারব না কেন? তবে কলের জল তো পাবেন না। সে বন্দোবস্ত নেই। ডিজেল পাম্প বসালে অবশ্য হয়। তাহলে আবার ওপরে জলের ট্যাংক করতে হয়। অতটা করবেন কি?
না না, অত শহুরে ব্যাপার করলে মজাটাই মাঠে মারা যাবে। বালতির জলেই চলে যাবে। তবে একটা ঘেরা জায়গা না হলে আমার অস্বস্তি হয়।
হয়ে যাবে। মেঝেটা বাঁধিয়ে নেবেন। নইলে এখানে মা মনসার বড় উৎপাত। মেটে ভিটি হলেই গর্ত হবে। তেনারা সেঁধিয়ে বসে থাকবেন। পাকা মেঝে হলে খানিকটা নিশ্চিন্ত।
হেমাঙ্গ একটু বিবর্ণ হয়ে বলে, তাই করো।
বছরে কদিন থাকবেন?
মাঝে মাঝে চলে আসব। সারা বছর তুমিই দেখেশুনে রাখবে।
বাঁকা মিঞা একটা অসন্তোষের শ্বস ছাড়ল। সে গায়ের মাতব্বর লোক। গগন দাসের ঘরটা হেমাঙ্গ কেনায় সে খুশি হয়নি। না হওয়ারই কথা। জমি কতটা সরেস নিরেস তা বুঝবার মতো বিষয় বুদ্ধি তার হেমাঙ্গর চেয়ে কিছু বেশীই আছে। একটু আড়াআড়িও আছে গগন দাসের সঙ্গে।
কিন্তু হেমাঙ্গ খুশি। এইখানে সে এখন দুদিন থাকবে। নদীর মুখোমুখি। একা। আপনমনে। কাজের জঞ্জাল থাকবে না, শহুরে সমস্যা থাকবে না। বেশ থাকবে সে।
গগন দাসের মাটির ঘরখানা যথেষ্ট মজবুত। চালে নতুন টিন লাগানো হয়েছে। একখানা চৌকি ও বিছানার ব্যবস্থাও হয়েছে। টাকায় কি না হয়? বেশ কয়েক বছর আগে হেমাঙ্গদের কয়েকটা ট্রাক ছিল। সেগুলো ক্যানিং অবধি ট্রিপ মারত। সেই ট্রাকগুলোর একটা চালাত বাঁকা মিঞা! ট্রাকের ব্যবসাটা ভাল চলেনি। পরে সেগুলো বিক্রি হয়ে যায়। কিন্তু বাঁকা মিঞার সঙ্গে সম্পর্কটা রয়ে গেছে। বাদা অঞ্চলের লোক। বিচক্ষণ এবং বিষয়ী। এখন ক্যানিং-এর তার একখানা দোকান আর এই গাঁয়ে চাষবাস। দোকান ছেলেরা দেখছে। বাঁকা মিঞা গায়ে মাতব্বর হয়ে বসে একটু-আধটু পলিটিক্স করছে। হেমাঙ্গর কেন এই গাঁয়ে একটা বাড়ি করার দরকার হল তা গত সাতদিন মাথা ঘামিয়েও বাঁকা মিঞা বুঝতে পারছে না। তবে সাহায্য করছে।
আজ রাতে হেমাঙ্গ এখানেই থাকবে জেনে নিজের লোক ডাকিয়ে এনে ঘরদোর সাফ করিয়ে নিকিয়ে দিয়েছে। জল তুলিয়েছে। দুপুরে মাছভাত খাইয়েছে, রাতেও খাওয়াবে।
বিকেলের আলো এখনও যথেষ্ট আছে। লালচে হয়ে এসেছে বটে, তবু আদিগন্ত ফটোগ্রাফের মতো দেখা যাচ্ছে। সামনেই ভটভটির ঘাট। বাঁ দিক থেকে একটা খাল এসে বড় গাঙে মিশেছে। ঘাটে গোটা দুই ভ্যান রিক্সা দাঁড়ানো, সওয়ারি নেই। ইটে বাঁধানো সরু রাস্তার দুপাশে কয়েকটা দীন চেহারার দোকান ঘর। আর একটু ভিতরপানে এগোলে মানুষের অনাড়ম্বর ঘর-গেরস্থালি।
বাদায় কি মানুষ থাকে? আমরা হলাম জানোয়ার।
হেমাঙ্গ মুগ্ধ চোখে নদীর দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। ওই খালটার ওপারে তার ফিয়াট গাড়িটা গঞ্জের ঘাটে এক দোকানের সামনে পার্ক করা আছে। দুটো দিন পেট্রল আর ডিজেলের গন্ধ নাকে আসবে না। শ্বাসবায়ুর জন্য পরিষ্কার বাতাস পাওয়া যাবে। আর হয়তো বা পাওয়া যাবে শহুরে নানা টানাপোড়েনে খন্ডবিখণ্ড হেমাঙ্গর ছিন্ন অংশগুলি। নিজেকে জুড়ে নেওয়া খুবই জরুরী এখন।
জানোয়ার! না, জানোয়ার হতে যাবে কেন?
তা নয় তো কী বলুন। এখানে মনিষ্যির জীবন আছে আমাদের? বাদার লোকের জন্য কে ভাবে বলুন। সরকারের তো মাথাব্যথাই নেই।
পলিটিক্স বুঝুক না বুঝুঁক-বাঁকা মিঞা সবসময়ে অন্যায় অত্যাচার অবিচার ইত্যাদি নিয়ে কথা বলতে ভালবাসে। কথা শুরু হলে থামতে চায় না। হেমাঙ্গর এখন সে সবে দরকার নেই। সে এখন একা হতে চায়। চুপচাপ হতে চায়।
সে বলল, তুমি এসে গিয়ে বাঁকা। আমি ঘরে বসে জিরোই।
তা জিরোন। চা খাবেন কখন?
না হলেও হয়।
না হবে কেন? ভূষণের দোকানে বলে দিয়ে যাচ্ছি, যখন হাক মারবেন ঘরে পৌঁছে দিয়ে যাবে। রাতের দিকে একটু সজাগ থাকবেন, চোর আসে।
আমার সঙ্গে দামী কিছু নেই।
প্যান্টখান শার্টখানা তো আছে। কম্বল আছে, ঘড়ি আছে। চোরের তো বাছবিচার নেই। যা পাবে নিয়ে যাবে। তার লাভ না হোক, আপনার তো ক্ষতি।
ঠিক আছে, সজাগ থাকব।
পাকা বাঁশের একখানা লাঠি পাঠিয়ে দেবোখন, পাশে রেখে ঘুমোবেন। টর্চ আছে তো!
আছে।
তাহলে আপনি জিরোন গিয়ে। রাতে খাওয়ার সময় ডেকে নিয়ে যাবো।
বাঁকা বিদেয় হলে ঘরে এসে বিছানায় বসল হেমাঙ্গ। বড় নতুন আর অদ্ভুত এক অনুভূতি হচ্ছে। তার। নিঝুম সম্মোহনের মতো কিছু একটা ঘনিয়ে উঠছে তার চারদিকে। জলের অবিরল কলকল শব্দ সৃষ্টি করছে রোমাঞ্চ। ঝাঁপের জানালাটা খোলা। সেইটে দিয়ে তাকালে নদীর প্রসার চোখে পড়ে। এখানে বড় গাঙ খুব চওড়া। কিছুক্ষণ বিছানায় আসনপিড়ি হয়ে বসে নদীর দিকে চেয়ে থাকে হেমাঙ্গ। নদী তার বড় প্রিয়। নদীর দিকে চেয়ে থাকলে তার ঘন্টার পর ঘন্টা কেটে যায়।
