আমার কিন্তু আবার কান্না পাচ্ছে।
কান্নাটা কোনও সলিউশন নয়। আমি তোমার কাছে একটা সলিউশন চাইছি।
আমার কাছে সলিউশন চাইছো! আমি কি একটা সাঙ্ঘাতিক জ্ঞানী লোক।
মণীশ একটু হেসে বলে, জ্ঞানীরাই কি পারে? তারাও তো হাতড়ে মরছে। প্রাণের রহস্য ভেদ করা কি অত সোজা?
তারাই যদি না পারে তাহলে আমি পারব কি ভাবে?
কে যে জানে তাই তো জানি না। কার কাছে যাবো অপু? কে বুঝিয়ে দেবে এই অর্থহীন জীবনের প্রকৃত মানে?
আচ্ছা, আরও লক্ষ লক্ষ লোক তো আমাদেরই মতো বেঁচে আছে। আছে তো! তারা কি এত মাথা ঘামায় এ নিয়ে?
তাই কি আমাকেও মাথা না ঘামাতে বলছো?
বলছি। ওসব ভাবলে তোমার শরীর খারাপ হবে।
মানুষ যদি মাথা না ঘামাত তাহলে পৃথিবীর কোনও সত্যই আবিষ্কার হত না অপু। প্রশ্ন, কেবল প্রশ্ন করে করেই না মানুষ এত জেনেছে। কিন্তু জানা আরও কত বাকি। সবচেয়ে ভাইটান প্রশ্নই হল, এই জন্ম কেন? কেন এই বেঁচে থাকা?
তোমাকে কি আজ রাতেই সব জানতে হবে?
প্রশ্নটা কত সিম্পল দেখ, কত প্রাসঙ্গিক। কিন্তু জবাবটা নিয়েই যত মুশকিল।
এবার ঘুমোও। পায়ে পড়ি।
আজ কি আমার ঘুম আসবে?
ও মা গো! ঘুম না হলে যে ভীষণ খারাপ হবে। তুমি তো ট্রাংকুইলাইজার খেয়েছো! ঘুমের ওষুধ খেয়ে না-ঘুমোনো ভীষণ খারাপ।
তাহলে আর একটা খাই। কিন্তু ঘুমটা চটে গেছে।
ইস্! আমার যে ভয় করছে।
ধুস! ভয়ের কিছু নেই। শরীরটা প্রকৃতির দান। তাতে সবরকম রক্ষাকবচ দেওয়া আছে। অত ভয় পেও না।
আমারই ভুল। আমার মাথা কুটতে ইচ্ছে করছে। কেন যে মেয়ের বয়সের কথা তুলতে গেলাম!
কথাটা তুমি না তুললেও কি আমি ভাবি না ভেবেছে? সবসময়ে ভাবি, আমার কত কী করার আছে, কত দায়িত্ব আমার মাথার ওপর। তার মধ্যে ঝুমকির বিয়ের কথাও যে মনে না হয় তা তো নয়। তুমি কথাটা তুলে কিছু ভুল করেনি অপু।
তোমাকে আর ঝুমকির বিয়ের কথা ভাবতে হবে না। ও মেয়ের বিয়ে দিলে তুমি থাকতে পারবে না। ছেলেমেয়ে তোমার চোখের মণি তা আমি জানি।
তবে কথাটা তুললে কেন?
ঝুমকির কি বিয়ের ইচ্ছে হতে নেই? আমাকে যখন বিয়ে করে এনেছিলে তখন তো শ্বশুরমশাইয়ের মনের খবর নাওনি।
তোমার আমার কথা আলাদা। এখন বলো তো, ঝুমকির কি বিয়ের ইচ্ছে হয়েছে?
তা আমি কি জানি?
তবে যে বলছে ঝুমকির ইচ্ছে হয়েছে!
মেয়েটা তো একটা আস্ত পাগল। বাবাকে সাহায্য করবে বলে হন্যে হয়ে চাকরি খুঁজছে।
বিয়ের পর প্রথম প্রথম তাদের সারা রাত কেটে যেত গল্প আর ভালবাসার নানা প্রকাশে। আজ বহু দিন বাদে তারা। প্রায় ভোর রাত অবধি জেগে রইল। তারপর ঘুমোলো। দুজনের বাহপাশে বাঁধা হয়ে দুজনে। বহুদিন বাদে। মৃত্যুর ছায়া সাপের মতো দুলতে লাগল শিয়রে। অনিশ্চিত ওই আক্রমণকারী না থাকলে কি এত ভালবাসা হয়।
তিন দিন বাদে বাড়ির প্ল্যান নিয়ে এল মণীশ।
অপু! শীগগির এস। বুকা, ঝুমকি, অনুকে ডাকো। বাড়ির প্ল্যান এনেছি।
সে এত হাঁকডাক করতে লাগলেন যেন প্ল্যান নয়, বাড়িটাই বয়ে নিয়ে এসেছে। দ্যাখো, দ্যাখো বলে সে সবাইকে ডেকে বাড়ির প্ল্যান বোঝাতে লাগল। প্ল্যানটা বেশ বড়লোকী। প্রত্যেক ছেলেমেয়ের জন্য আলাদা ঘর এবং আলাদা স্টাডি। মণীশ আর অপর্ণার শাওয়ার ঘর যদিও একটাই, তবু তাদের আলাদা ড্রয়িং রুম আছে। মোট ছখানা বাথরুমের ব্যবস্থা করেছে মণীশ, তার একটা ঝি-চাকরদের জন্য। ইনডোর গেম এবং জিমন্যাসিয়াম, মিউজিক রুম ইত্যাদিও রয়েছে।
প্ল্যান দেখে অপর্ণা চোখ কপালে তুলে বলে, তুমি ভেবেছেটা কী? আমরা কি কোটিপতি?
আহা, নিজের বাড়ি বলে কথা। এটুকু না হলে আরামে থাকা যায় নাকি?
এটুকু? এটাকে এটুকু বলে? যা প্ল্যান করেছে তাতে আমার চার কাঠাই খেয়ে নেবে। লংকা গাছ, লাউ গাছ লাগাবো কোথায়?
মণীশ খুব দমে গেল; বলল, তাহলে! পছন্দ হয়নি তোমার?
আহা, কেমন বাচ্চাদের মতো অভিমান করছে দেখা পছন্দ হবে না কেন? কিন্তু আমরা তো আর রাজাগজা শেঠিয়া নই। আমাদের এত বড় বাড়ির দরকার নেই তো! বড় বাড়ি মেনটেন করার খুব কষ্ট। ঘরদোর ঝাড়পোঁছ করবে কে বল তো? ঝি তো পাঁচশো টাকা চাইবে।
কেন, ভ্যাকুয়াম ক্লিনার কিনব।
উঃ, তোমাকে নিয়ে আর পারি না। আমরা হচ্ছি বাঙালী মধ্যবিত্ত পরিবার। অত ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে আমাদের ভাল লাগবে না। যে যার নিজের ঘরে একা একা থাকলে কি ভাল লাগে? আমরা আর একটু ঘেঁষাঘেঁষি করে থাকব।
ঝুমকি, বুবকা, অনু তিনজনেই সমস্বরে বলে উঠল, তাদের আলাদা আলাদা ঘরই চাই। প্রাইভেসি চাই।
অপর্ণা রাগ করে বলে, এত বড় বাড়ি করতে কত টাকা লাগবে জানিস তোরা? বাপটাকে কি মারতে চাস।
০৫০. ভাঙনে নদীর ধারে বাড়িঘর
ভাঙনে নদীর ধারে বাড়িঘর করতে আছে বাবু? কাজটা ভাল হল না।
এ কি ভাঙনে নদী?
আগে তো খুব ভাঙত। আজকাল আঁটবাঁধ দেওয়া হয়েছে। এখন ভাঙছে না বটে, তবে নদীকে বিশ্বাস কি?
আমার যে এ জায়গাটাই পছন্দ।
পছন্দের কী আছে। গা-গঞ্জ জায়গা, গরিব দেশ। শখে শখে কিনলেন বটে, কিন্তু টেকা দায় হবে।
কেন, এখানকার লোক কি খুব খারাপ?
বাঁকা মিঞা মাথা চুলকে বলল, খারাপ ভাল নিজেই বুঝে দেখুন। গগন দাস দামখানা কি কম নিল? ঠারোঠোরে আপনাকে কত বললাম, বিশ হাজারের একটি পয়সাও ওপরে উঠবেন না। এ জমির দাম হাজার দশেক হলেই ঢের। তা আপনার তখন বাই চেপেছে, শুনলেন না। গগন দাস চেপে বসে রইল। ত্ৰিশ হাজারটা বড় বাড়াবাড়ি দাম হয়ে গেল কিন্তু একখানা মোটে ঘর আর তিন কাঠা জমির অত দাম হয়? গলাখানা বাড়িয়ে দিলেন বলেই না গগন কোপখানা দিল। খালধারে মহলের জমিটা কত সরেস ছিল, নিলেন না। দামটাও পড়তায় এসে যেত।
