দুহাতে অপর্ণাকে ধরে ফেলে মণীশ নিজের বুকে টেনে নেয় তাকে। বলে, শোনো, আমার কথা শেষ হয়নি এখনও।
তুমি ভীষণ খারাপ লোক। আগে জানলে তোমাকে আমি বিয়েই করতাম না।
মণীশ হেসে ফেলে। তারপর অপর্ণাকে একটু আদর করে বলে, মরার কথা বলছি বলে রাগ করছে কেন? মৃত্যুচিন্তা তো খুবই স্বাভাবিক। এই চিন্তাই তো মানুষকে জীবনের প্রতি আগ্রহী করে তোলে। ধরো আমাদের যদি মৃত্যু না থাকত, যদি আমরা কেউ বুড়ো অথর্ব না হতাম, হাজার হাজার বছর যদি এরকমই থাকতাম তাহলে কি সেটা ভাল হত। বড় একঘেয়ে হয়ে যেত না কি? এই যে আমাদের বাইশ বছরের বিবাহিত জীবনের সুখ, এটা কি বাইশ হাজার বছর টিকিয়ে রাখা সম্ভব হত অপু? আমরা দুজনে কি দুজনকে বাইশ হাজার বছর সহ্য করতে পারতাম।
ঘন হয়ে মণীশের বুকে লেপটে থেকে অপর্ণা বলল, পারতাম। আমি পারতাম।
মণীশ একটু হেসে বলল, নিষ্ঠুর সত্য হল, পারতাম না। কেউ পারতাম না। জীবনটা ক্ষণস্থায়ী বলেই কিছুটা সুন্দর। মৃত্যুটা কী তা আজ অবধি কেউ জানে না অপু। মৃত্যুর পরও কি আমি একটুখানি থাকব। আত্মা হয়ে? ভূত হয়ে? যেমন ভাবেই হোক আমি একটু থাকতে চাই। যদি ভূত হই তাহলে এ বাড়িতে তোমাদের কাছাকাছিই এসে থাকব। নিশুত রাতে
এ-ঘর ও-ঘর ঘুরে ঘুরে তোমাদের দেখব, আদর করব।
উঃ মা গো! তুমি বোধহয় মানুষ খুন করতেও পারো। আমার বুকের ভিতরটা কেমন করছে ওসব শুনো ছাড়ো তো আমাকে, ছাড়ো! আমি কিছুতেই তোমার কাছে থাকব না।
তোমাকে ছাড়া কাকে এসব কথা বলব বলো তো! আর কে আমার এসব আবোল-তাবোল শোনার জন্য বসে আছে? এক বুক কথা জমে থাকে, একজন কাউকে তো বলতে হবে! তুমি ছাড়া আর কে আছে আমার?
এসব বুঝি ভাল কথা।
ভাল নয়, কিন্তু আমার যে এখন এইসব কথাই মনে হয়। মরতে আমার একটুও ভয় নেই, কিন্তু কষ্ট আছে। মনের কষ্ট।
অপর্ণা দুহাতে বেষ্টন করে মণীশকে। সোহগে ভরা গলায় বলে,তুমি মরবে কেন? এসব ডেবো না। তোমাকে আমি ঠিক বাঁচিয়ে রাখব। আমার ইচ্ছের জোর আছে। আমার ভালবাসারও জোর আছে।
কী হয় জানো! আজকাল পৃথিবীকে বড় সুন্দর লাগে। তোমাদেরও যেন বেশী করে ভাল লাগে। এতকাল হেলাফেলা করে যখন বেঁচে থাকতাম তখন পৃথিবীর এত রূপ চোখেই পড়ত না।
প্লীজ। আর নয়। একদিনে অনেক বলেছে। রাত বাড়ছে। তোমার যে ঘুম দরকার।
ঘুমের কথাই তো হচ্ছে। টানা লম্বা চিরদ্রিা। আমার ঘুমোতে ইচ্ছেই করে না আজকাল। ইচ্ছে করে যতক্ষণ পারি জেগে থেকে পৃথিবীটা ভাল করে দেখে নিই।
তোমার সঙ্গে আজ কথাই তো বলতে পারছি না। ঝুমকির বিয়ের কথা তুলেই মস্ত ভুল করে ফেলেছি।
না, ভুল করেনি। বিয়ে দেওয়া যে দরকার তা আমি জানি। কিন্তু কোনটা আগে, কোনটা পরে তা স্থির করাটাই এখন জরুরী।
কী বলছে?
বলছি, আমার হাতে কতটা সময় আছে তা যখন জানি না তখন দেখতে হবে কোন কাজটা আগে করা দরকার, কোনটা পরে হলেও চলবে। আমি প্রথমেই বাড়িটা করে ফেলতে চাই। বুঝলে।
আজ অনেক খারাপ খারাপ কথা বলেছে। তবু তার মধ্যে এই একটা কথা যা শুনতে ভাল লাগছে। আমাদের একটা বাড়ি দরকার। ভাড়ার বাড়িতে থাকতে আমার একটুও ভাল লাগে না। পার্মানেন্ট কিছু না হলে একটা টেনশন থাকেই।
মণীশ একটু হেসে বলে, শুনলে তুমি রাগ করবে। কিন্তু জমির দলিল কখনও মন দিয়ে পড়েছো?
কেন বলো তো!
দলিলে পরিষ্কার লেখা থাকে জমিটা তোমার নয়। সরকারের। তোমাকে কেবল ভোগ দখলের স্বত্ত্ব দেওয়া হয়েছে। পৃথিবীর এক ছটাক জমিও তোমার নিজের নয়। আবার দেখ, জমিটা কি সরকারেরই! তাও নয়। কারণ, একদিন, অনেক অনেক বছর পরে পৃথিবীর সব সৃষ্টি যখন ধ্বংস হয়ে যাবে, পৃথিবী যখন একটা ঠাণ্ডা অন্ধকার গ্রহে পরিণত হবে তখন কোথায় সরকার, কোথায়ই বা তার অধিকার? পার্মানেন্ট কথাটাকে বিশ্বাস কোবরা না অপু। আমরা কেউ কোথাও কখনোই পার্মানেন্ট নেই।
তুমি আজ বড্ড জ্বালাচ্ছে তো!
তোমার মনটা খুব খারাপ করে দিলাম তো!
তা তো দিয়েছেই। আমার কান্না দেখতে তুমি বরাবর ভালবাসো।
আচ্ছা, ক্ষমা করে দাও।
ক্ষমা কি এত সহজ? আমার মনটা এমন ভেঙে দিয়েছে যে আর কিছুতেই ভাল হবে না। শুধু যদি অনেক আদর করো আর অনেক ভাল ভাল কথা বলো তাহলে হয়তো একটু ভাল লাগবে।
মণীশ শুধু আর একটু জড়িয়ে নিল অপৰ্ণাকে। তার বেশী কিছু করল না। তেমনি বিষাদ মাখানো গলায় বলে, শুধু এইটুকুর জন্যই কি জীবন?
আবার মাথা গরম হল বুঝি?
না। আমার মাথা খুব ঠাণ্ডা। কিন্তু ভেবে দেখ তো, মানুষ জন্মায় কেন? এই জন্মের উদ্দেশ্যটা কী?
কিছু একটা তো আছেই।
একটা মানুষ জন্মায়, বড় হয়, লেখাপড়া শেখে, রোজগার করে, বিয়ে হয়, সন্তান হয়, টাকা জমায়, বাড়ি করে, তারপর বুড়ো হয় মরে যায় ব্যাপারটা অদ্ভুত না।
কেন, অদ্ভুত কিসের?
শুধু এসবের জন্য তার জন্মানোর দরকারটা কি? তার চৈতন্য, বুদ্ধি, বিচারবোধ, এক্সপ্রেশন এসব তো কাজেই লাগে না। তার অস্তিতুটা একদম একটা ফালতু ব্যাপার বলে মনে হয় না তোমার।
আমি কি তোমার মতো ভাববার সময় পাই।
ভাবো না কেন অপু? ভাল করে ভেবে দেখো তো, এই সামান্য অর্থহীন ক্রিয়াকর্মের জন্য আমাদের জন্মানোর সত্যিই কি জরুরী প্রয়োজন ছিল। জন্মটাকেই আমার আজকাল কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে ইচ্ছে করে। জন্মলাম কেন অপু। এই জীবনটা যে বড় অর্থহীন। সম্পূর্ণ মিনিংলেস। ভেবে দেখ তো, সত্যিই এর কোনও অর্থ আছে!
