কিন্তু অপর্ণা নিজের অপ্রস্তুত মুখটাকে লুকোতেও পারে না। মণীশের অনিশ্চিত হৃদযন্ত্রের কথা ভেবে ভেবেই যে আজকাল বেশীর ভাগ সিদ্ধান্ত নেয়। এটাও নিয়েছিল।
বাড়ি করার কথা বলবে না অপু?
বাড়ি! হঠাৎ বাড়ি কেন?
তোমার যে চার কাঠা জমি কেনা আছে। আমি বেঁচে থাকতে থাকতে সেখানে একটা বাড়ি করে ফেল। এখনই শুরু করলে আমি হয়তো বাড়িটা দেখেও যেতে পারি।
বেড সুইচ টিপল না অপৰ্ণা। মণীশের দিকে খানিকক্ষণ অপলক চেয়ে থেকে বলল, আমাকে কাঁদাতে চাও? বউয়ের চোখের জল বুঝি খুব ভাল লাগে?
বলতে বলতেই অপর্ণার চোখ ভরে উঠল জলে। মণীশ সেদিকে চেয়ে রইল, কিন্তু একটুও উদ্বেল হল না। তার মুখখানা ক্লান্ত, বিমৰ্ষ, আনমনা। একটু ধরা গাঢ় স্বরে বলল, তুমি বাস্তববাদী অপু। ঠিকই ভাবো। কিন্তু তোমাকে আজ বলি, আমি কিন্তু তোমার চেয়েও বেশি ভাবি। আমার বউ আর তিনটে অপোগও বাচ্চাকে আমি কার জিন্মায় দিয়ে যাবো।
অপর্ণার ফোঁপানির শব্দ শুনতে পাচ্ছিল মণীশ। অন্য সময়ে হলে সে অস্থির হত। সে কারও কান্না সহ্য করতে পারে না। আজ বাধা দিল না। চিত হয়ে শুয়ে সিলিঙের দিকে চেয়ে বলল, আমি প্রভিডেন্ট ফান্ডের লোনের জন্য একটা দরখাস্ত দিয়েছি। বাড়ির প্ল্যান করার জন্য একজন আর্কিটেক্টের সঙ্গে একটু কথাও হয়েছে।
অপৰ্ণা কান্নার মধ্যেই বলল, চুপ করো।
কেঁদো না অপু। তোমার কথাটা আমি অন্যভাবে ধরিনি। নিজের মৃত্যুর কথা আমি তো সবসময়ে ভাবি।
অপর্ণা হঠাৎ তার গলা জড়িয়ে ধরে হেঁচকির মতো শব্দ করে বলে, কেন ভাববে? কত লোক তো হার্ট অ্যাটাকের পরও অনেকদিন বেঁচে থাকে। তুমি কেন থাকবে না।
বেঁচে থাকতে তো আমার আপত্তি নেই অপু। বাঁচলে তো ভালই। কিন্তু হার্ট যখন বিগড়ে বসেছে তখন তাকে বিশ্বাস করা কি ঠিক হবে? আমি বাড়িটাই আগে করে ফেলতে চাই। ঝুমকির বিয়ে নিয়ে তত মাথাব্যথা নেই। কিন্তু তোমাদের নিরাশ্রয় করে যাওয়াটা অপরাধ হবে।
আবার ওসব বলছো?
তোমার জমিটা আমার পছন্দ ছিল না। কিন্তু মনে হয় তুমি খুব বুদ্ধিমতীর কাজই করেছো।
আর বোলো না। চুপ করো, পায়ে পড়ি।
মণীশ নিজেই বাতিটা নিবিয়ে দিয়ে বলে, ভাবাবেগ নিয়ে বসে থাকা তো ঠিক নয় অপু। তুমি কাঁদছো কেন? তুমি তো জানো আমি কিরকম ফুর্তিবাজ হুল্লোড়বাজ মানুষ। যতক্ষণ বেঁচে আছি হাসি-খুশি-মজা নিয়েই তো বাঁচতে চাই। কিন্তু সেটা ইদানীং হচ্ছে না। ভবিষ্যতের চিন্তা এসে পড়ছে। কেবল ভাবছি তোমাদের কী হবে। প্রিয়জন মারা গেলে প্রথমটায় শুধু তার অভাবের জন্য হাহাকার হতে থাকে। কিন্তু সেই কষ্টটা বেশীক্ষণ থাকে না। তারপরে আসে অবশ্যম্ভাবী হিসেব নিকেশ। আমাদের জন্য লোকটা কতখানি রেখে গেল, আমাদের কতটা নিয়ে গেল। তখন শুরু হয় লোকটার বিচার।
তোমার মুখের কি কোনও আগল নেই? তুমি কি জানো তোমার প্রত্যেকটা কথা আমার বুকে এসে লাগছে।
কেন জানব না? তবু তোমাকে শক্ত হতে বলি। আমি আগে পয়সা ওড়াতে ভালবাসতাম। একটু বড়লোকী করতে ভাল লাগত। আজকাল দেখ না কত হিসেবী হয়েছি। আমার অপব্যয় তুমি চিরকাল অপছন্দ করতে। আমি আজকাল ভাবি, তুমিই ঠিক।
অপৰ্ণা মণীশের বুকের মধ্যে নিজেকে এগিয়ে দিয়ে বলল, প্লীজ! ঘুমোও।
মণীশের শিথিল একখানা হাত আলতো জড়িয়ে রাখল অপর্ণাকে। আলিঙ্গন করল না। মণীশ চাপা স্বরে বলল, হার্টের একটা ধাক্কা আমার জীবন-দর্শনটাই পাল্টে দিয়ে গেল। মৃত্যুটা কী জিনিস বলো তো অপু! তোমাদের ছেড়ে আমি কোথায় যাবো? তোমাদের ছাড়া আমি যে কিছু ভাবতে পারি না।
অপৰ্ণা মণীশকে প্রগাঢ়ভাবে চুমু খেল। চেষ্টা করল তাকে যৌন আবেগে অন্যমনস্ক করার। কিন্তু পারল না। মণীশ আজ বিষণ্ণ, আনমনা। মণীশকে আজ ভূতে পেয়েছে।
মণীশ অপর্ণাকে কোমলভাবে নিরস্ত করে বলে, আমার মৃত্যুর ঠিক পরের অবস্থাটা নিয়ে আমি খুব চিন্তা করি অপু। আমি মরে গেলে তোমরা খুব কাঁদবে, পাগলের মতো হয়ে যাবে শোকে। আমার মৃতদেহ নিয়ে যেতে দেবে না, খাট ধরে পড়ে থাকবে তুমি …
অপর্ণার হাত এসে মুখটা চাপা দিল মণীশের। অপর্ণা ফের নতুন করে কেঁদে উঠল, ও কথা কি করে বলছে তুমি? এমন করে কেউ বলে?
শোনোই না। এ শুধু কথার কথা তো নয়। জীবনে সত্যগুলোর মুখোমুখি হবে না অপু? শুধু ভয় পেলে, শুধু কাঁদলেই কি হবে?
চুপ করো! চুপ করো। আর বোলো না।
শোনো, অপু, নিষ্ঠুর সত্যটার কথা শোনো। তোমাদের মোক খুব সত্য। আমার জন্য তুমি কাঁদবে, ঝুমকি-বুবকা-অনু কাঁদবে! বাড়িটা ভীষণ ফাঁকা হয়ে যাবে। সব সত্য। কিন্তু শোকের পাথর বুকে চাপা দিয়ে কতদিন থাকবে তোমরা? একদিন চোখের জল মুছে উঠতে হবে তোমাদের। ঘর-গেরস্থালিতে চোখ ফেরাতে হবে। দিনের পর দিন কাটতে থাকবে। শোক কমতে থাকবে। ধীরে ধীরে বাড়িটা আর তত ফাঁকা লাগবে না। সব সময়ে আমার কথা আর মনে পড়বে না। শোক তো পুকুরে ঢিল। ধীরে ধীরে ঢেউ মরে যায়। আবার নিথর হয়ে যায় জল। এ বাড়িতে, এ সংসারেও তেমনি ধীরে ধীরে আমার অভাবটাও তোমাদের অভ্যাস হয়ে যাবে। ছেলেমেয়েরা বড় হবে, ওদের সংসার-টংসার হবে, ছেলেমেয়ে হবে, তোমার হবে নাতি-নাতনী। আমি তখন নেই হয়ে যাবো। শুধু স্মৃতি। তাই না অপু?
অপর্ণা উঠে বসে খোঁপা ঠিক করতে করতে বলল, আমি ঝুমকির কাছে শুতে যাচ্ছি। তুমি একা থাকে। এরকম অসভ্য লোকের সঙ্গে আমি থাকতে চাই না।
