বড় ভয় হয় যে বাবা।
ভয় পেয়ো না। ভগবান এখনও আছেন।
নিরঞ্জনবাবু কিছু আগাম দিলেন। চাকরির পাশাপাশি দিন তিনেকের মধ্যে দোকানটাও ইকে দিল নিমাই। চা, বিস্কুট, কোয়ার্টার পাউরুটি আর ঘুগনি। লেবারাররা খুব খেতে লাগল দোকানে।
এত সব ঘটে যেতে মাত্র দিন দশেক লাগল। মাত্র দিন দশেক আগেই না এক ভোরবেলা শ্বশুরবাড়ি থেকে বেরিয়ে। তার মনে হয়েছিল দুনিয়ায় তার আর যাওয়ার জায়গা নেই? চোখের জলে দুনিয়াটাকে ড়ুবল করে ফেলেনি নিমাই? ভগবান যে এখন টাকাটা-সিকেটার বৃষ্টি নাহি দিলেন সে কি এমনি?
এগারো দিনের মাথায় পুরোনো খোলটা ভাল করে ছেয়ে নিল নিমাই। সন্ধের পর সেটা ড়ুগড়গ করে বাজিয়ে, কখনও করতাল নিয়ে কীর্তনে বসে যায়। আজকাল নাম গান করতে তার সহজেই চোখে জল আসে। বুকের মধ্যে বিরহের কোকিলটাও বড় ডাকে। আর বুকের মধ্যেই আরও একটা ব্যাপার হয়। উত্তরে বাতাসে নাড়াবন যেমন আগুনে হু হু করে পুড়ে যায় তেমনি একটা কিছু পোড়। বড় জ্বালা।
বীণাপাণি ত্যাগই দিল তাহলে? খবরটাও নিল না তো! নিমাইও খবর করল না। বুকের যেখানটায় সেই রাতে খামচে ধরেছিল বীণা, সেখানটায় যেন আজও ব্যথাটা থাবা গেড়ে আছে।
এই যে নিমাইদা, কেমন খবরটা দিয়েছিলাম তোমায়?
নদে! আয়, বোস।
দুপুরের টিফিনের সময়। দম ফেলার ফুরসত নেই নিমাইয়ের। তবু ভারি কৃতার্থ লাগে নদের কাছে। যত্ন করে এক প্লেট ঘুগনি তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে, খা। কেমন হয়েছে বল দেখি।
আর একটু ঝাল দিয়ে কসা করলে খুব জমত।
ওরে, কষা করলে পাউরুটি ডোবাবে কিসে? ঝোল না হলে হয়? দেখ না কেমন ড়ুবিয়ে খাচ্ছে।
তা বটে। তা কেমন হচ্ছে তোমার?
তোর জন্যই হল।
আরও বড় কিছু ধরলে পারতে। কটা টাকাই বা হয়।
জিব কেটে নিমাই বলে, এর বেশি চাইতে নেই। আমার তো এতেই মনে হয় রাজা-গজা হলাম বুঝি। বুড়োবুড়ি চাট্টি খেতে পাচ্ছে, আমারও দুবেলা জুটে যাচ্ছে। আমার মত মানুষ আর কী চায় রে? এটুকু জুটলেই হল।
তোমার দ্বারা কিছু হবে না নিমাইদা। তোমার মনটাই এইটুকুন।
তা বটে।
আমিও যে এইটুকুন।
০৪৯. বড় মেয়ের বয়স
তোমার বড় মেয়ের কত বয়স হল তা জানো?
কেন জানব না? উনিশ।
মোটই নয়, কুড়ি পেরিয়ে একুশ।
বাড়াচ্ছে। কুড়ি পেরোলেও একুশ হয় না, একুশ পূর্ণ হলে একুশ হয়।
বাপদের একটা দোষ কি জানো? ছেলেমেয়েদের বয়স হলেও সেটা স্বীকার করতে চায় না। তুমি হলে সেইসব বাপদের মধ্যে আরও এক কাঠি। আচ্ছা না হয় কুড়িই হল, কুড়িও কি কম?
এসব হিসেব নিকেশ উঠছে কেন অপু। বিয়ের কথা ভাবছে নাকি?
ভাববো না? তুমি ভাবো না বলেই আমাকে ভাবতে হয়। আমার তো আর তোমার মতো চোখ বুজে থাকার অভ্যাস নয়।
কী সর্বনাশ! তুমি ঝুমকির বিয়ের কথা ভাবছে! আজকাল কি মেয়েদের কুড়িটা কোনও বয়স? তুমি যে গৌরীদানের যুগে ব্যাক করে যাচ্ছো!
পাত্র বাছতে বাছতে কুড়িই বাইশ তেইশে গিয়ে দাঁড়াবে। মেয়ের বিয়ে বলে কথা, আগে থেকে চেষ্টাটা অন্তত শুরু করতে হয়।
মণীশ কিছুক্ষণ অপলক চোখে তার বউয়ের দিকে চেয়ে থেকে বলল, তোমার কথাবার্তা এত প্রবীণা গৃহিণীর মতো হয়ে যাচ্ছে কেন বলো তো! বুড়িয়ে যাচ্ছে নাকি?
অপর্ণা হেসে ফেলল। তারপর মুখটা একটু গম্ভীর করার চেষ্টা করে বলল, অস্বীকার করে লাভ নেই যে, আমাদের বয়স হল।
ওভাবে বোলোনা অপু। কানে লাগে। এই তো সেদিনও তুমি যুবতীটি ছিলে, আজও আছে। অন্তত আমার চোখে তো অন্যরকম লাগছে না। তবে প্রবীণটি হলে কবে?
প্ৰবীণা না হলেও মধ্যবয়স্কা।
তার মানে কি বিগতযৌবনা?
যৌবনের খবর কি আমার রাখার কথা। আমি শুধু জানি আমার ছেলেমেয়ের বয়স হচ্ছে, সংসারের দায়িত্ব বাড়ছে।
একটা কথা বলো অপু। সাজগোজ করে যদি বেরোও তাহলে কি আজকাল পুরুষের অ্যাডমিরেশন পাও না? দু-চার জোড়া মুখ চোখ কি তোমার দিকে চেয়ে থাকে না।
অপর্ণা রাগ করতে চেষ্টা করল। কুটি করেও হেসে ফেলে বলে, আমি আজকাল সাজি নাকি? পুরুষদের লক্ষ করতেও আমার বয়ে গেছে।
একটু লক্ষ কোনো অপু। যদি দেখ যে, পুরুষের চোখ এখনও তোমাকে লক্ষ করছে তাহলে নিশ্চিতভাবে জেনো, তোমার যৌবন যায়নি।
যে-পুরুষটিকে নিয়ে আছি সে লক্ষ করলেই হল। আর আমার কাউকে চাই না।
আমার চোখ তো ভুল চোখ। সেই যে ট্রামগাড়িতে চয়ে আধমরা যুবতীটিকে দেখেছিলাম, চারদিকে টিয়ার গ্যাস, গুলি আর ট্রামের মধ্যে পড়ে থাকা লাশের ভয়ংকর অবস্থায়, দেখেই আমার ভিতরে যে একটা উথাল-পাথাল হয়েছিল, আজও তোমাকে দেখলে ঠিক সেরকমটি হয়। কই, পাল্টাওনি তো তুমি! আমার চোখে তোমার বয়স বাড়ে না, যৌন যায় না। তাই বলছি আমার চোখ হল ভুল চোখ।
ভুল চোখই তো। তোমার চোখে আমার বয়স বাড়ে না, ছেলেমেয়ের বয়স বাড়ে না।
মেয়ের বিয়ের কথা উঠছে কেন বলো তো!
দেখতে থাকা ভাল। বয়স হয়ে গেলে আর ভাল পাত্র পাবে না।
না, অপু, তুমি সেজন্য বলছে না।
তবে কেন বলছি।
রাত্রে শোওয়ার আগে বিছানায় দুজন পাশাপাশি আধশোয়া। গায়ে পাতলা কম্বল। একটু বাদেই বেড সুইচ টিপে আলো নিবিয়ে দেবে অপর্ণা। তার আগে দুজনে দুজনের দিকে চেয়ে আছে নিৰ্ণিমেষ।
মণীষ হঠাৎ বলল, তুমি আমার হার্ট অ্যাটাকের কথা ভেবে বলছে না তো? হয়তো ভাবছো, আমার অনিশ্চিত আয়ু, তাই তাড়াতাড়ি ঝুমকির বিয়েটা দিয়ে দেওয়া ভাল। তাই ভাবছে অপু?
ভারি বিব্রত বোধ করে অপর্ণা। বলে, যাঃ! ওকথা কেন ভাববো? কী যে যা-তা বলো না।
