মনে হল, অমৃত কি এর চেয়ে ভাল?
এ সবের ফাঁকে ফাঁকে বুকের মধ্যে কি বিরহের কোকিলটা ডাকেনি? ডাকছে, থেকে থেকে ডাকছে। হু-হু করে জ্বলে যাচ্ছে বুকের ভিতর শুকনো পাতা। বড় মোলায়েম করে ডাকতে ইচ্ছে যাচ্ছে, বীণাপাণি! ও বীণাপাণি।
টপ করে এক ফেঁটা চোখের জল পড়ল হাতের গরাসে। সেটা খেয়ে ফেলল নিমাই। খিদের আগুনে বিরহের আহুতি হোক। জন্মের শোধ আহুতি হয়ে যাক।
বেলা পড়ার আগেই নদে এল।
চলো নিমাইদা, একটু কোথাও গিয়ে বসি।
পালপাড়ায় বসার জায়গা মেলা। তারা গিয়ে মাঠের ধারে ঘাসে বসল।
এবার বলো, বৃত্তান্তটা কী।
নিমাই কিছুক্ষণ থম ধরে থেকে বলে, তুই আমাদের মেলা উপকার করেছিল। তোর জন্যই বীণার একটা হিল্পে হল।
সে আর বেশি কথা কিসের? তোমাকে অত গদগদ হতে হবে না।
বলি কি, এবার আমারও একটা হিল্লে করে দে।
সে কি কথা গো! শুনলাম যে বনগাঁয়ে তুমি মনোহারী দোকান দেবে।
সে প্রস্তাব ভেসে গেছে। সে আর হবে না।
কেন, হলটা কী?
তোকে সব বলবখন। তবে কথাগুলো একটু আগে গুছিয়ে নিই। আমি তো ভাল কইতে পারি না। হড়হড় করে সব কথা যদি বেরিয়ে যায় তাতে ভাল হবে না। কিছু কথা চাপতে হয়, কিছু ছাড়তে হয়। না গুছিয়ে কি বলতে পারি। কয়েকটা দিন সময় দে।
তা বটে। সকালে কেঁদে ফেলেছিলে, তখনই বুঝেছি ব্যাপার গুরুচরণ।
আমার একটা কাজ না হলেই নয় রে নদে। চেষ্টা করবি?
নদে একটু চিন্তিত হয়ে বলে, কাজ তো মেলা নিমাইদা, কিন্তু সেসব তোমার জন্য নয়। তুমি হলে সাধু মানুষ। মিথ্যে কথা কইবে না, চুরি করবে না, অন্য পথে যাবে না। তোমার জন্য কি এই কলিকালে কোনও কাজ আছে। তবে একটা খবর দিতে পারি তোমায়। ভাল খবর।
কী খবর রে?
তোমার সেই পুরোনো ঠিকাদারবাবু আবার এ তল্লাটে কাজ করছে।
নিমাই অবাক হয়ে বলে, তাই?
কাঁচড়াপাড়ার দিকে কি সব সরকারী ভবন-টবন হচ্ছে। একবার গিয়ে দেখতে পারো।
নিমাই একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, বড় ভালবাসতেন আমায়। কিন্তু এখন কি আর চিনতে পারবেন? তার মেলা লোক-লঙ্কর, কত জনকে মনে রাখবেন?
গিয়ে একবার পেন্নাম ঠুকে দাঁড়াও সামনে। কিছু হলে হল, নইলে মনে করে নেবে, চেষ্টা তো করেছিলাম, হয়নি তো কি করা যাবে?
খবরটা ভাল। খুবই ভাল। কিন্তু নিমাইকে মনে রাখা শক্ত। সে ছোটোখাটো, রোগাভোগা, ক্ষয়া মানুষ। মনে রাখার মতো চেহারাখানাও তো নয়।
কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার, নিরঞ্জনবাবু তাকে মনে রেখেছেন। পরদিন সকালবেলায় যখন নিরঞ্জনবাবুর কাছে কাঁচড়াপাড়ায় গিয়ে হাজির হল নিমাই তখন নিজের নামধামও বলতে হল না। নিরঞ্জনবাবু তার দিকে চেয়েই বলে উঠলেন, নিমাই না?
নিমাই তাড়াতাড়ি পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে বলল, যে আজ্ঞে।
বলেই তার চোখে জল এল কৃতজ্ঞতায়।
তা কি করছে এখন?
কিছু নয়। বসে আছি।
বিয়ে করেছিলেন না?
আজ্ঞে।
তবে তো সংসার হয়েছে। চলছে কিসে?
নিমাই মাথা চুলকোলো। চোখে ফের জল আসছে।
দৈববাণীই যেন শোনা গেল নিরঞ্জনবাবুর গলায়, কাজ চাও নাকি?
নিমাই মরমে মরে গেল। উনি আসামে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, নিমাই যায়নি। সেই লজ্জা আজ তাকে অপোবদন রেখেছে।
নিরঞ্জনবাবু বললেন, তুমি ধৰ্মভীরু সৎ লোক। আমি এখানে আরও বছরখানেক কাজ করব। বেশিও হতে পারে। লেগে পড়তে পারো কাজে।
নিমাই নিরঞ্জনবাবুর দিকে চেয়ে জলভরা চোখে ধরা গলায় বলল, আপনার বড় দয়া।
কাঁদছো কেন? কী হয়েছে?
আজ্ঞে, কিছু হয়নি। আমার মনটা বড় দুর্বল। দয়া-মায়া দেখলে চোখে জল আসতে চায়।
পাগল আর কাকে বলে! তুমি একটা দোকান দিয়েছিলে না?
সে টোকেনি।
নিরঞ্জনবাবু একটু ভেবে নিয়ে বললেন, চৌকিদারের চাকরি যেমন করার করবে, সঙ্গে আর একটা কাজও করতে পারো। গোডাউনের ধারেই কাজ হচ্ছে। সাইটে একটা চা-বিস্কুটের দোকানও খুলতে পারো। কাল থেকেই লেগে পড়া কাজে। আগে যা দিতাম তার চেয়ে কিছু বেশিই পাবে। টাকার দাম কমছে।
নিজের কানকে, নিজের ভাগ্যকে যেন বিশ্বাস হচ্ছিল না নিমাইয়ের! কলিকালে সৎ হওয়া হয়তো আহাম্মকি, কিন্তু সে বুকের মধ্যে এইটুকু পুষে রেখেছিল বলেই নিরঞ্জনবাবুর তাকে চিনতে ভুল হল না। ওইটুকুর জন্যই ফের পুরোনো চাকরি ফিরে এল।
সন্ধেবেলা বাড়ি ফিরে নিমাই আজ কীর্তন করতে বসল। গাইতে গাইতে চোখ ভেসে গেল জলে। ভগবানের নামে কত জয়ধ্বনি দিল সে। এই যে মরতে মরতেও বেঁচে থাকা, এই যে প্রাণপাখি সঁচা ছেড়ে গিয়েও ফের ফিরে আসে, এটুকুই তাঁর দয়া।
মা বলল, আহা, কী গলাখানা ভোের। শুনলে বুক জুড়োয়। গা বাবা, খুব গা।
শশাওয়ার আগে আজ ঠাকুরকে উদ্দেশ্য করে ভক্তিভরে প্রণাম করল নিমাই। বলল, বীণাকে ভাল রেখো ঠাকুর। তার সুমতি হোক।
রাতে তার ঘুমের মধ্যে বিরহের কত ঢেউ যে এসে ভাঙল তার ঠিকঠিকানা নেই। বীণাপাণিকে স্বপ্নে দেখল। কী যে দেখল তা জাগার পর আর মনে রইল না।
সকালে পকেটের টাকা বেশিরভাগই মায়ের হাতে দিয়ে বলল, এ দিয়ে কষ্ট করে কয়েকটা দিন চালাও। আমার কাজ হয়েছে। আর তেমন কষ্ট হবে না।
ওরে, বীণাপাণির খবর কি? তোকে যে কেমনধারা দেখছি।
বললাম তো বাপের বাড়ি গেছে।
সে তো শুনলাম। কিন্তু তুই লুকিয়ে কাঁদিস কেন?
অত খতেন নিও না তো মা। নিমাই রাগ করে বলে।
খতেন নেবো না? ঝগড়া করেছিস নাকি?
না গো, ঝগড়া করার সুবোদ কি আমার? তারটা খাই, তারটা পরি, ঝগড়া করলে চলবে?
তাহলে হল কী?
কিছু হয়নি।
