বসে বসে আকাশ-পাতাল ভাবতে লাগল নিমাই। সে বড় ভালবাসে বীণাপাণিকে। বীণা ছাড়া জীবন কি এখন থেকেই আলুনি লাগতে শুরু করল? তার হাতে-পায়ে যেন সাড় নেই, বুকে একটুও জোর পাচ্ছে না। বড় ন্যানো লাগে যে নিজেকে।
বেলা বাড়ছে বলে জোর করেই একসময়ে উঠে পড়ল নিমাই। বাস ধরল। বাসে বসেই হঠাৎ তার নদেরষ্টাদের কথা কেন মনে হল কে জানে।
নদেরাদই বীণাকে যাত্রা দলে নিয়ে এসেছিল। বোধহয় বীণার সঙ্গে কেটু আশনাইও হয়ে থাকবে। নদেরাদ মেয়েবাজ মানুষ। তবে কিনা শেষ অবধি নাগালে পায়নি। যুঁসেছিল কিছু দিন। তারপর অন্য ধান্ধায় লেগে পড়ল। সম্পর্কে একটু দূরের ভাই হয় নিমাইয়ের। অবস্থা ভাল।
পালপাড়ায় বাস থেকে নেমে হাঁটতে হাঁটতে ভরদুপুরে সে নিজের বাড়ি না গিয়ে নদের বাড়িতে হাজির হল গিয়ে। বেশ বড় পাকা বাড়ি, ফলন্ত গাছপালা আছে। গোয়াল আছে, গবু আছে। ধানের মরাই আছে। নদের মা সম্পর্কে তার কাকিমা। তার সঙ্গে প্রথমে দেখা।
নিমাই নাকি রে? কী খবর তোদের? অনেক দিন দেখি না।
নিমাই দাওয়ায় বসে একটু দম নিয়ে বলল, এবার থেকে দেখবে। খুব দেখবে। নদে কোথায়?
ছিল তো। দেখ গে ভিতরের ঘরে।
নদে ঘরেই ছিল। জানালার ধারে বসে গোঁফে কেয়ারি করছে। শৌখীন মানুষ।
নিমাইদা যে! খবর-টবর কি?
আমি তোর কাছে একটু কাজে এসেছি।
কী বলো তো! বোসা না চেয়ারটায়। হল কী তোমারমুখচোখ ওরকম দেখাচ্ছে কেন?
নিমাই সামলাতে পারল না নিজেকে। চেয়ারে বসে দু হাতে মুখ ঢাকা দিয়ে আচমকা কেঁদে ফেলল।
আরে দেখ দেখ! হল কি গো নিমাইদা?
নিমাই মাথা নাড়ল শুধু। কিছু বলতে পারল না। তার বুকে অনেক কান্না জমে আছে। টইটুর। টুকি লাগলেই চলকে পড়ছে আজ।
ঝগড়া করে এসেছে নাকি বীণার সঙ্গে? না কি অন্য কিছু?
নিমাই জবাব দিল অনেকক্ষণ বাদে। ধরা ফোপানো গলায়। বলল, নদে, আমাকে একটা কাজ জোগাড় করে দে। যেমন-তেমন কাজ।
কাজ! বলে নদেরাদ চুপ করে রইল। তারপর বলল, বুঝেছি।
কী বুঝলি?
ঝগড়াই করেছো।
ঝগড়া নয়।
তবে?
সে অনেক কথা। পরে শুনিস।
বাড়ি যাও নিমাইদা। মাথা ঠাণ্ডা করো। তোমার বউ কিন্তু খারাপ মেয়ে নয়।
খারাপ কি বলেছি। বীণা খারাপ নয় তা আমার চেয়ে ভাল কে জানে? খারাপ হল কপাল।
বাড়ি যাও। আমি একটু বেক্টেচ্ছি। বিকেলে যাবোখন তোমার বাড়ি। শুনব সব।
ক্লান্ত শ্ৰান্ত নিমাই উঠল। বলল, যাই।
শ্ৰীহীন, পড়ো-পড়ো টিনের ঘরের বাড়িতে যখন এসে ঢুকল নিমাই তখনই টের পেল, তার অভ্যাস কত পাল্টে গেছে। তারাও গরিব বটে, কিন্তু এখানে যেন আরও বড় অভাবের বাঘ হানা দিয়ে গেছে।
মায়ের সঙ্গে উঠোনেই দেখা। রোদে বসে কুলোয় করে খুদকুঁড়ো কিছু বাছছে। মাটির দাওয়ায় সিঁড়িতে চাঁদর মুড়ি দিয়ে বসা তার জরাজীর্ণ বাবা। দৃশ্যটা খানিক দাঁড়িয়ে আগে দেখল নিমাই।
নিমাইকে দেখে মা চোখ কপালে তুলে বলে, ওমা গো! তুই!
এই এলাম একটু।
মায়ের চোখে কি একটা প্রত্যাশা, একটু লোভ চকচক করে উঠল নাকি? বনগাঁ থেকে ছেলে এসেছে, পকেটে হয়তো মেলা টাকা!
বাবা চোখে ভাল দেখে না। ঘড়ঘড়ে গলায় যেন একটু আহ্লাদ উথলে উঠল, নিমাই নাকি রে! উরেব্বাস, কী কাণ্ড!
কাণ্ডটা যে কী তা নিমাই এদের কাছে প্রকাশ করতে পারবে না। বীণাপাণি এ বাড়ির প্রাণভোমরা। সেই বীণার সঙ্গে ছাড়ান-কাটান হয়েছে শুনলে বুড়োবুড়ি মূৰ্ছা যাবে।
মা বলল, খাবি তো এবেলা? চালের জোগাড় দেখতে হয় তাহলে।
কেন, চাল নেই?
মা একটু দমিত গলায় বলল, আমরা তো খুদ সেদ্ধ করে জাউ-ভাত খাই। সঙ্গে শাকপাতা, পেঁপে, ধুধু সেদ্ধ দিয়ে দিই। সে তুই খেতে পারব না।
খুব পারব। ওতেই হবে।
বীণাকে আনলি মা বাবা?
না মা, সে বাপের বাড়ি গেছে।
ঘরদোরের অবস্থা ভাল নয়। চালের টিন ঝুরঝুর করছে। আগে বেড়ার ঘর ছিল, পরে মেটে ঘর তুলেছিল তারা। মাটির ঘরের পিছনে খিদমত দিয়ে হয়। লেফা-পোছা, মাঝে মাঝে কাদামাটি চাপান দেওয়া। তা সেসব আর মা পেরে ওঠে না। মেলা গর্ত, খন্দ তৈরি হয়েছে দেয়ালে আর ভিটেতে। তাদের বনগাঁর ঘর এর চেয়ে আর একটু ভাল, পয়পরিষ্কার। তফাতটা দেমাক করার মতো নয়, কিন্তু তফাত একটু আছে।
বেশি কথা কইলে বিপদ। নিমাই আবার পেটে কথা রাখতে পারে না। তাইসে ঘরে এসে ধুতি জামা ছেড়ে গামছা পরে নিল। তারপর লেগে পড়ল ঘরদের সারতে। সকালের চা আর বিস্কুট পেট থেকে অনেকক্ষণ আগে উধাও হয়ে গেছে। খিদে আঁচড়া-আঁচড়ি করছে পেটে বনবেড়ালের মতো। নিমাই। এক ঘটি জল খেয়ে নিল। তারপর লোহার বালতি নিয়ে পুকুরে নেমে পড়ল কাদামাটি তুলতে।
মা বলল, ওরে, করিস কি? হা-ক্লান্ত হয়ে এলি, একটু জিরিয়ে নে। কিছু তো দাঁতেও কাটিসনি বাবা।
দাঁতে কাটার মতো জিনিস যে ঘরে নেই তা নিমাই জানে। চাট্টি মুড়ি খেতে হলেও দোকান থেকে বাকিতে আনতে হবে। নিমাইয়ের পকেটে এখনও কয়েকটা টাকা আছে। কিন্তু বাবুগিরি করে নষ্ট করা যাবে না। সে বলল, শ্বশুরবাড়ি থেকে আসছি, তারা কি আর খালি মুখে ছাড়ে?
তোর রোগা শরীর।
শরীর কি বসিয়ে রাখার জন্য মা? ঘরদোরের যা ছিরি হয়েছে, না সারালে তোমরা দেয়ালচাপা পড়ে মরবে যে।
মা শুধু বলল, তা ঠিক। আমরা কি পারি আর ওসব?
নিমাই অবশ্য পারল। অনেক বেলা অবধি বালতি বালতি মাটি টেনে ঘর সারল, উঠোনোর চারধার থেকে আগাছা সাফ করল, ঘরদোর উঠোন সব নিকিয়ে ফেলল। তারপর আগুনের মতো খিদে নিয়ে বসল জাউ-ভাত খেতে।
