দুবছর আগে জমিটা কেনা হয়েছে। মণীশ একবারও দেখতে যায়নি। ছেলেমেয়েরা দেখে নাক সিটিকেছে। ওঃ, এই জায়গা!
এই তাচ্ছিল্য ও উপেক্ষা মেনে নিয়েছে অপর্ণা। দেয়াল দিয়ে প্লটটা ঘেরা করিয়েছে।
মাঝে মাঝে সে ওই চার কাঠা জমির কথা ভাবে আর মনটা আনন্দে ভরে যায়। সব জায়গা থেকে উৎখাত হয়ে গেলেও তাদের জন্য ওই চারকাঠা জমি কোল পেতে থাকবে। সেখানে অনেক গাছ লাগিয়ে এসেছিল অপর্ণা। গাছগুলো। হয়েছে। তাদের ঘিরে আগাছাও জন্মেছে অনেক।
আজ এই বিষণ্ণ সন্ধ্যায় অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ ভাবনার মধ্যে তার কাছে একটা দ্বীপের মতো ভেসে উঠল ওই চারকাঠা জমি। মণীশ, তুমি জানো না, এখন কত হিসেবা-নিকেশের দিন এল আমাদের।
মা! একটু চা হবে?
অনু খুব করুণ গলায় বলে।
অপর্ণা মৃদু ধমক দিয়ে বলে, খালি পেটে চা কিসের? আগে কিছু খেয়ে নে। পাউরুটি টোস্ট করে দিচ্ছি।
না, কিছু খাবো না। অবেলায় খেয়ে বমি বমি লাগছে। চা দেবে মা?
মোহিনী তো চা খায় না, ওকে একটু মিষ্টি-টিষ্টি দে। দ্যাখ, ফ্রিজে বোধহয় আছে।
মোহিনী বলে, মাসিম, আমার সঙ্গে ফর্মালিটি কিসের? মিষ্টি আমি খাই না।
তুমি তো চা খাও না, কত ভাল তুমি! আর দেখ অনুর এ বয়সেই চায়ের নেশা।
টেলিফোনটা রেখে অনীশ রাগের গলায় বলে, ওরা কোনও ইনফর্মেশন দেয় না কেন বলো তো মা?
কেন, কী বলল?
বলল, পেশেন্ট স্টেবল, ঘুমোচ্ছেন।
তাহলে তো ঠিকই আছে। আর কী ইনফর্মেশন চাস?
তুমি বুঝছে না। ফোন ধরেই বলে দিল। তার মানে বাবার কেবিনে গিয়ে খোঁজ-খবর নিয়ে তো আর বলল না। সবাইকেই বোধহয় এরকম বলে দেয়। আমি বরং একবার গিয়ে ঘুরে আসি।
দূর পাগল! এত অস্থির হওয়ার কী আছে? দু রাত নার্সিং হোমের চেয়ারে বসে কাটিয়েছিস। আজ একটু রিল্যাক্স কর।
মা, তুমি নিজে রিল্যাক্স করতে পারছে কি? বাবা যতক্ষণ না আউট অব ডেনজার হচ্ছে ততক্ষণ আমার রিল্যাক্স করার প্রশ্নই নেই।
টেলিফোনটা আবার বেজে উঠতেই আবার যেন বজাঘাতে কেঁপে ওঠে। অপর্ণা। কী হল? ফোন বাজছে কেন?
বুবকা ফোন তুলল, কে?… ওঃ দিদি! তুই কোথা তেকে ফোন করছিস! অ্যাঁ!… নার্সিং হোম! তোকে কে বলল যে আমাদের ফোন ঠিক হয়ে গেছে!… ওঃ। হ্যাঁ।
অপর্ণা স্তব্ধ হয়ে থাকে। কান বা বা করছে ভয়ে, উত্তেজনায়।
কী বলছে রে ও?
বুবক হেসে বলে, দিদি নার্সিং হোমে চলে গেছে। ওখানে ওরাই বলেছে যে বাড়ির ফোন ঠিক হয়ে গেছে। তাই দিদি। ফোন করছিল।
নার্সিং হোমে চলে গেছে! আর দেরি দেখে আমি এদিকে ভেবে মরছি।
বুবকা উদাস হাসি হেসে বলে, আমাদের এখন কোনও রুটিন নেই মা। মাথা কারও নর্ম্যাল কাজ করছে না। তোমারই কি করছে, বলো! মঙ্গলবার ওই দৃশ্য দেখার পর… ওঃ ইট ওয়াজ এ নাইটমেয়ার!
অপর্ণা চোখ বুজে শক্ত হয়ে যায়। প্রিয় মানুষের ব্যথা সহ্য করাই বোধহয় পৃথিবীতে সবচেয়ে কঠিন কাজ। যখন বুক জুড়ে সেই ব্যথার বাঁশি বেজে উঠল। মণীশের, সে শুধু চিৎকার করেছিল আপু… আপু… বাঁচাও… মরে যাচ্ছি…
বুক মথিত করা সেই ব্যথা। যেন এক মত্ত মাতঙ্গ পায়ের তলায় পিষে ফেলছে। ওর বুক। দুটো চোখ ঠেলে বেরিয়ে আসছিল, বেঁকে যাচ্ছিল মুখ। সে যেন নিত্যকার চেনা মণীশ নয়। এ যেন অন্য মণীশ।
কিছুক্ষণ তারা সকলেই শুধু কি হল কি হল বলে উদভ্ৰান্ত আচরণ করেছিল। সবার আগে স্বাভাবিক বুদ্ধি ফিরে পেল অপর্ণা। সে দৌড়ে বেরিয়ে গিয়ে উল্টোদিকে বাড়ির ডাক্তারবাবুকে ডেকে আনল। তিনি সাধারণ ডাক্তার। হার্ট স্পেশালিস্ট নন। কিন্তু প্ৰাথমিক একটা সামাল দিয়েই বললেন, ইমিডিয়েটলি হসপিটালাইজ করুন। কেস সিরিয়াস।
আজও সেই ঘোষণার ধাক্কা তারা সামলে উঠতে পারেনি। আজও যেন মণীশের সেই ব্যথা এ বাড়িতে রয়ে গেছে।
হঠাৎ ডোরবেল বেজে উটিলে, কেউ জোরে কথা বললে, হঠাৎ দমকা বাতাস বয়ে গেলে কেন যে ধক করে ওঠে অপর্ণার বুক! সামান্য শব্দই বজ্ৰপাতের মতো চমকে দেয়। তাকে। আর অপর্ণার চারদিক যেন এক ঘোর লাগা অবাস্তব। রিয়ালিটি ব্যাপারটা সে ঠিক টের পাচ্ছে না। প্ৰাণপণে সে স্বাভাবিক থাকতে চাইছে। ঠিকঠাক পেরে উঠছে না। অভিনয় করে যাচ্ছে। রাতে একা ঘরে সে কেন টের পায়, মণীশের বুক-জোড়া গহন ব্যথা গুমরে বেঁড়াচ্ছে ঘরময়? এরকম ভাবা কি স্বাভাবিক?
এত ভয় করে! এত এক লাগে! এত দুশ্চিন্তা আসে মনে! কাজের মেয়েটা আগে বস্তা পেতে সামনের ঘরে শুতো। তাকে এখন শোওয়ার ঘরের মেঝেতে শোওয়ায় সে।
প্রথমবার মণীশের হৃদযন্ত্র বিনীত ভাবেই তার অক্ষমতা জ্ঞাপন করতে শুরু করেছিল বছর দুই আগে। সেবার খুব মারাত্মক হয়নি। নার্সিং হোমেও যেতে হয়নি। ব্যথাও উঠে যায়নি চৌদুনে। সেদিন সকালে অফিস যাওয়ার সময় খুব হাঁসফাস, শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা নিয়ে অফিসে যাওয়ার পোশাক সমেত বিছানায় শুয়ে পড়েছিল মণীশ। পাড়ার ডাক্তার দেখেই বলেছিল হার্ট স্পেশালিস্ট ডাকতে। বড় ডাক্তার এসে মণীশকে বিছানার বাইরে এক পাও নড়তে, সিগারেট ও স্নেহযুক্ত বা মশলাদার খাবার খেতে বারণ করেছিলেন। দিন দশেক শয্যা নিয়ে ছিল মণীশ। সিগারেট ছাড়ল, খাওয়া-দাওয়ার নিয়ন্ত্রণ মেনে নিল। সেবার তারা সবাই মণীশের অনিশ্চয়তা নিয়ে এমন দিশাহারা হয়ে যায়নি। ভেবেছিল, ঠিক হয়ে যাবে।
দশ দিনের মধ্যেই সামান্য ডিগবাজি খাওয়া হৃদযন্ত্র ফের ঠিকঠাক চলতে শুরু করে। মণীশ ফিরে আসে স্বাভাবিক কাজেকর্মে। দুবছর লম্বা সময়। মণীশের হৃদযন্ত্রের কথা আর কারও মনে থাকেনি। মণীশেরও না। রুটিনমাফিক মাঝে মাঝে ই সি জি করা হত। কোনও বেচাল পাওয়া যেত না তাতে।
