অপর্ণা হাসছিল। ভারী সুন্দর হাসিটি। একটু দুষ্টুমি মেশানো, কিন্তু সত্যিকারের হাসি। অনেকটা অনুর মতোই।
আসুন, একটা মেয়ের সঙ্গে আপনার পরিচয় করিয়ে দিই। ইউ উইল লাইক হার। এই আপা, এদিকে এসো।
রোগা, ক্ষয়া, কালো চেহারার একটি মেয়ে হাসিমুখে এগিয়ে এসে বলল, ওঁকে আমি চিনি। উনি বিখ্যাত লোক। আর আমি তো সামান্য একটা মেয়ে, দেওয়ার মতো পরিচয়ই নেই।
অপর্ণা হেসে বলে, খুব সামান্য হলে আর ভাবনা ছিল কি? বুঝলেন, এ মেয়েটি কিন্তু সাংঘাতিক।
কৃষ্ণজীবন আপার দিকে চেয়ে ছিল। তার জহুরির চোখ নেই। কিন্তু অনেক দিন বাদে সে একটি পরিষ্কার ও স্পষ্ট মেয়েকে দেখল। লাবণ্য নেই, স্বাস্থ্য নেই, কিন্তু চোখে এক গহিন গভীরতা আছে যেন।
০৪৮. দুনিয়াটা চারদিকে হাঁ-হাঁ করা খোলা
দুনিয়াটা চারদিকে হাঁ-হাঁ করা খোলা। কিন্তু কোনদিকে যাওয়া যায় সেইটে মাঝে-মাঝে ঠিক করা বড় শক্ত হয়ে ওঠে। দুনিয়ায় এমন কেউ নেই যে তাকে দেখলে খুশি হয়। সে গেলে এসো, বোসো করার লোক নেই। পালপাড়ায় শুধু বুড়োবুড়ি আছে। কিন্তু তাদের মুখে হাসি ফোঁটানোর মতোই বা কোন সুসংবাদ নিয়ে যাচ্ছে সে?
ভোরবেলা শ্বশুরমশাই শীতলাতলার মোড় অবধি এগিয়ে দিয়ে গেলেন। বটতলায় দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ কথাও হল দুজনের।
কি করবে বাবা, এবার? নিমাই বড় নীরস গলায় বলে, দেখি।
পুরুষমানুষ বসে গেলে তার আর জাত থাকে না। বসা-পুরুষের বড় কষ্ট। এই আমাকেই দেখ না। তবে বুড়ো হয়েছি বলে ক্ষ্যামা-ঘেন্না। আছে। তোমার বয়সটা তো কিছু নয়। এই বয়সে বসা হলে কষ্ট বেশি।
আজ্ঞে, সে বড় ঠিক কথা। বসে থাকতে কে চায় বলুন! কিন্তু কিছু যে হয়ে ওঠে না। বীণা দানাপানি দেয়, তাই টিকে আছি। বড় লজ্জার ব্যাপার।
বিষ্ণুপদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, তোমাকে দেওয়ার মতো বুদ্ধিও আমার নেই। দুনিয়ার হালচাল মাথায় সেঁধোয় না। নিজেই ভেবেটেবে ঠিক করে নিও। তারপর ভাগ্য।
আজ্ঞে। আমার জন্য ভাববেন না।
তোমার জন্য ভাবি না বাবা, মেয়েটার জন্য ভাবি। তার আর কোনও আড়াল রইল না। পুরুষ ছাড়া মেয়েরা হল লোভানী জিনিস। চারা গাছের চারদিকে বেড়া না থাকলে যা হয়।
আমাকে দিয়ে সেই কাজটাই কি ঠিকমতো হয় বাবা? আমি কি একটা তেমন পুরুষ?
কেন বাবা, বীণার কি চরিত্রের দোষ হয়েছে?
জিব কেটে নিমাই বলে, ছিঃ ছিঃ, বীণা সেরকম মেয়ে নয়। বলছিলাম বেড়ার কথা যা বললেন ওসব হল শক্ত-সমর্থ পুরুষের কাজ। আমার নয়।
নিজেকে অত ছোটো ভেবো না বাবা, তাতে আমার কষ্ট হয়। তোমার মুখে সুলক্ষণ আছে। কপালের ফেরে নানারকম হচ্ছে। লাগাম তো সবসময়ে মানুষের হাতে থাকে না। শুধু একটা কথা বলে দিই।
বলুন বাবা।
রাগ করে আবার আত্মঘাতী হয়ে বোসো না। দাস যতক্ষণ আশ ততক্ষণ। শেষ অবধি চেষ্টা কোবরা বাবা। কথা মনে থাকবে?
যে আজ্ঞে। মাঝে মাঝে বেঁচে থাকতে ইচ্ছে যায় না বটে। তবে কিনা শেষ অবধি ভগবানে মনটা ফেলে দিলে খানিক জুত পাই।
তাই কোরো বাবা। ভক্তরা চিরকাল কষ্ট পায়। নতুন কথা আর কি?
আসি তাহলে?
এসে গিয়ে। জবরদস্তি তোমাকে আটক করলাম না। তার কারণও একটা আছে। শুনে যাবে নাকি?
শুনেই যাই।
বীণার কাছ থেকে পৃথক হলে তোমার নিজের ওপর ভরসা আসবে। রাগ-অভিমান তখন উল্টোপথে ধেয়ে গিয়ে গো হয়ে দাঁড়াবে। যদি সেটা হয়ে ওঠে তবে মঙ্গলই হবে বাবা।
আপনার আশীর্বাদ। আসি তাহলে।
প্ৰণাম করে নিমাই অন্ধকারে পা বাড়াল। না, অন্ধকার আর ততটা ছিল না। আকাশ ম্যাদাটে আলোয় কিছু ফিকে হয়েছে। একা হয়েই নিমাইয়ের সমস্যা দেখা দিল, এখন সে কোথায় যাবে? কার কাছে?
যাওয়ার জায়গা বলতে আপাতত পালপাড়াই আছে। বুড়োবুড়ির সঙ্গে দেখাও হয় না অনেক দিন। ভাঙা হোক, ধলা। হোক, নিমাইয়ের ভদ্রাসন বলতে এই পালপাড়ার বাড়িখানাই। বাপ-মায়ের ভিটে।
স্টেশন অবধি হেঁটে গেলে ট্রেন পাওয়া যাবে। বাসও আছে। হাঁটা পথ ধরে কয়েক পা এগোনোর পরই হঠাৎ পিছুটানটা টের পেল নিমাই। বীণাপাণিও এখনও ঘুমে অচেতন। জেগে কি কাঁদবে নিমাইয়ের জন্য? না কাঁদুক, একটু কি দপাবেও না? তেমন দরের বর না হলেও এতকালের সম্পর্ক কি এমন ঠুনকো হয়ে ভেঙে যাবে?
পা ধীর হয়ে এল নিমাইয়ের। একবার ভাবল, দূর ছাই, মরুক গে আত্মসম্মান, বীণার কাছে ফিরেই যাই।
তারপর নিমাই আবার বিজ্ঞ হল। সংযম এল। না, চলে যাওয়াই ভাল। মেয়েমানুষের হাততোলা হয়ে বেঁচে থাকাকে কি বেঁচে থাকা বলা যায়? বড় অপমান হচ্ছিল তার। বড় গঞ্জনা সইতে হচ্ছিল। তার চেয়ে কষ্ট আর বেশী কী আছে?
কতবার চোখের জল মুছল নিমাই তার হিসেব নেই। কতবার বেভুল হয়ে থেমে গেল। কতবার ফিরে যাওয়ার ইচ্ছে হল। ঘর-সংসার ভেসে গেল তার। ছিড়ল সুতোর বাধন। সামনে এক দিশাহারা ভবিষ্যৎ। কে জানে কী হবে?
ক্ৰমে রোদ উঠল। চারদিক স্পষ্ট হয়ে ভেসে উঠল সোনালি আশোয়। স্টেশন দেখা যেতে লাগল।
চা খাওয়ার বাতিক নেই নিমাইয়ের। কখনও খায়, কখনও খায় না। আজ স্টেশনের চত্বরে একটা দোকানে বসে এক ভঁড় চা খেল সে। সঙ্গে দুখানা ময়দার বিস্কুট। খেয়ে বাইরের বেঞ্চে অনেকক্ষণ উদাস হয়ে বসে রইল।
এখান থেকেই বাস ধরে পালপাড়া যাওয়া যায়। অনেক বাস। নিমাই তাড়াহুড়ো করল না। পালপাড়া তার জন্য সোনার থালায় ভাত বেড়ে বসে নেই। দু মাস আগে একশটি টাকা পাঠানো হয়েছিল বুড়োবুড়ির কাছে। সে টাকা কবে উড়ে গেছে। সংসারে এখন হাঁড়ির হাল। খুব দুঃখকষ্টের মধ্যে গিয়ে পড়তে হবে তাকে। সেটা ধীরে সুস্থে হোক।
