বাঘ চকিতে একবার পিছু ফিরে কী যেন দেখে নিল। তারপর ফের কৃষ্ণজীবনের দিকে তাকাল।
কৃষ্ণজীবন চাপা স্বরে বলল, নমস্কার।
বাঘ একটা হাই তুলল মাত্র।
আপনাকে বিরক্ত করলাম। মাপ করবেন।
বাঘ চেয়ে রইল তার দিকে।
আমি আপনার একজন বন্ধু।
আবেগে, আনন্দে কৃষ্ণজীবনের গলা বন্ধ হয়ে আসছিল। সে মৃদুস্বরে বলল, আসি।
সামান্য, খুব সামান্য একটা ভু-রর শব্দ এল বাঘের গলা থেকে।
কৃষ্ণজীবন ধীরে ঘুরে গিয়ে আস্তে আস্তে হেঁটে লজে ফিরতে লাগল। একটু দূরে থেকেই সে সোরগোল শুনতে পাচ্ছিল। একটা। লজের এলাকায় ঢুকতেই দেখল, সবাই সার বেঁধে দাঁড়িয়ে। উত্তেজিত কথাবার্তা হচ্ছে।
তাকে দেখেই ছুটে এল আনোয়ার, স্যার! আপনি কোথায় গিয়েছিলেন।
কৃষ্ণজীবন একটু অবাক হয়ে বলে, কাছেই! কেন?
বাঘ বেরিয়েছে স্যার! বাঘ! শিগগির ঘরে ঢুকে যান।
কৃষ্ণজীবন স্মিত মুখে বলল, তার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে, আনোয়ার সাহেব। হি ওয়াজ এ নাইস জেন্টলম্যান।
তিন দিন বাদে গল্পটা সে দোলনকে বলছিল রাতে, তার বিছানার পাশে বসে। দোলনের ঠাণ্ডা লেগে একটু জ্বর হয়েছে। অসুখ হলেই সে বাবাকে আরও বেশি করে চায়। দুটো হাতে সে কৃষ্ণজীবনের একটা হাত শক্ত করে ধরে আছে। চোখ বড় বড়। মুখখানা হাঁ।
বাঘটা যদি তোমাকে খেয়ে ফেলত বাবা?
কৃষ্ণজীবন সামান্য উদাসভাবে বলল, ওরা মানুষখেকো বাঘ নয় বাবা।
যদি কামড়ে দিত?
কথাটা তো তখন আমার মনে হয়নি। এত সুন্দর দেখাচ্ছিল বাঘটাকে, আগুনের মতে, আলোর মতো, আমি সব ভুলে গিয়েছিলাম। কী ভদ্র, কী সহবত! আর কী সাংঘাতিক অহঙ্কার!
দোলন ভয়ার্ত গলায় বলে, আর কখনও ওরকম করো না বাবা।
কৃষ্ণজীবন একটু হেসে তার প্রিয় পুত্রটির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, বাঘ তো মানুষের করুণার পাত্র বাবা। সারা পৃথিবীতে কয়েকটাই মাত্র বেঁচে আছে। মানুষেরই দয়ায়। বাঘ-মারা বীরদের কত গল্প আছে, আমি যখন পড়ি তখন চোখে জল আসে। কেন জানো? বাঘের দাঁত, নখ আর খিদে ছাড়া আর কিছু নেই। কিন্তু মানুষের কত কী আছে। বন্দুক, বুদ্ধি, অকারণ হিংস্ৰতা।
কিন্তু বাঘ যখন মানুষ মারে বাবা?
বাঘ যত মানুষ মেরেছে, মানুষের হাতে মারা পড়েছে তার চেয়ে বহুগুণ বেশি। তুমি ভেব না বাবা, বাঘের দেখা পাওয়া এখন ভাগ্যের কথা।
খুব চিন্তিত হয়ে পড়ল দোলন। বার্বার সব কথা সে আকণ্ঠ বিশ্বাস করে। তবু খুব চিন্তিতভাবে সে বলল, বাঘটা কি তোমার বন্ধু হয়ে গেল বাবা? আবার যদি দেখা হয় কিছু করবে না তোমাকে?
চিন্তিত হল কৃষ্ণজীবনও। খানিকক্ষণ ভেবে বলল, বাঘ তত বুদ্ধিমান নয়। তার খিদেই তাকে চালায়। মানুষের নিষ্ঠুরতা তার চেয়ে ঢের বেশি।
তাহলে বাঘ কি মানুষের চেয়ে ভাল?
এ প্রশ্নের জবাব কলকাতার সাতলার ফ্ল্যাটে বসে খুঁজে পায় না কৃষ্ণজীবন। এ প্রশ্নের জবাব রয়েছে দূরের বান্ধবগড় জঙ্গলে, যেখানে এই রাতের অন্ধকারে এখন আদিম পৃথিবীর নিয়মে চলছে সব কিছু।
দোলন ঘুমিয়ে পড়লে কৃষ্ণজীবন উঠে আসে নিজের ঘরে। চুপচাপ বসে থাকে চেয়ারে। দুখানা বাঘের চোখ বহু দূর থেকে নিষ্পলক চেয়ে থাকে তার দিকে।
না, এ তার কোনও বীরত্বের গল্প নয়। বরং এ এক করুণ কাহিনী। লুপ্তপ্রায় ব্যাঘ্র-প্রজাতির একজনের সঙ্গে তারই স্বক্ষেত্রে দেখা হয়েছিল কৃষ্ণজীবনের। দুজনের মধ্যে একটু দৃষ্টি বিনিময় হয়েছিল মাত্র। তারা কেউ কাউকে আক্রমণ করেনি, এইমাত্র।
সাতদিন পর অনু নাগাল পেল তার। অনুরই জন্মদিনে, তার বাড়িতে। ইদানীং তারা কয়েকটি প্রতিবেশী পরিবার নিকটস্থ হয়েছে পরস্পরের। এর-ওপর বাড়িতে ওর বা এর নিমন্ত্ৰণ হয় প্রায়ই। অনুর বাড়িতে কৃষ্ণজীবনের আসা এই প্রথম। রিয়া আসে, ছেলেমেয়েরা আসে। সে কখনও আসেনি। অনুর বাবা নিজে নিমন্ত্রণ করে এসেছিলেন বলে আসা।
আপনি কী বলুন তো?
কৃষ্ণজীবন বাঁচাল মেয়েটির দিকে চেয়ে হেসে বলে, কী হল?
শুনলাম আপনি বাঘের মুখে পড়েছিলেন ইচ্ছে করে?
গল্পটা খুব ছড়িয়েছে দেখছি।
গল্প নাকি? এটা তো ঘটনা।
ইচ্ছে করে পড়িনি। মুখেও পড়িনি।
তাহলে?
যেমন বন্ধুর সঙ্গে পথেঘাটে দেখা হয় ঠিক তেমনিই দেখা হয়ে গিয়েছিল।
অনু গোলাকার চোখে চেয়ে বলে, বাঘের সঙ্গে দেখা হয় নাকি? ওকে দেখা-হওয়া বলে। কী পাগল আপনি!
বিয়া শুনতে পেয়ে এগিয়ে এল, কাকাবাবুকে আচ্ছা করে শাসন করে তো! সত্যিই পাগল। আমাদের কাছে তো এসব। বলেন না, দোলনের কাছে শুনে ভয়ে মরি।
রিয়া সরে যেতেই অনু মুখ ভেংচে বলে, কাকাবাবু না হাতি! আপনি আমার বন্ধু না?
তাই তো।
আমি কাকাবাবুটাবু ডাকতে পারব না কিন্তু। বন্ধু বলে ডাকব। কাকাবাবু ডাকলে কি বন্ধুত্ব হয়?
আমি অত জটিল ব্যাপার বুঝতে পারি না।
কেন পারেন না? বাঘের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে পারেন আর আমার সঙ্গে পারেন না?
কে বলে পারি না!
কেমন এড়িয়ে চলেন আমাকে।
এড়িয়ে চলি না তো?
খুব অ্যাভয়েড করেন আমাকে। এই যে মধ্যপ্রদেশে গেলেন একবারও বলেননি তো!
বলা উচিত ছিল, না?
বন্ধুকে বলতে হয়। আমি কত খোঁজ করেছি আপনার। এবার থেকে যখন যাবেন আমাকে একটু খবর দেবেন।
অপর্ণা একটা খাবার ভরা প্লেট নিয়ে এগিয়ে আসে, আমার মেয়ে আপনাকে জ্বালাচ্ছে তো খুব? ও ভীষণ টকেটিভ?
বেশ ভাল মেয়েটি আপনার।
মাথা তো শার্প, কিন্তু পড়ে না একদম।
পড়বে। এসব নিয়ে মাথা ঘামাবেন না।
আপনি এত বিদ্বান মানুষ। আমার মেয়েটা বোধহয় আপনার সঙ্গে সমানে সমানে কথা বলে! আপনি নাকি ওর বন্ধু।
