কত রাত অবধি বসে রইল কৃষ্ণজীবন তা তার নিজেরও খেয়াল ছিল না। সময় যেন এক জায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। হয়তো আড়াল থেকে বাঘের চোখ তাকে লক্ষ করে গেল, তাকে দেখে গেল ভালুক ও নীল গাই, তাকে নজর করল। রাতচরা পাখি।
যখন অবশেষে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে বিছানায় ঢুকল সে, তখন তিনটে বাজতে সামান্যই বাকি। সকালে হাতির পিঠে চড়ে এবং লানচের পর জীপ নিয়ে তাদের জঙ্গলে দু দফা ঘুরে বেড়ানোর কথা। সে সব বেড়ানোর মধ্যে শৌখিন বাবুয়ানা আছে। কৃষ্ণজীবনের ভাল লাগে পায়ে হেঁটে, একা গম্ভীর গভীর জঙ্গলে দিশাহীন ঘুরে বেড়াতে, গাছপালার মধ্যে নিথর হয়ে চুপ করে বসে থাকতে।
সকালে ব্রেকফাস্টের পরই শর্মা এবং স্বামী হাতির পিঠে চড়ে বাঘ দেখার জন্য কিছু উদ্বেল হলেন। পটেলের হ্যাংওভার, সম্ভবত প্ৰেশারটাও বেড়েছে। সুতরাং যাবেন না।
হাতির পিঠে যখন কাঠের মস্ত তক্তা পাতা হয়েছে এবং রওনা দেওয়ার তোড়জোড় চলছে ঠিক সেই সময়ে লোকটা এল। সাধারণ গ্রামবাসীর মতোই চেহারা। কোনও বৈশিষ্ট্য নেই। হেঁটো ধুতি, গায়ে মোটা আধময়লা সাদা একটা জামা, তার ওপর সুদির চাঁদর, পায়ে রবারের চটি। হাতের ব্যাগে কিছু কতবেল।
আনোয়ার তাকে ধরে এনে মান্য অতিথিদের সামনে দাঁড় করাল।
এই সেই লোক স্যার কেল্লায় থাকে।
লোকটাকে সবাই দেখল, বিশেষ গুরুত্ব দিল না। দু-চারটে মামুলি প্রশ্ন করে ছেড়ে দিল।
কৃষ্ণজীবন তাকে কাছে ডেকে জিজ্ঞেস করল, কেল্লাটা কেমন?
লোকটা কম কথার মানুষ। হয়তো বা লাজুক বা কথা ভালবাসে না। সামান্য মাথা নেড়ে বলল, ভালই।
দেখতে যাওয়া যায়?
অনেকেই যায়।
আপনি ওখানে একা থাকেন কেন?
এমনিই।
একা থাকতে ভালবাসেন?
হ্যাঁ।
কিরকম লাগে?
ভাল।
গাছপালা ভালবাসেন?
হ্যাঁ। নির্জনতা ভাল লাগে?
হ্যাঁ।
আমি যদি কেল্লায় যেতে চাই তাহলে নিয়ে যাবেন?
আপনাদের হাতি আছে, নিয়ে যাবে।
কৃষ্ণজীবন লোকটাকে দেখে খানিকটা হতাশই হল। এ ঠিক প্রাকৃত বিভূতিভূষণ নয়। হয়তো দুজ্জাল বউয়ের ভয়ে পালিয়ে থাকে।
ভূতে বিশ্বাস করেন?
কেন করব না?
ভূত দেখতে পান?
না।
লোকে বলে জিন আর পরীরা আপনাকে খাবার দিয়ে যায়।
না।
এ লোকের সঙ্গে কথা বলে কোনও উন্মােচন ঘটানো যাবে না। কৃষ্ণজীবন তাই ক্ষান্ত হল। জঙ্গলে নির্জন কেল্লায় দীর্ঘকাল একা বসবাস করে। এর মধ্যে কোন কিছুর সঞ্চার হয়নি। লোকটা যেমন ভোঁতা ও কল্পনাহীন ছিল তেমনই রয়ে গেছে। বোকা মানুষেরা ওকে নিয়ে কিংবদন্তী বানিয়ে চলেছে। তবে হয়তো অরণ্যর কাছ থেকে ও একটা জিনিস শিখেছে। সেটা হল নিচুপ থাকা, কথা কম বলা।
কতবেল কেউ কিনল না, লোকটা একটু দাঁড়িয়ে থেকে গায়ের দিকে চলে গেল।
হেলেঙ্গুলে সকালটা কাটল হাতির পিঠে। অজস্র প্রাচীন গুহা, সম্বর, নীল গাই, বহু পুরোনো এক শায়িত বিষ্ণুমূর্তির ওপর দিয়ে নেমে আসা ঝরনা ইত্যাদি দেখা হল বটে, কিন্তু যাকে দেখতে আসা সেই বাঘের দেখা পাওয়া গেল না কোথাও। বাঘ ছাড়াও যে জঙ্গলে আরও অনেক কিছু দেখার আছে সেটা বুঝতে চাইলেন না শৰ্মা বা ডঃ স্বামী। একটু খুঁতখুঁত করছিলেন, ছাব্বিশটা বাঘের একটারও তো দেখা মিলবে।
তবে কিল পাওয়া গেল। হরিণের সদ্যভুক্ত দেহাবশেষ। এক জায়গায় বাঘের পদচিহ্নেও হদিশ মিলল। কিন্তু বাঘ নয়।
দুপুরে লানচের পর আর এক দফা বেরোনো হল। কিন্তু বাঘহীন ভ্ৰমণই সার হল শুধু। বেলা পড়বার আগেই খানিকটা ক্লান্ত হয়ে ফিরে এল তারা।
গাইডেড সরকারি ভ্রমণ শেষ হয়েছে। কাল সকালে তারা ফিরে যাবে। কৃষ্ণজীবন চায়ের টেবিলে বসল বটে, কিন্তু মনটা বড় চনমন করছিল তার। এভাবে নয়, এই অরণ্যকে অন্তত কিছুক্ষণের জন্যও তার একা পাওয়া দরকার।
ক্লান্ত বিশেষজ্ঞরা ঘরে গেছেন। আনোয়ারকেও দেখা যাচ্ছে না কোথাও। শুধু বেয়ারা দুজন বিষণ্ণ গম্ভীর মুখে টেবিল পরিষ্কার করছে। এই সুযোগ।
কৃষ্ণজীবন উঠল এবং পায়ে পায়ে লজের সীমানা ডিঙিয়ে চলে এল মুক্ত জঙ্গলের ভিতরে। জীপ-রাস্তাটি সযত্নে এড়িয়ে সে ঘাসজঙ্গলের ভিতরে ঢুকে গেল একা। শেষবেলার রঙিন আলোয় কী অপার্থিব যে দেখাচ্ছে চারদিক!
সে শব্দ করছিল না। শব্দ করছিল বিচিত্র পাখিরা। শব্দ করছিল দূরবর্তী নীল গাই। হরিণের পায়ের দ্রুত শব্দ।
একটা মস্ত গাছের বেড় পেরিয়ে পাথরের চাতাল। উচ্চাবচ একটা জায়গা। ক্ষয়া পাথরের একটা প্রাকৃতিক স্থাপত্য। যাকে সারাদিন এত মাথার ঘাম পায়ে ফেলে খোজা হল তার দেখা যে এত অপ্রত্যাশিত পাওয়া যাবে কে জানত?
সামনেই খোলা চাতালের ওপর নিজের বর্ণের আগুনে যেন দাউ দাউ করে জ্বলছিল বাঘ। পায়ের তলায় সদ্য শিকারকরা হরিণ। বোধহয় তখনও হরিণের হৃৎপিণ্ড ধকধক করছিল। বিশাল বাঘটা অবহেলায় একখানা পাহরিণের ওপর রেখে দাঁড়িয়ে আছে। হয়তো দম নিচ্ছে। ভঙ্গিটা তাচ্ছিল্যের। অবজ্ঞারে সে একবার কৃষ্ণজীবনের দিকে তাকাল।
চোখে চোখ। কৃষ্ণজীবন চোখ ফেরাতেই পারল না। বিস্ময়ে মুগ্ধতায় চেয়ে রইল।
পালানোর কথা বা লুকিয়ে পড়ার কথা মনেই হল না কৃষ্ণজীবনের। সে শুধু অরণ্যের পটভূমিতে স্বাধীন ও স্বেচ্ছাচারী রাজাকে দেখছিল। রাজা জ্বলে যাচ্ছে নিজের দাউদাউ গাত্রবর্ণে। শেষবেলার পড়ন্ত আলো যেন তাকে ঘিরে নেচে উঠছে। উল্লাসে।
কৃষ্ণজীবনও আরও কয়েক পা এগিয়ে গেল। মাত্র পনেরো বিশ ফুটের তফাতে বাঘ দাঁড়িয়ে। কৃষ্ণজীবনের কোনও আড়াল নেই, অস্ত্র নেই। কৃষ্ণজীবন পালাচ্ছেও না। চোখ অবধি সরাল না।
