জব্বলপুরে সরকার আয়োজিত সেমিনারটি ছিল পৃথিবী জুড়ে এরকম হাজার হাজার নিষ্কর্মা সেমিনারের একটি। আলোচনা হয়, কাজের কাজ কিছুই হয় না। যাতায়াত ভাড়া, ফি বাবাদ কিছু টাকা আর ফাউয়ের মধ্যে একটু দেশভ্ৰমণ। কৃষ্ণজীবন এসব সেমিনারে যাওয়া একদিন ছেড়ে দেবে। আপাতত ছাড়েনি। কারণ সেমিনারগুলি কেন অসাড় ও নিষ্ফলা সেটাও তার ভালভাবে জানা দরকার। মাঝবয়েসী বা বৃদ্ধ, সফল ও সুখী, প্রতিষ্ঠিত ও পরিবার-বৎসল বুদ্ধিজীবীদের দিয়ে যে আর নতুন দিগন্তের তালা খোলা যাবে না সেটা সে যেমন বোঝে তেমন কি বোঝে সরকার বা প্রশাসন? এঁদের মাথা আছে কিন্তু দেশ বা পৃথিবীর জন্য তেমন মাথাব্যথা নেই। কিছু সুখসুবিধা ও প্রতিষ্ঠার মধ্যে এঁরা গুটি পাকিয়ে থাকতে চান। ডানা মেলতে চান না আর। বুঝে গেছেন, আর করার কিছু নেই।
বিকেলে তারা বাবগড় পৌঁছেছেন সরকারি বদান্যতায়। সেমিনারের পর ফাউ হিসেবে জঙ্গলে একটু বিশ্ৰাম। জব্বলপুর থেকে রাস্তা বড় কম নয়। স্বামী চেয়েছিলেন খাজুরাহো যেতে। সেটা মনপুত ছিল শর্মারও। তিনি একটু এরোটিকার ভক্ত। শুধু কৃষ্ণজীবন চেয়েছিল জঙ্গল। পটেল তাকে সমর্থন করেছিলেন বটে, কিন্তু লজটি দেখে তাঁর বিশেষ ভাল লাগছে না।
অথচ ভাল না লাগার কারণ নেই। সরকারি লজের সব ব্যবস্থাই এখানে রয়েছে। লাগোয়া বাথরুম, গরম-ঠাণ্ডা জল, রুম হিটার। এসব না হলেও কৃষ্ণজীবনের চলত।
কৃষ্ণজীবন যখন তার ঘরে পোশাক পাল্টে পায়জামার পর পাঞ্জাবি চড়িয়ে আলোয়ান জড়াচ্ছিল তখনই সরকারী অফিসার আনোয়ার বিনীতভাবে এসে দাঁড়াল দরজায়।
স্যার, একজনকে মীট করবেন?
কে বলুন তো?
লোকটা রাজবাড়িতে থাকে। পঁচিশ মাইল সারকামফারেন্সে জনমনিষ্যি নেই। রাজবাড়ি, এখন ভূতের বাড়ি।
বিস্মিত কৃষ্ণজীবন বলে, থাকে কেন? তান্ত্রিক নাকি?
না স্যার, ঠিক তান্ত্রিক নয়। তবে পুরোহিত। পরিত্যক্ত রাজবাড়িতে একটা বিগ্রহ আছে, তার পুজো করে রোজ। চল্লিশ টাকার মতো পায় মাসকাবারে। ব্যস, ওই জন্যই থাকে।
মাত্র ওই কটা টাকার জন্য?
সেইটাই তো আশ্চর্যের। বউ বাচ্চা সব গাঁয়ে থাকে, বিশ পঁচিশ মাইল দূরে। জঙ্গলের মধ্যে পাহাড়ের ওপর কেল্লায় লোকটা একা থাকে। লোকে বলে জিন পরীরা ওকে খাওয়ায়।
লোকটা বেশ সাহসী বলতে হবে। তার সঙ্গে দেখা করা যায়?
নিশ্চয়ই। রোজই আসে এদিকে। কালকেই দেখতে পাবেন সকালবেলায়।
বাঘের জঙ্গলের ভিতর দিয়ে হেঁটে আসে রোজ?
আজ্ঞে হ্যাঁ। হাতে লাঠিও থাকে না।
সাবাস!
সাধুবাদটা তার মুখ দিয়ে আপনা থেকেই বেরিয়ে এল। যে মানুষ জঙ্গল, শ্বাপদ, একাকিত্ব ও নির্জনতাকে ভয় পায় না তেমন মানুষকে তার খুব পছন্দ।
লোকটা কি খুব গরিব?
খুব। জঙ্গল থেকে আতা, বেল এইসব ফল-টল তুলে এনে বিক্রি করে। এখানে টুরিস্ট লজে যারা আসে তারাই কখনও কখনও কেনে। গায়ের লোক তো পয়সা দিয়ে ফল কেনে না।
লোকটার কেমন করে চলে তা আর জিজ্ঞেস করল না কৃষ্ণজীবন। এ দেশের কোটি কোটি গরিবের কী করে চলে সে রহস্য ভেদ করতে কে পারবে? কেউ জানে না।
সন্ধের পর লজের ম্যানেজার সম্মানিত অতিথিদের জন্য ছোট্ট একটা ককটেলের আয়োজন করলেন লজের রিসেপশনে। কৃষ্ণজীবন জীবনে কখনও মদ খায়নি। সে একটা সফট ড্রিঙ্ক নিয়ে বসে রইল। সর্বদাই তার বিচরণ চিন্তার। রাজ্যে। বাস্তবতার মধ্যে সে কমই থাকে। তার সামনে আস্তে আস্তে চারজন মানুষ নরমাল থেকে হাই হয়ে যেতে লাগল। মদ খাওয়া মানে যেন বেলুনে চড়ে কিছুক্ষণের গগনবিহার। স্বাভাবিকতা থেকে কিছুক্ষণের ছুটি। অনেক পয়সা খরচ করে এই ছুটিটুকু কিনতে হয় মানুষকে। আবহমানকাল ধরে গরিব-দুঃখী থেকে রাজা-গজা অবধি এই জিনিসের নেশা করে আসছে। সস্তা বা দামী—যে যেমন পারে। সুরার বন্দনা কিছু কম হয়নি পৃথিবীতে। কিন্তু কেন, সেই কারণটা কৃষ্ণজীবন আজও খুঁজে পায়নি।
পটেল একটু বেশিই মাতাল হয়ে গেলে। বোধহয় ইচ্ছে করেই। মদ খেতে খেতেই বলছিলেন, আমার ভীষণ ভূতের ভয়। আমার ঘরে আর কাউকে শুতে হবে রাতে।
কিন্তু পটেল এতই মাতাল হয়ে পড়লেন যে, ভূতের ভয় গৌণ হয়ে গেল। তাকে ধরাধরি করে নিয়ে শুইয়ে দেওয়া হল ঘরে।
এই নির্জন অরণ্যাবাসে নিশুত রাত্তির হয়ে গেল সন্ধের কিছু পরেই। ডিনারের পর যখন যে যার শশাওয়ার ঘরে দিয়ে দরজা দিলেন তখনও নটা বাজতে দুএক মিনিট বাকি।
হেমন্তের শেষ। যথেষ্টই শীত পড়েছে এখানে। একটু রাতের দিকে যখন চাঁদ উঠল তখন বাইরের ফ্লাড লাইটটা নিবিয়ে দিয়ে কৃষ্ণজীবন একটি বেতের চেয়ার বাইরে টেনে এনে বসল। অল্প কুয়াশায় মাখা কী বন্য ভয়ংকর জ্যোৎস্না! জঙ্গলে নীল গাইয়ের ডাক, পাখির ডাক, হরিণের গলা খাঁকারি শোনা যাচ্ছে। শোনা যাচ্ছে পাতায় পাতায় শিশির পড়ার শব্দ! চারদিককার গাছপালা যেন কৃষ্ণজীবনকে একা দেখে একটু ঘন হয়ে সরে এল কাছাকাছি। যেন কৃষ্ণজীবনের কাছে তারা কিছু শুনতে চায়।
এইসব রাতের সৌন্দর্য দেখে গড়পড়তা বাঙালি রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে ওঠে বা আহা উঁহু করে চাঁদের নানাবিধ প্ৰশংসা করে। কবিতাও মনে পড়ে কারও কারও। সৌন্দর্য ওভাবেও দেখা যায়। কিন্তু অরণ্যের জ্যোৎস্না বা অন্ধকার, গ্ৰীষ্ম বা শীত বরাবর অন্যভাবে মূক করে দেয় কৃষ্ণজীবনকে। সে যেন হাজার হাজার বছর পিছিয়ে চলে যায় মানুষের আদিম আরণ্যক একাকিত্বে। চারদিকে সভ্যতার নানা নির্মাণ মিথ্যে হয়ে যায়। মুগ্ধ, সমোহিত, ভূগ্রস্ত কৃষ্ণজীবন তার অধীত সব বিদ্যা বিস্মৃত হয়। ভাষা অবধি ভুলে যায়, তার মন মাথা সব কিছু হয়ে যায় মূক ও বধির। না, কৃষ্ণজীবনের ভয় করে না। একটুও ভয় করে না। জঙ্গলের অনেক গভীরে পাহাড়ের ওপরকার পরিত্যক্ত কেল্লায় যে লোকটা একা থাকে কৃষ্ণজীবন তার চেয়ে কিছুমাত্র কম সাহসী নয়।
