এ কথার জবাব হয় না। জবাব দেওয়ার মতো অবস্থাও নয় নিমাইয়ের। সে কাঁদছে। বিষ্ণুপদ একটা হাত বাড়াল তার দিকে। কাঁপা-কঁপা দুর্বল হাত। ছোঁওয়ার চেষ্টা করল তাকে। নাগাল পেল না। হাতটা ফের সরিয়ে নিল বিষ্ণুপদ।
নিমাইয়ের কান্না থামল হেঁচকি উঠে যাওয়ার পর। নিজেকে বড় ঘেন্না হতে থাকে নিমাইয়ের। সে বড় দুর্বল। তার মনের কিছুমাত্র জোর নেই। বীণাপাণি কি সাধে তাকে ম্যাদাটে পুরুষ বলে হ্যাটা করে? করাই উচিত।
বিষ্ণুপদ গলা খাঁকারি দিল খুব সন্তৰ্পণে। তারপর বলল, একটু জল খাবে বাবা?
আজ্ঞে না।
তোমার জন্য আমার যদি কিছু করার থাকত তো করতাম। কিন্তু আমি এখন দুনিয়ার বার। কিছু করতে পারি না, হাত পা কোলে নিয়ে বসে বসে দেখি। চোখের সামনে কত কী হয়ে যায়। আগে মনে হত এটা ভাল হল না, ওটা ঠিক হল না। আজকাল ভাবি, বিচার করার আমি কে? আমার কি অত জ্ঞান বা বুদ্ধি আছে? দুনিয়াটা কি আমি চিনি? লোকে যা করছে করুক। ভাল মন্দ তারা বুঝবে।
নিমাই কান্নার পর অবসাদ নিয়ে বসে আছে। শ্বশুরমশাইকে তার কোনওদিন খারাপ লাগে না। একটু আলগা মানুষ, কিন্তু বড় মিঠে মোলায়েম। কোনও উগ্রতা নেই। পৃথিবীতে চারদিকে বড় শক্ত শক্ত মানুষ। যেন তাদের কাঁটাওলা গা, জিবে দাঁতে ধার, চোখে যেন খুনির দৃষ্টি।
মাঝরাত্তিরে কোথায় যাচ্ছিলে বাবা?
আজ্ঞে, রওনা দিচ্ছিলাম।
এই মাঝরাতের অন্ধকারে?
মাঝরাতেই ভাল সবাই জেগে গেলে নানা কথা উঠবে, জিজ্ঞাসাবাদ হবে, বাধা পড়বে।
তা ঠিক। তবে এখনও রাত মেলা আছে। একটু বসে যাও।
শ্বশুরমশাইয়ের দিকে চেয়ে দেখল নিমাই। অন্ধকারের মধ্যে কালো একটা অবয়ব মাত্র। মুখের ভাব তো বোঝা যায় না। লোকটার খুব মায়া আছে তার প্রতি। নিমাই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ঠিক আছে।
বিষ্ণুপদ আর একটু ঝিম মেরে থেকে বলে, বীণা বনগাঁয়ে থাকতে চায় না কেন বলো তো? সে কি ওই জিনিসটার জন্যই?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
ওখানে কি ওর অনেক শত্ৰু?
কে জানে! ও ভয় পাচ্ছে।
তুমি পাও না?
না আজ্ঞে। আমার আর ভয় কিসের? পরের ধন নিয়ে তো বসে থাকিনি।
বীণার ভয় থাকলে তোমারও হয়তো আছে।
আজ্ঞে সেরকম ভয়ের কিছু আছে বলে তো মনে হয় না। আজকালকে কি না করছে বলুন। চুরিধারি, খুনখারাপি সব করেই দিব্যি বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কে কার বিচার করবে?
তা বটে।
তাই বলছি, সেদিক দিয়ে দেখতে গেলে বীণারও ভয় নেই। তবু যদি ভয় খায় তো কিছু করার নেই।
তোমাকে কি বীণা ত্যাগ দিয়েছে?
নিমাই লজ্জিত হয়ে বলে, একরকম তাই।
কি জন্য?
ও ভাবছে ওর টাকার বাডিলের কথা আমি চাউর করে দেব। দুর্বল মানুষ, আমার পেটে কথা থাকে না। তাই।
এ বড় অদ্ভুত কথা!
নিমাই চুপ করে থাকে।
বিষ্ণুপদ বলে, কত টাকা হবে? লাখো লাখো নয়তো!
আজ্ঞে আমি জানি না। বিলিতি টাকা, হিসেব বড় খটোমটো। তবে মনে হয় বেশ মোটা টাকাই হবে। কথাটা বলে ফেললাম, হয়তো বীণা শুনলে রাগ করবে। তা করুক, আপনাকে জানানো উচিত বলে মনে হল।
বিষ্ণুপদ একটু চুপ করে থেকে বলে, আমারও একটা আন্দাজ ছিল। তুমি কিছু গুহ্য কথা ফাঁস করোনি। কেউ গতি রেখেছিল।
যে আজ্ঞে। সে খুন হয়েছে। ওয়ারিশান নেই। ওই টাকার জন্য পরে আরও খুনখারাপি হয়। অনেক কাণ্ড।
টাকার জন্য তোমাকে ছাড়ছে বীণা!
যে আজ্ঞে। আমিও আর পেরে উঠছি না। মনটা বড় ভার হয়ে আছে।
বিষ্ণুপদ হঠাৎ টটা একটু জ্বালল। তারপর নিরাসক্ত গলায় বলে, চলল, তোমাকে এগিয়ে নিয়ে আমি একটু।
এগিয়ে দেবেন। বলে অবাক হয়ে নিমাই অবয়বটার দিকে চায়।
এগিয়ে দিই। পথটা অন্ধকার, তুমি হয়তো খুঁজে পাবে না। চলো।
নিমাই উঠে পড়ে। বলে, আপনাকে যেতে হবে না। আমি পারব।
তুমি বুঝবে না বাবা। বীণার জীবনে তোমাকে তো আমিই এনেছিলাম। আজ ফের তোমাকে বিদায় দেওয়াও আমার একটা কর্তব্য। বোধন করলাম আর বিসর্জন দেবো না? চলো।
চোখে জল এল নিমাইয়ের। নিচু হয়ে সে হঠাৎ একটা প্রণাম করল বিষ্ণুপদকে। তারপর বলল, চলুন তাহলে।
ম্লান টর্চের আলোয় কুয়াশা আর অন্ধকারে একটা অনির্দিষ্ট পথরেখা ধরে দুজনে পাশাপাশি এগোতে লাগল। মন্থর পা। মুখে কথা নেই।
০৪৭. প্রফেসর শর্মা
প্রফেসর শর্মা তার কটেজের পলকা দরজাটা বারকয়েক টেনে এবং ঠেলে দেখে নিয়ে কৃষ্ণজীবনের দিকে চেয়ে বললেন, ইউ থিংক ইট ইজ সেফ?
কৃষ্ণজীবন মৃদু হেসেছিল। জবাবে বলেছিল, বাইরে একটা ফ্লাডলাইট সারা রাত জ্বলে। বন্যজরা আসে না আলো দেখলে।
শর্মা সন্তুষ্ট হননি। ভ্রূ কুঁচকেই ছিল।
এখানকার জঙ্গলমুখী নিরালা কটেজ মোটেই খুশি করেনি ডঃ পটেলকেও। লনে পাতা বেতের চেয়ারে বসে পাইপ টানতে টানতে বললেন, ইট সিমস্ এ হন্টেড প্লেস। ইট গিভ মি শিভারস্।
ডঃ স্বামী ধার্মিক বিজ্ঞানী। তিনি কোনও মন্তব্য করেননি। কিন্তু এই প্রাচীন নির্জন জঙ্গলের মাঝমধ্যিখানে তৈরি হোয়াইট টাইগার লজকে তারও বিশেষ পছন্দ হচ্ছিল না। তিনি বিরক্তিমাখা মুখে পায়চারি করছিলেন বনে।
মধ্যপ্রদেশ সরকারের যে-টুরিস্ট অফিসারটি তাঁদের সঙ্গে এসেছেন, তিনি কৃষ্ণজীবনকে একবার গাড়ির মধ্যেই বলেছিলেন, টোয়েন্টি সিক্স টাইগারস-ইয়েস, বাট নো ম্যান-ইটারস্।
জঙ্গলের নিবিড়তা আর নির্জনতা মুগ্ধ করেছে শুধু কৃষ্ণজীবনকেই। লোকালয় ছাড়িয়ে অনেকটা ভিতরে ঢুকে তবে এই লজ। ছড়ানো ছিটোনো ডিটাচড় এক একটি কটেজ। পিঠোপিঠি দুটি করে ঘর। কৃষ্ণজীবনের ভাগ্যে জুটেছে সবচেয়ে দূরবর্তী ঘরখানা। মুখোমুখি জঙ্গল। তাতে সে খুব খুশি। যদিও সরকারি অফিসারটি তাকে চুপি চুপি বলেছিল যে বান্ধবগড় জঙ্গলের বাঘেরা প্রায়ই লজের ভিতর দিয়ে যাতায়াত করে।
