যে আজ্ঞে। কথাটা মনে থাকবে।
তোমাকে আমি বীণার জন্য বেছেছিলাম কেন জানো?
নিমাই লজ্জা পেয়ে বলে, জানি।
বিষ্ণুপদ নিবিড় গলায় বলে, তোমার মুখে চোখে একটা কিছু ছিল। কত ভুল দেখি আমরা, ভুল বুঝি। তবু মনে হয়েছিল, নিমাইয়ের মধ্যে ভক্তি আছে। গরিব হোক কি যাই হোক, ভক্তিতো কম কথা নয়।
আমাকে আর লজ্জায় ফেলবেন না। ওসব শুনলেও পাপ হয়। এ যুগে ভক্তির কীই বা দাম বলুন।
বিষ্ণুপদ মাথা নেড়ে বলে, দাম নেই। ভক্তি বিশ্বাস সব তামাদি টাকা। চলে না। তা আমার দেখবার চোখটিও যে পুরনো, সেও তামাদি। এ যুগের চশমা ধার পেলে অন্যভাবে দেখার চেষ্টা করতাম।
নিমাই বিনীতভাবে চুপ করে থাকে।
বিষ্ণুপদ বলে, গরিব মানুষ আমরা, বরাবর হা-ভাত জো-ভাত করে কেটেছে। তার ওপর ভিটেমাটি ছেড়ে এই ভিনদেশে এসে হাউড়ে পড়ে আরও খারাপ হল হল। আমার ছেলেমেয়েরা সব দতে কুটো দিয়ে বড় হয়েছে। কষ্ট করারই ধাত। তাই ভেবেছিলাম গরিবঘরে মেয়ে গেলে আর নতুন কষ্ট কিসের? পয়মন্ত হলে, ধার্মিক লোকের ঘর করলে ভালই থাকবে।
যে আজ্ঞে।
এখন দেখছি গোটা অঙ্কটাই ভুল হয়েছিল। কিন্তু এ অঙ্ক তো আর ফিরে কষা যায় না। দেখছি, তোমরা ভাল নেই। কেন নেই বাবা?
নিমাই গলাটা একটু সাফ করার চেষ্টা করে। কিন্তু ফের তার চোখ ভরে জল এসেছে। গলায় আটকে আছে শুকনো ভাতের ডেলার মতো কান্নার গিট। তার সময় লাগল।
আজ্ঞে, দোষটা তো আপনারও, আমারও। বীণা বোধ হয় আরও একটু ভাল পাত্ৰ চেয়েছিল। আমাকে বাছা আপনার ঠিক হয়নি।
সে সবই তো ভাবি বাবা। ঠিক বেঠিক মিলেমিশে এমন গোলমালে ফেলে দেয়। বীণা আমার কাছে কী একটা গচ্ছিত রাখতে চায়, সেও বলে না কী, তুমিও কবুল করো না। মনে হয়, জিনিসটা খুব সাদা জিনিস নয়। একটু ভয়-ভীতির ব্যাপারও আছে।
আজ্ঞে আছে।
বিষ্ণুপদ একটু চুপ করে থেকে বলে, সেই জন্যই তোমাদের আসা?
বীণা জানে।
আমি জিনিসটা রাখব না বাবা। তোমার ভয় নেই। তোমার মুখ দেখেই বুঝেছি, জিনিসটা ধর্মের জিনিস নয়। হক্কেরও নয়।
আপনি বড় জ্ঞানী মানুষ।
বিষ্ণুপদ একটু হাসল, তোমার শাশুড়ি ঠাকরুণেরও তাই বিশ্বাস। আমি নাকি একটা জ্ঞানী। কী যে সব বলো তোমরা মাথামুণ্ডু!
বই-পড়া জ্ঞানের কথা বলিনি আজ্ঞে। কাণ্ডকাণ্ডজ্ঞানের কথা বলছিলাম।
তাহলে ধরেছি ঠিক?
যে আজ্ঞে।
বড় শীত করছে আমার। তুমি বরং একটু মুড়িসুড়ি দিয়ে বোসো। এ সময়টা বড্ড ঠাণ্ডা লেগে যায়। তোমার বুকটাতো আবার কমজোরি।
ঠাণ্ডা লাগছে না তেমন। ঠিক আছে।
তোমরা থাকবে কদিন?
নিমাই ঘাড় হেঁট করল। মিনমিন করে বলল, বীণা বোধ হয় কয়েক দিন থাকবে।
তুমি?
আমি সকালেই যাচ্ছি।
কাজকর্ম যখন নেই, তখন যাবেই বা কোথায়?
ছোটখাটো কাজের আশা আছে। বসে থাকলে চলবে না।
বীণা কি তোমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে?
তটস্থ হয়ে নিমাই বলে, আজ্ঞে না তো? ও কথা কেন বললেন?
বিষ্ণুপদ ফের একটা দীর্ঘশ্বাস মোচন করে বলে, বউ যখন রোজগার করে তখন তার দারোগার মেজাজ হয়।
নিমাই ফের মিনমিন করে বলে, সেরকম কিছু নয়।
বিষ্ণুপদ একটু হেসে বলে, কেন দাবোগার মতো মেজাজ হয় জানো?
আজ্ঞে না।
মেয়েদের তো রোজগার করার কথা নয়। করেওনি কোনওদিন। হঠাৎ আজকাল তাদের আয় হতে শুরু করেছে। তাই বড় দেয়া হয়।
নিমাই শুকনো একটু হাসল। কিছু বলল না।
বিষ্ণুপদ খুব দূরের গলায় বলে, তার ওপর যাত্রাপার্টি। সে বড় খারাপ জিনিস। অন্য সব ধরছি না। ওই যে ক্ল্যাপ পায়, আলো-বাজনা, হাজার জনের চোখের সামনে নিজেকে জাহির করা, ওর একটা অহংকার আছে। বড্ড দেমাক হয়। তখন মাটিতে পা পড়তে চায় না, মানুষকে মানুষ বলে মনে করতে ইচ্ছে হয় না। যাত্ৰা তো একটা মিথ্যে মায়ার জগৎ।
যে আজ্ঞে।
বীণাপাণি নিজেও কষ্ট পাবে। তোমাকেও দেবে।
নিমাই আবার চুপ। বুকের মধ্যে কান্নাটা ধাক্কা দিচ্ছে, উথলে আসতে চাইছে বমির মতো।
শোনো বাবা, আমি চোখে ভাল দেখতে পাই না। কিন্তু কানে ভালই শুনি।
নিমাই শঙ্কিত হয়ে পড়ল। কথাটার মানে কি? কী শুনেছেন উনি? বিষ্ণুপদ মৃদুস্বরে বলে, যখন দরজা খুলে তুমি বেরোচ্ছিলে তখন আমি একটা কান্নার মতো শব্দ শুনেছিলাম। ভুল নয় তো! নিমাই চুপ করে থাকে।
বিষ্ণুপদ অনেকক্ষণ কিছু বলল না। ঝুম হয়ে বসে রইল। তারপর বলল, কান্না জিনিসটা পুরুষ মানুষের বড় সহজে আসে না বাবা।
নিমাই বুড়ো মানুষটির দিকে অন্ধকারে জলভরা চোখে চেয়ে রইল। তারপর কাঁপা গলায় বলল, বীণার সঙ্গে আমার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল বাবা। আমি যাচ্ছি।
বিষ্ণুপদ একটু নড়ল। জলচৌকিতে অসমান পায়ায় একটা শব্দ হল, ঢক। বিষ্ণুপদ র্যাপার জড়ানো মাথাটা নেড়ে বলে, বুঝেছি বাবা। ছেড়ে যাচ্ছে, কিন্তু দিয়ে যাচ্ছো কাকে?
সে তো জানি না। বীণা বুঝবে। ও কি বোঝে? বুঝলে আর কথা ছিল কি? আমার বড় অপমান হচ্ছে। বীণা চাইছে না।
বিষ্ণুপদ আবার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, আমার নৌকো তো ঘাট ছাড়ার মুখে। ভাল মন্দ কিছু বুঝে উঠতে পারলাম না। তবে বলি, তুমি বড় সচ্চরিত্রের ছেলে। সৎ থাকা বড় কঠিন।
নিমাই দুহাতে মুখ ঢেকেছে। চোখ ভেসে যাচ্ছে জলে। অবরুদ্ধ ফোপানি উঠে আসছে গলায়। কুকুরটা হঠাৎ এ সময়ে খেকিয়ে উঠল দুবার।
দুনিয়া তার নিজের নিয়মে চলবে। কত লোক কত কী করে বেড়াচ্ছে। কে কার কড়ি ধারে? আমি কি পারি দুনিয়ার সব কিছু নিজের মতো ঘটিয়ে তুলতে? আমি তা করার কে?
