মাঝ-উঠোনে দাঁড়িয়ে নিমাই দিক ঠাহর করার চেষ্টা করছে। আগু-পিছু, বা-ডান সব সমান। কোন দিকে গেলে পথে পড়া যাবে বুঝতে পারছে না।
একটা ক্ষীণ ম্যাদাটে আলো হঠাৎ এসে নিমাইকে চমকে দিয়ে তার পায়ের ওপর লুটিয়ে পড়ল। ব্যাটারি ক্ষীণ, তবু একটু আলো তো! কুয়াশা ছুঁড়ে আসতে খুব কষ্ট হয়েছে আলোটার। নির্জীব হয়ে পড়েছে এইটুকু ধকলেই।
খুব চাপা একটা গলা শোনা গেল, কে?
শ্বশুরমশাই। নিমাই একবার ভাবল, জবাব না দিয়ে চলে যাবে। আবার গুরুজন বলে অবহেলাও করতে পারল না।
ক্ষীণ গলায় বলল, আমি নিমাই।
অ। পেচ্ছাপ করবে নাকি? ওই বাঁ দিকে কচুবনের দিকে গিয়ে সেরে এসো।
আজ্ঞে, ঘুম আসছিল না বলে এই একটু বেরিয়েছি।
বাতি নিয়ে বেরোতে হয়। ঘরে লন্ঠন রাখেনি?
আজ্ঞে আছে।
ঘুম আসছে না কেন?
বায়ুটা চড়েছে বোধ হয়।
এ সময়টায় হিম পড়ে। এসো, বারান্দায় উঠে এসো।
নিমাই ইতস্তত করল একটু। বসাটা ঠিক হবে কি? বেরোনোর মুখে এ একটা বাধাই পড়ল কি?
কিন্তু বুড়ো মানুষটাকে এড়িয়ে যায়ই বা কি করে নিমাই? বরং একটু বসেই যাবে সে। রাতটা একটু পাতলা হোক।
নিমাই নিঃশব্দে বারান্দায় উঠলে বিষ্ণুপদ টৰ্চটা জ্বেলে একটা মোড়া দেখিয়ে দিয়ে বলল, বোসো বাবা।
আপনি ঘুমোননি?
বুড়ো বয়সের ঘুমের কোনও ঠিক নেই। একদিন পেপ্পায় ঘুম হল, তো আর একদিন একেবারেই হল না।
চারদিকে অন্ধকারে সাদা কুয়াশা। যেন দুধসাগরে ড়ুব দিয়ে আছে সব কিছু। নিমাই চুপ করে বসে রইল।
বিষ্ণুপদ মৃদু গলায় বলল, আজ আবার সেই স্বপ্নটা দেখলাম। সেই যে ঘুমটা চটকে গেল আর এল না।
দুঃস্বপ্ন নাকি?
খারাপই। তবে এই বয়সে আর কতই বা খারাপ হবে। কিন্তু বড় ভয় খাইয়ে দেয়। কালঘড়ি আমার ঠাকুর্দাও দেখেছিল কিনা!
কালঘড়ি? সে আবার কী জিনিস?
বিষ্ণুপদ ব্যথাতুর গলায় বলে, ঘড়ির বৃত্তান্তটাও অদ্ভুত। জন্মে ঘড়ি নিয়ে কারবার করিনি বাবা। গাঁ-গঞ্জের লোক আমরা, ঘড়ি লাগে কিসে? তবু যে কেন দেখি! সে তো ছোটখাটো জিনিস নয়। আকাশজোড়া মস্ত একটা ঘড়ি। যেন কাকিনারা নেই তার। একটা বড় কাটা, আর একটা ছোট কাঁটা, তা তাও যেন আকাশে এ-মুড়ো ও-মুড়ো জুড়ে। কাঁটা দুটো এগুচ্ছে। বুঝলে! এগুচ্ছে।
নিমাই কিছু বুঝল না। তবে কিছু বলতে হয় বলে বলল, তা স্বপ্ন কত রকমেরই তো হয়।
তা হয়। তবে আমার ঠাকুর্দা এই স্বপ্নটা দেখার পর আর বাঁচেননি। এ বংশে ওটা একটা ব্যাপার বলতে পার। কালঘড়ি মানেই, হয়ে এল।
নিমাই এবার একটু ভাবিত হয়ে বলে, তবে তো মুশকিল।
মরতে তো তৈরিই আছি। তবে মরার আগেও কিছু ভাবনা-চিন্তা থাকে।
মরার কথা ভাবছেন কেন?
মরার কথা ভাবি না। ওটা ভাবনার বিষয়ই নয়। কথা কী জান? মরার সময় এলে মানুষের মনের মধ্যে একটা তাড়াহুড়ো পড়ে যায়। যেমন গাড়ি ধরার সময় মানুষের হয়, কোন্ পোটলাটা পড়ে রইল, কোনটা নেওয়া হল না, ছেলেপুলেগুলো সব উঠতে পারল কিনা, কুলির ভাড়া বেশী দেওয়া হল কিনা। বুঝেছো ব্যাপারটা? মরার সময়ও মানুষের ওরকমই হয়। কোনটা করা হল, কোনটা বাকি রইল। বুঝলে ব্যাপারখানা? এই মাঝরাত্তিরে বসে সেই সবই ভাবছি।
যে আজ্ঞে বুঝেছি।
ঘুম আসছে না বলে ভাবনা নেই। সামনে লম্বা ঘুম। সে ঘুম এলে সব কৃপিত বায়ু একেবারে ঠাণ্ডা। তাই জেগে বসে মশা তাড়াচ্ছি।
কথাটা ঠিকই বলেছেন। ভাবনারও যেন শেষ নেই। একটা যায়, তো আর একটা আসে।
তুমি বুঝদার মানুষ। এই ভাবনা-চিন্তার কথাটা লোককে বোঝাতে পারি না। কত কি ভাববার আছে বলে তো দুনিয়ায়?
তা বটে।
কদিন আগেও এক রাত্তিরে কালঘড়ির স্বপ্ন দেখেছিলাম। সেই থেকে মাথাটা খুব বেগোছ হয়ে গেল। তোমার শাড়ি তো কাঁদাকাটাও শুরু করেছিলেন। কালঘড়ির লক্ষণটা সুবিধের নয় ঠিকই। তবে কী জানো, ওই মরার ভাবনাটা আছে বলেই মানুষ ভাবনা-চিন্তাটা অন্তর করে।
কিন্তু আপনার আর চিন্তাটা কিসের বলুন। রামুদাদা বুক দিয়ে আগলে রেখেছে, অমন পিতৃ-মাতৃভক্ত ছেলে দেখা যায় না। বড়দাদাও বলতে নেই—মস্ত কেওকেটা মানুষ। ভাতকাপড়ের কষ্টটাও তেমন নয়। পালপাড়ায় আমার মা-বাবার অবস্থাটা যদি এমন হত তা হলেও ভাবনার কিছু ছিল না।
বিষ্ণুপদ গলাটা আরও খাদে নামিয়ে বলল, তারা আছেন এখনও?
আছেন আজ্ঞে।
দুজনেই?
দুজনেই।
তুমি তো ভাগ্যবান বাবা। যত পারো বাঁচিয়ে রেখো। এঁরা মহাগুরু।
দুধ-মানো অন্ধকারের দিকে চেয়ে নিমাই মিহিন গলায় বলল, ভাগ্য কি আর ওরা করে এসেছেন? বুড়ো বয়সটায় বড় কষ্ট যাচ্ছে। আমার অসুখের সময় কবিঘে জমি বিক্রি হয়ে গেল। এখন হাঁড়ির হাল। আমার যা হোক, ওঁরা কষ্ট পেলে বড় কষ্ট হয় আমার।
তোমরা কি কষ্টে আছ বাবা? কই, বীণার চেহারা দেখে তো মনে হয় না।
নিমাই একটু ফাপরে পড়ে যায়। আমতা আমতা করে বলে, কষ্টও বটে, আবার তেমন কষ্ট নয়ও বটে।
মানেটা কি হল?
আমাদের মতো মানুষের তো পায়ের নিচে ডাঙা জমি থাকে না। এর-ওর দয়ায় বেঁচে থাকা।
এ কথাটারও মানে বুঝছি না। খোলসা হও বাবা। কাকা না কে যেন একটা লোকের কথা শুনেছি। সে কেমন লোক?
সে আমাদের ভগবান। অসময়ে বড় দেখেছে আমাদের আজও দেখে। কিন্তু কপালটাই আমাদের নিমকহারাম।
কেন বাবা, কপালের দোষটা কী হল?
নিমাই ফের ফাপরে পড়ল। তারপর মৃদুস্বরে বলল, সে অনেক কথা। আপনাকে বলতে পারব না।
বিষ্ণুপদ একটা শ্বাস ছেড়ে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে, আমি এখন গাছপালার মতো হয়ে গেছি। ইট-পাথরের মতো। যখন কওয়ার লোক পাবে না আমার কাছে বোলো। বুদ্ধি পাবে না বটে, কিন্তু বুক হালকা হবে।
