তার কোনও মানে নেই। তবে আপনি সাইকোলজিক্যাল কেস নন। তা হলে মনোরুগী নই?
রশ্মি হাসল। যাদবপুরের সরুরাস্তায় ঢুকে সে গাড়ির স্পীড কমিয়ে সাবধানে চালাতে চালাতে বলল, আর বেশি কথা বলবেন না কিন্তু। আমি খুব নার্ভাস ড্রাইভার। কলকাতার রাস্তায় গাড়ি চালানো এক নাইটমেয়ার।
কষ্ট করে চালাচ্ছেন কেন? স্টিয়ারিং আমাকে দিন।
আপনার যে ডিপ্রেশন! বলে হাসে রশ্মি।
গাড়ি চালাতে ওটা বাধা নয়। গাড়ি চালিয়ে নেয় গাড়ি চালানোর অভ্যাস।
বেঁচে থাকাটাও কি ওরকমই এক অভ্যাস নয়।
রশ্মি গাড়ি দাঁড় করাল। সীট বদল করল। হেমাঙ্গ নিপুণ হাতে গাড়িটা চালু করে বলল, বেশ গাড়ি। চালিয়ে আরাম।
রশ্মি তার উল্লেখুড়া চুল দুহাতে পাট করতে করতে বলল, জীবনটাও ঠিক ওরকম। চালাতে পারলে আরাম। শুধু স্টিয়ারিংটা আর কারও হাতে দিতে হয়।
রশ্মি খুব হাসছে। হেমাঙ্গ ততটা হাসতে পারছে না। সে হাসছে কৃত্রিম হাসি, সঙ্গ দিতে।
পরমানন্দের ঠেক-এ পৌঁছানোর পর সে হফ ছাড়ল।
প্রায় বিঘা চারেক জমি আর একটা ছোটো পুকুর নিয়ে পরমানন্দ তার শ্রীরামকৃষ্ণ সেবা সম্ভ গড়ে তুলেছে। একা হাতে। বিস্তর গাছপালা, ফুল আর সবুজ ঘাসে তৈরি করেছে এক মায়ার রাজ্য। তারই ফাঁকে ফাঁকে কয়েকটা কুটির, একটা দোতলা বাড়ি আর একটা টিনের শেড-এ ল্যাবরেটরি।
পরমানন্দ রবিবার মঠে যায়। বেলুড়ে। সেটা খেয়াল রাখেনি হেমাঙ্গ। তবে পরমানন্দের অনুগত তরুণ আর এক সন্ন্যাসী প্রেমানন্দ এসে আদর করে ঘরে নিয়ে গিয়ে বসাল। পাখা খুলে দিল। বলল, চা না কফি?
আশ্রমে চা কফি অফার করা হয় বুঝি? ঠাকুরকেও চা বা কফি ভোগ দেন তো?
রশ্মির এই প্রশ্নে প্রেমানন্দ একটু ঘাবড়ে গিয়ে বলল, না, তা দিই না। তবে খাওয়ার আগে নিবেদন করে নিই।
রশ্মি খুব হাসিমুখে বলে, তবু ভাল যে চা কফির চেয়ে কড়া নেশা নেই। থাকলে ঠাকুরের বিপদ ছিল, তাই না?
প্রেমানন্দ একটু লজ্জা পেল। বলল, তা হলে খাবেন না?
খাবো না কেন?
প্রেমানন্দ তড়িঘড়ি চলে গেল সামনে থেকে। পালাতে পারলে বাঁচে।
হেমাঙ্গ রশির দিকে চেয়ে বলল, পারেনও বটে আপনি। এসব ধর্মকর্ম বোধ হয় আপনার ভাল লাগে না?
লাগবে না কেন? আমি একটু ধৰ্মও করি। আমার খারাপ লাগছে না তো!
তা হলে ওভাবে বললেন যে!
একটু মজা করলাম। কিন্তু আপনি এখানে কেন আসেন বলুন তো! ধর্ম করতে?
না। তবে হয়তো একদিন এখানেই এসে পার্মানেন্টলি থাকব।
ওমা! কেন?
কোথায় আর যাবো?
এ জায়গাটা কি খুব ভাল?
খারাপ তো নয়!
রশ্মি খুব হাসতে লাগল। হাসলে মেয়েটাকে এত ভাল দেখায়! তারপর হঠাৎ হাসি থামিয়ে হেমাঙ্গর দিকে চেয়ে বলল, আপনার খুব মৃত্যুভয়? না?
০৪৬. সন্তৰ্পণে দরজাটি খুলল
মাঝরাতে যখন সন্তৰ্পণে দরজাটি খুলল নিমাই তখন তার চোখভরা জল। এত জল যে, চোখে কিছু ঠাহর করার উপায় নেই। তার ওপর কুয়াশা বড় জমাট। তেমনি জমাট অন্ধকার। সব যেন গলাগলি করে এসে দাঁড়িয়েছে আজ এক সঙ্গে। ঘরে একটা লণ্ঠন জ্বলছে ঢিমিয়ে। বিছানায় বীণাপাণি কেমন একটু এলোমেলো হয়ে শুয়ে। নিমাই আজ ওই বিছানায় শোয়নি। জলচৌকিতে বসে রইল। কত মশা কামড়েছে তাকে সে টেরও পায়নি আজ। মনের জ্বালা প্রবল হলে শরীরের জ্বালা ড়ুবে যায়। এই যে বীণাপাণি তাকে বিদেয় দিল, আর কি কখনও ফিরে আসতে পারবে নিমাই? আর হয়তো দেখাই হবে না, কটা বিলিতি টাকার জন্য এতকালের একটা সম্পর্ক ভেঙে দিতে বীণার বাধল না! দুনিয়াটা এই রকম করেই একটু একটু চিনতে হবে তাকে।
এক ধাপ মোটে সিঁড়ি, তার পরই উঠোন। অন্ধের মতোই আন্দাজে সিঁড়িতে পা রাখল নিমাই। দু চোখে আজ যেন বান ডেকেছে। বুকটা বড্ড কুঁপিয়ে খুঁপিয়ে উঠছে। বড় অভিমান হচ্ছে তার। বড় অপমানও লাগছে। বড় দুঃখ হচ্ছে। দরজাটা খুব চুপিসাড়ে, বিনা শব্দে ভেজিয়ে দিল নিমাই। ঘুমোও গো, মনের সুখে ঘুমোও। এইরকমধারা একদিন বিষ্ণুপ্রিয়াকে রেখে নিমাই সন্ন্যাস নিয়েছিল। সে কত সুখের ছেড়ে-যাওয়া। আর এ নিমাইযেয় যাচ্ছে তার বড় অনাদর। বড় গঞ্জনা।
উঠোনে পা ফেলতেই পায়ের তলা থেকে কী যেন একটা হড়কে সরে গেল সড়ৎ করে। সাপখোপ নেই এখানে? থাকলে দিক না ঠুকে। ল্যাটা চুকে যাক। মরা মুখটা দেখুক বীণাপাণি। বুকে পড়ে কাঁদুক।
কিন্তু মানুষের মনের মতো করে কবে কি ঘটেছে? সাপও যদি হয়ে থাকে সে ব্যাটাচ্ছেলও কামড়াল না নিমাইকে। পালাল। চোখের জলটা গামছা দিয়ে চেপে মুছল নিমাই। সামনেটা বড় আঁধার। কুয়াশা এত চেপে বসেছে যে, হাতখানেকের বেশী নজর যায় না। কোনদিকে যে আগড়, রাস্তা যেকোন দিকে তা বুঝে ওঠা মুশকিল। রাত আর একটু কাবার করে বেরোলে হত।
একটা কুকুর হঠাৎ ভেঁকিয়ে উঠল কোথা থেকে। বাড়ির কুকুরই হবে। কামড়ায় যদি তো কামড়াক। নিমাইয়ের আর ভয় কিসে?
কুয়াশা বটে তবে ঠাণ্ডা তেমন নেই। একটু সিরসিরে ভাব আছে। টপ টপ করে বেশ বড় বড় ফোঁটায় শিশির পড়ছে গাছপালায়। শিউলির গন্ধ ছেড়েছে খুব।
তাদের একখানা মাত্র টর্চ আছে। সেটা সঙ্গে নিলে নিমাইয়ের একটু সুবিধে হত। কিন্তু বীণাপাণির টর্চ বীণাপাণির জন্যই রেখে এসেছে সে। বনগাঁর বাড়িতে তার সুটকেসখানা আছে। টিনের সস্তা জিনিস। কয়েকখানা মোটে জামাকাপড়। সেটারও আর কোন দরকার নেই তার। মায়া বাড়িয়ে লাভ কি?
দোকান-টোকানের কথা ভেবে আর লাভ নেই। নিমাই জানে, এখন কিছুদিন তাকে গতর খাঁটিয়ে যেতে হবে। যোগালির কাজ হোক, মাটি কাটার কাজ হোক, ছুতোরের কাজ হোক, বেড়া বাঁধার কাজ হোক, কিছু না কিছু জুটেই যায়। পরিশ্রমের কাজটা এখনও খুব একটা পেরে ওঠে না নিমাই। তবে গতর পুষে রাখলে তো আর চলবে না! পেটটা তার একার নয়, পালপাড়ায় দুটো অসহায় বুড়োবুড়ি আছে। বীণাপাণির কাছে নিমাই যদি ত্যাগ হয়ে থাকে তবে তারাও তো ত্যাগ হল!
