এ গাড়ি কোথায় পেলেন?
রশ্মি মৃদু হেসে বলে, অনেক পুরনো। বড় একটা বের করা হয় না। বাবা ইংল্যান্ড থেকে এনেছিল। মেইনটেনেন্সের খরচ অনেক। একজন পুরনো মিস্ত্রি আছে, সে-ই সারিয়ে-টারিয়ে দেয়। তবে না চালালে ব্যাটারি ডাউন হয়ে যায়, যন্ত্রপাতিতে মরচে ধরে। আজ বেরোবার সময় বাবা বলল, গাড়িটা একটু চালিয়ে নিয়ে এসো। তাই আজ এটা বের করেছি। ভয় নেই, মাঝপথে ট্রাবল দেবে না। এটার নাম আমরা রেখেছি দি ওল্ড রিলায়েবল।
বেশ গাড়ি।
আধুনিক নয়, এই যা। আপনার কি আজ মুড একটু অফ?
কেন বলুন তো!
গম্ভীর মনে হচ্ছে।
মুড অফ বলাটা ঠিক হবে না। আসলে…
আসলে?
আমার মাঝে মাঝে কেমন যেন সব কিছু মিনিংলেস লাগে। ঠিক বোঝাতে পারব না কেমন।
মিনিংলেস না লাগাটাই তো আশ্চর্যের!
তার মানে?
মিনিংলেসের কি মানে থাকে।
বলে রশ্মি একটু হাসল। মেয়েটা হাসলে রূপ যেন ফুলঝুরির মতো উপচে পড়ে। মাথার ওপর ছোট কনভেক্স আয়নায় মুখখানা দেখছিল হেমাঙ্গ। চারুদি খবর নিয়েছে। এর সঙ্গে তার বর্ণে মিল, বয়সে মিল। যোটক বিচারটা এখনও হয়ে ওঠেনি। হাওয়া বুঝে ওটাও করা হবে। সম্ভবত মিলেও যবে। কথাটা হেমাঙ্গর মা ও বাবার কাছে পৌঁছে দিয়েছে। চারুদি। বাড়ি থেকে সবুজ সঙ্কেত দেওয়া হয়েছে। শোনা যাচ্ছে, রশ্মির বাড়ি থেকেও আগ্রহ দেখা গেছে। আর রশ্মি? হেমাঙ্গ বুঝতে পারছে না বটে, কিন্তু অন্যেরা বলছে, রশ্মিও নাকি রাজি। খুব রাজি। কিন্তু ওর কোনও ব্ৰীড়া নেই কেন? ভাবী বর বলে যদি ধরে নিয়েও থাকে, তবে দেখা হলে কই লজ্জায় রাঙা হয় না তো! কিংবা চোখে একটা ঝলমলে ভাব ফুটে ওঠে না তো! সে কি বিলেতবাস এবং অনেক পুরুষসঙ্গ করার ফল? হবেও বা!
রশ্মিকে তার কেমন লাগে? অনেক ভেবেছে হেমাঙ্গ। রশ্মি এক অত ভাল মেয়ে। কাছে এলেই তার ভাল লাগে। কিন্তু এই মেয়েটির সঙ্গে তার নিরাবরণ ঘনিষ্ঠতা হবে, এই মেয়েটি তার সঙ্গে দিনরাত বসবাস করবে ঠিক এরকমটা কেন সে ভাবতে পারে না।
আপনার ডিপ্রেশনের কথাটা এবার একটু বলবেন?
হেমাঙ্গ কুণ্ঠিতহয়ে বলে, বলার মতো কিছু নয়। হয়তো ছেলেমানুষী।
হয়তো তা নয়। কে জানে? বলুন তো একটু শুনি।
আপনি কি সাইকিয়াট্রিস্ট?
নয় কেন? আমি সাইকোলজি নিয়ে পড়াশুনো করেছি। কাজও করেছি। আমার প্রিয় সাবজেক্ট।
ও বাবা, তা হলে তো আপনাকে বলা ঠিক হবে না। হয়তো আমার ভিতর সূক্ষ্ম পাগলামি ধরে ফেলবেন।
সূক্ষ্ম কেন, আপনার চারুদিদি তো বলে, আপনি খুব পাগল।
হয়তো তাই। বলে ম্লান মুখে বসে থাকে হেমাঙ্গ।
মুখে একটু চুক চুক করে আফসোসের শব্দ করে রশ্মি। তারপর বলে, আহা রে, কেমন দুঃখী মুখ করে বসে আছে। দেখ! পাগল তো আমরা সবাই। কিছু কম, কিছু বেশি। আমি ডিপ্রেশনের কথাটা জানতে চাইছি। ওটা পাগলামি নয়।
বললাম তো, একটা অর্থহীনতা। মনে হয়, জীবনের আর কোনও উদ্দেশ্য ছিল। সেটা জানাই হল না, কি ছাই শরীরসর্বস্ব হয়ে বেঁচে থাকা।
রশ্মি একটু চুপ করে থেকে বলল, শরীর ছাড়া তো বাঁচাও যায় না। শরীর কি উপেক্ষার বস্তু?
তা নয়। কিন্তু শরীর ছাড়াও, এই অস্তিত্ব ছাড়াও যেন আরও কিছু ছিল। জানা হল না।
ঈশ্বর কি?
হতে পারে। আমার ঠাকুর-দেবতার বায়ু কিন্তু নেই।
আমার আবার একটু আছে। সে যাক গে। আপনার যখন মন খারাপ হয় তখন কী করেন।
কিছু না। চুপচাপ একা বসে থাকি।
শুনেছি, মন খারাপ হলেই আপনি অকাজের জিনিস কেনেন!
কে বলল?
যেই বলুক, কথাটা কি মিথ্যে?
লজ্জিত হেমাঙ্গ বলে, আমার একটা বদ-অভ্যাস।
চারুদি আপনাকে খুব ভালবাসেন। আপনার সব কিছু ওঁর নখদৰ্পণে।
ও একটা স্পাই।
ভালবাসার জনের ওপর একটু গোয়েন্দাগিরি করতে হয় মাঝে মাঝে।
কেনাকাটা করা ছাড়া আর আমার কোনও বদ-অভ্যাস নেই। চারুদির অবশ্য নানা সন্দেহ আছে।
ব্যাচেলরদের সকলেই একটু সন্দেহ করে। ওটাকে গুরুত্ব না দিলেই হয়। কিন্তু আপনি এত জিনিসপত্র কেনেন কেন? শুনেছি সেসব জিনিস আপনার কোনও কাজে লাগে না!
জিনিসপত্র কিনি সে কথা ঠিক। কিন্তু আমি খুব মেটেরিয়ালিস্ট নই।
সেটাও মনে হয়। ডিপ্রেশনটা আপনার কখন হয়?
তার কোনও ঠিক নেই। আজ ভোরবেলা হঠাৎ ঘুম থেকে উঠে মনে হল, সব যেন শূন্যতায় ভরা।
আপনি নাকি কনফার্মড ব্যাচেলর?
হ্যাঁ। বিয়ে করাটাও এক অর্থহীন রিচুয়াল।
মেয়েদের ভয় পান?
বোধ হয় আমিও এসকেপিস্ট।
আপনি আমাকেও ভয় পান না তো!
আপনাকে? না, আপনাকে নয়।
ঠিক বলছেন? প্রথম দিন কিন্তু খুব লজ্জা পাচ্ছিলেন আমার সামনে। খেতে অবধি পারেননি।
লজ্জা আর ভয় কি একই জিনিস?
ঠিক এক নয়। তবে লজ্জা আর ভয়ের মধ্যে একটা মিলও আছে।
কি রকম?
লজ্জাও এক রকমের ভয়। লজ্জার মধ্যে আত্মবিশ্বাসের অভাব থাকে, ইনফিরিয়রিটি থাকে।
আর কিছু নয়?
থাকতে পারে। লজ্জা জিনিসটা ইউনিভার্সাল নয়। যেমন নয় অভিমান।
হেমাঙ্গ খানিকটা ভাল। তারপর বলল, বোধ হয় ঠিকই বলেছেন। পশ্চিম দেশে ও দুটি অনুভূতির খুব অভাব। কিন্তু আজ আপনি বড় মাস্টারি করছেন। আমাকে নিয়ে ভাববেন না। আমার ডিপ্রেশন কয়েক দিনেই কেটে যায়।
কিন্তু আসে কেন? হাজার মানুষের হাজারো ডিপ্রেশন, তার আবার হাজার কারণ। আপনারটা কেন আসে? আপনার তো মানিটারি প্রবলেম নেই, ফ্যামিলি প্রবলেম নেই, জব স্ট্রেস নেই। তা হলে?
ওসব থাকলে বোধ হয় ডিপ্রেশনটা হত না। আমার মনে হয় জীবনে বাঁচার লড়াই করাটাও দরকার। তা হলে এইসব ফ্যান্সি জিনিসগুলো কেটে যায়।
