তুই ভণ্ড বলে নিজেকে জানিস?
ভণ্ড ছাড়া আর কি? তবে অ্যাটিচুডটা মিথ্যে নয়। বুঝবার এটাও হয়তো একটা রাস্তা।
আমার পক্ষে সন্ন্যাসী হওয়ার কোনও বাধা নেই। বিয়ে করব না, কোনও বাইন্ডিং নেই, বেঁচে থাকার অর্থও কিছু পাচ্ছি না। তোর আখড়ায় আমাকে থাকতে দিবি?
থাকবি? এ আর বেশি কথা কি? চলে আয়।
আমি ঝাঁটপাট দিতে পারব না, কষ্ট করতে পারব না, খারাপ রান্না খেতে পারব না। আগেই বলে দিচ্ছি।
দুর পাগল! তোকে কি আমি চিনি না? আমরা কি খারাপ খাই?
আরও একটা শর্ত আছে। মোটা মোটা ধর্মের বইগুলো পড়তে ভীষণ খটোমটো। আমি ওসবও পড়ব না।
তোকে কিছু করতে হবে না। চলে আয় তো! এ সপ্তাহেই আয়।
দুর বোকা! এত তাড়াতাড়ির কথা বলছি নাকি? আমি আসব বুড়ো বয়সে, যখন দেখাশোনার কেউ থাকবে না, কথা বলার কেউ থাকবে না, তখন আসব।
পরমানন্দ খুব হাসল, তাই বল। ওল্ড এজ হোম হিসেবে এসে থাকবি তো! কিন্তু বুড়ো বয়স অবধি ইচ্ছেটা থাকবে না হয়তো।
না থাকলে আসব না। তবু একটা টেক তো রইল। দায়ে দফায় আসা যাবে।
বাস্তবিকই তথাগত তথা পরমানন্দের আশ্রমের জন্য বেশ কিছু টাকা অযাচিতভাবেই দিয়ে রেখেছে হেমাঙ্গ। এমনকি একটা আটাচড বাথওলা পাকা ঘর তার টাকাতেই করা হয়েছে দোতলায়। হেমাঙ্গ বলে রেখেছে। ওই ঘরটাই আমাকে
পরমানন্দ হেসে কুটিপটি হয়ে বলেছে, এরকম শর্তাধীন দান কি আসলে দান? তুই টাকাই বা দিচ্ছিস কেন? এমনি আয়, তোর জন্য জায়গা থাকবে।
এটা প্রায় এক বছর আগেকার কথা। তখন কিছুদিন হেমাঙ্গর খুব মানসিক নিঃসঙ্গতা চলছিল। তারপর আবার কাজকর্ম ইত্যাদি নিয়ে জড়িয়ে পড়ায় পরমানন্দর কাছে যাওয়া হয়নি। পরমানন্দকে তার কোনওদিনই পুরোপুরি সন্ন্যাসী বৈরাগী বলে মনে হয় না। হতে পারে, সেও এক বিবাহভীত, সংসারভীত, ঝামেলাভীত, কম্পিটিশনভীত, পলায়নকামী মানুষ। সন্ন্যাসীর ছদ্মবেশের ভিতরে, পরমানন্দের ভিতরে পালিয়ে আত্মগোপন করে আছে ভীরু তথাগত। রামকৃষ্ণ ছেড়ে কেন যে আলাদা আশ্রম খুলল তারও কোনও সদুত্তর কখনও দেয়নি পরমানন্দ। হতে পারে, মিশনকে নয়, সন্ন্যাসের ভাবটুকুই তার প্রয়োজন ছিল।
আজ সকালে আবার ডিপ্রেশনটা টের পাচ্ছে হেমাঙ্গ। ছুটির দিন। শরতের এক চমৎকার সকাল। অথচ এক বুক অন্ধকার নিয়ে সে বসে আছে ডিনার টেবিলে। সামনে ইলেকট্রিক কেটলিতে তৈরি করা পাইপিং হট চা।
আজ কোথাও নেমন্তন্ন নেই। আজ বাড়িতেই খাবে বলে ফটিককে বাজারে পাঠিয়েছিল। ফটিক বাজার করে ফিরে এল একটু আগে। আস্ত মুর্গি এনেছে। যেদিন হেমাঙ্গ বাড়িতে খায় সেদিন ফটিকের একটু আহাদ হয়। কারণ সেও একটু ভালমন্দ খেতে পায় সেদিনটা। আজ ফটিকের আনন্দের দিন। কিন্তু হেমাঙ্গর নয়। এত অর্থহীন বেঁচে থাকার কোনও মানেই সে খুঁজে পাচ্ছে না।
আজ একবার পরমানন্দের কাছে গেলে কেমন হয়? তার সন্ন্যাসে ফাঁক থাকতে পারে, কিন্তু পরমানন্দ সব সময়ে একটা খুশির আবহাওয়ার মধ্যে থাকে। তাকে ঘিরে সব সময়েই কিছু লোক। বাচ্চ সন্ন্যাসী, অর্থাঁ, প্রার্থী, নানা ধরনের মানুষ। সব সময়ে জীবনের একটা ধারার মধ্যে, নানা কাজের মধ্যে ড়ুবে থাকে পরমানন্দ। ব্যক্তিগত উন্নতি, সঞ্চয়, সম্মান নিয়ে কোনও বালাই নেই। টেনশন নেই। পরমানন্দের কাছে বসে থাকতেও ভাল লাগে। হেমাঙ্গর।
ফটিক মুর্গি কাটতে নিচে গেছে। নিঃশব্দে পোশাক পরে নেয় হেমাঙ্গ। দরজায় তালা দিয়ে নিচে নেমে ফটিকের সামনে চাবিটা ফেলে দিয়ে বলে, আমার দেরি দেখলে খেয়ে নিও ফটিকদা, একটু বেরোচ্ছি।
ই বাবা! রাঁধতে বললে যে!
ফিজে রেখে দিও।
এবেলা তবে খাবে না?
ঠিক নেই। একটা জরুরি কাজের কথা মনে পড়ে গেল।
বেরোবার মুখেই বাধা পেল হেমাঙ্গ। বেশ বড় বাধা। ফটক থেকে সিঁড়ি বেয়ে একতলার বারান্দায় উঠে আসছিল রশ্মি।
বেরোচ্ছিলেন! ইস! আর একটু হলেই আপনাকে মিস করতাম।
হেমাঙ্গ কেন যে থমত খেয়ে গেল কে জানে! বলল, আসুন। আপনি তো কখনও আসেননি এ বাড়িতে।
রশ্মি মৃদু হেসে বলে, আসতে বলেছেন কখনও? ব্যাচেলর্স ডেন বলে কথা, তাই না? মেয়েদের বোধ হয় আসতে নেই?
লজ্জা পেয়ে হেমাঙ্গ বলে, না, তা নয়। আসলে আপ্যায়ন করার মতো ব্যবস্থা নেই কিনা! ওপরে আসুন।
ও মা! আসব কি? আপনি যে বেরোচ্ছেন।
তেমন জরুরি কাজ কিছু নয়। এক বন্ধুর কাছে যাচ্ছিলাম।
তা হলে যান না! আমি এমনিই এসেছিলাম। আমার জন্য অ্যাপয়েন্টমেন্ট মিস করার দরকার নেই।
অ্যাপয়েন্টমেন্ট কিছু নেই। আমার বন্ধুটি এক সন্ন্যাসী। যে কোন সময়েই তার কাছে যাওয়া যায়।
সন্ন্যাসী! হঠাৎ সাধুসঙ্গ করছেন যে বড়।
সাধু বলে নয়। বাল্যবন্ধু এক সঙ্গে পড়েছি।
তা হলে তিনিও তো ইয়ং ম্যান। এত অল্প বয়সে সন্ন্যাসী কেন?
তা কে বলবে? আমার তো মনে হয় এসকেপিস্ট।
বেশির ভাগ মানুষই তো তাই। কত দূরে থাকেন তিনি?
বেশি দূর নয়। সোনারপুর। যাবেন।
রশ্মি অবাক হয়ে বলে, আমি। সন্ন্যাসীরা তো নারীমুখ দেখেন না।
আমার বন্ধুর অত শুচিবায়ু নেই। ওর ইস্কুলে, তাঁতকলে কত মেয়ে পড়ে, শেখে।
ঢুকতে দেবেন তো, কিন্তু পাত্তা দেবেন না হয়তো।
চলুন না। আপনাকে পাত্তা না দিলে আমিও বসব না।
রিস্ক কিন্তু আপনার। চলুন। গাড়ি বের করতে হবে না, আমি গাড়ি এনেছি।
অস্টিন অফ ইংল্যান্ড গাড়ি আজকাল কলকাতায় দেখাই যায় না। কলকাতা ভরে আছে একঘেয়ে অ্যাম্বাসাডার, মারুতি আর প্রিমিয়ার গাড়িতে। গাড়ির ভিতরটা কিছু অন্ধকার এবং বিপ্ন। আজকালকার খোলামেলা ঝলমলে গাড়ি নয়। যেন একটা গর্তের মতো অভ্যন্তর। তার ওপর কালো বা কালচে ধরনের চামড়ায় মোড়া সী।
