দরজা খুলল বুবকা। না, ঝুমকি নয়। অনুর বান্ধবী মোহিনী। চমৎকার দেখতে মেয়েটা। বাইরের চটক ততটা কিন্তু নেই। মোহিনীর সৌন্দর্য দেখতে হলে একটু মন দিয়ে দেখলে ধরা যায়। মুখ চোখ যেন সূক্ষ্ম সব যন্ত্র দিয়ে কমপিউটারে মাপজোখ করে তৈরি। কিন্তু মোহিনী খুব ফর্সা নয়, খুব লম্বা নয়। আলটপকা চোখে পড়ে না। কিন্তু মিষ্টি ধারালো মুখখানা আর ভারী পাতার নিচে ঢলঢলে দুখানা চোখ অপর্ণার খুব পছন্দ। একটাই দোষ, বড্ড ইংরিজিতে কথা বলে।
অপর্ণার বাড়িতেও একই অবস্থা। ঝুমকি বাদে বাকি দুজন প্রথম থেকে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ছে। ওরা বাংলা বলতে একটুও ভালবাসে না। মণীশও ওদের ইংরিজিকে আকণ্ঠ প্রশ্রয় দেয়। আন্টি, কি খবর জানতে এলাম।
একইরকম। বোসো। এই ড্রেসটা কবে করালে?
মোহিনী তার ঘাঘরা আর কামিজের নতুন পোশাকটাকে যেন হাত বুলিয়ে একটু আদর করে বলল, আমার বার্থ ডে ছিল তো গত মাসে। বাবা দিয়েছে।
বেশ পোশাকটা হয়েছে। ঘাঘরার তলায় রঙিন বলগুলো কি তোমরা লাগিয়ে নিয়েছো, না কি ওরকমই?
এরকমই কিনতে পাওয়া যায়। বাবা বম্বে থেকে এনেছে।
তাই বলো। এখানে এখনও এসব ফ্যাশন চালু হয়নি।
মিষ্টি করে হাসল মোহিনী, খুশির হাসি।
তবে এই বৃষ্টির দিনে ড্রেসটা পরে ভাল করেনি।
মোহিনী অকপটে মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বলল, চট করে চলে এলাম তো, খেয়াল করিনি।
বোসো। চা খাবে?
আমি তো খাই না। বলে আবার সেই মিষ্টি হাসি।
ওঃ, তাই তো। আসলে আমার এক কাপ চা বাড়তি হয়েছে। কী যে করি!
বুবকা বিরক্ত গলায় বলল, তোমার প্রবলেমগুলো এত ছোটখাটো কেন বলো তো মা! চা-টা আমাকে দিয়ে দাও। আঠারো বছরের ছেলেরা আজকাল ভোট দেয়। বুবকর আঠারো। তার মানে কি বুববকা সাবালক হয়ে গেল! এক কাপ চা বাড়তি হয়েছে, একথাটা বোধহয় মোহিনীর কাছে বলাটা উচিত হয়নি। যেন বাড়তি হয়েছে বলেই অফার করা হচ্ছে। বুবক বোধহয় সেই কারণেই অপর্ণার ওপর বিরক্ত হল। আজকাল অপর্ণা কত কি শেখে ছেলের কাছ থেকে।
মোহিনী আসতেই এক ডাকে উঠে পড়ল অনু।
অপর্ণা মনে মনে এরকমই একটা কিছু চাইছিল। কেউ একজন আসুক। এই নিস্তব্ধ বিষণ্ণ বাড়িটার ভারী বাতাস কেটে যাক কথায় বার্তায় হাসিতে।
অফিস থেকে লিজ নেওয়া এই ফ্ল্যাটটা বেশ বড় এবং স্ট্যাটাস সিম্বল সবই প্রায় আছে। শুধু গ্যারেজে গাড়িটা নেই। আগের অ্যাম্বাসাডারটা ভাল দাম পেয়ে বিক্রি করে দিয়েছে। মণীশ গত মাসেই। একটা মারুতি ভ্যান কেনার কথা। দরাদরি * চলছিল। দু-চার দিনের মধ্যেই এর্সে যেত। কিন্তু মণীশের অসুখটাই বাধা হল বোধহয়। অপর্ণা একরকম খুশি। তেলের যা দাম বাড়ছে, গাড়ি পোষার মানেই হয় না। মণীশ অফিসে যায় আসে পুল কার-এ। তবে গাড়িটা দিয়ে কি হয়? অপৰ্ণার শখ ছিল গাড়ি চালানো শিখবে। মোটর ট্রেনিং স্কুলে শিখেও ফেলল। লাইসেন্স দিয়ে দিল। আর তারপরই সে ভয়াবহ অ্যাকসিডেন্ট… অপৰ্ণা সে কথা আর ভাবতেই চায় না।
একটা নতুন আওয়াজ বজ্ৰাঘাতের মতোই ফের চমকে দেয় অপর্ণাকে, ভুল শুনছে না তো! করিডোরে টেলিফোন বাজছে নাকি? চার মাস ধরে টেলিফোন মূক ও বধির হয়ে ছিল। তারা ক্রমে ভুলে যাচ্ছিল টেলিফোনের কথা। পরশুদিনই ঠুমুক গিয়ে টেলিফোন অফিসে ধরে পড়েছিল, আমার বাবার ভীষণ সিরিয়াস অসুখ, আমাদের টেলিফোনটা ঠিক করে দিন।
এসব আবেদনে কাজ হয় কি?
টেলিফোনের আওয়াজে বুবকা আর অনুও উঠে দাঁড়িয়েছিল। বিস্ময়ে।
অপৰ্ণাই গিয়ে সবার আগে ধরল।
হ্যালো।
আপনাদের লাইন ঠিক করে দেওয়া হল।
অপর্ণা বুকভরা কৃতজ্ঞতা অনুভব করে বলে, কি বলে যে ধন্যবাদ দেবো। আমার স্বামী ভীষণ অসুস্থ, নার্সিং হোমে। তাই টেলিফোনটা আমাদের এখন ভীষণ দরকার।
অসুখ আছে বলছেন! আচ্ছা ঠিক আছে।
লাইন এখন চালু থাকবে তো!
চেষ্টা তো আমরা সবসময়েই করি। মেশিন সব পুরোনো, বুঝতেই পারছেন।
অপর্ণার অভিজ্ঞতা আছে। লাইন চালু হয়েই ফের বন্ধ হয়ে যায়। সে টেলিফেনটা রেখে আবার তুলল। ডায়ালটোন আছে।
বুবকা উঠে এসেছে। টেলিফোন তুলে নিয়ে বলল, দাঁড়াও, নার্সিং হোমে একটা ফোন করি।
এই তো সন্ধেবেলায় দেখে এলি।
তবু। টেলিফোনটাও একটু বাজিয়ে নেওয়া যাবে।
বাড়ির সকলে যতক্ষণ না ফিরছে ততক্ষণ স্বস্তি নেই অপর্ণার। সন্ধের পর একে একে ফিরতে থাকে সবাই। সকলে যখন ফিরল, কেউ বাকি রইল না, তখন স্বস্তি। অপর্ণা অস্বস্তি টের পাচ্ছে ঝুমকির জন্য। আটটা বাজতে চলল।
অফিসের বদান্যতায় তারা বেশ ভাল আছে। খুব ভাল আছে। বাইরে থেকে তাদের বড়লোক বলেই তেঁা ভাবে লোকে। কিন্তু ভাল থাকাকে বিশ্বাস করে না। অপর্ণা। যেদিন পিছনে পেখম ধরার মতো মণীশের মস্ত নামজাদা অহংকারী কোম্পানিটি থাকবে না সেদিন ব্ল্যাকবোর্ডের লিখন মুছে দেবে সময়।
মণীশ বাড়ি করতে আগ্রহী ছিল না। ফ্ল্যাট কিনতে রাজি ছিল, তবে খুব অভিজাত কোনও পাড়ায়। কিন্তু তাতে যা টাকা লাগবে তা মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। কিন্তু মণীশ কেবলই বলেছে, হয়ে যাবে। টাকা ঠিক জুটিয়ে নেবো।
কিন্তু সেরকম জুটিয়ে নেওয়ার মানে অপর্ণা জানে। হয়তো এমন সোর্স থেকে টাকা জোগাড় করবে যাতে চড়া সুদ দিতে হয়। আর ফলে হাঁড়ির হাল হবে।
অন্যদিকে বুদ্ধি কতটা তীক্ষ্ণ তা অপর্ণা জানে না, তবে টাকা-পয়সার ব্যাপারে তার স্বাভাবিক মেধা খুবই বাস্তববাদী। সে মণীশকে ড়ুবে-মরার হাত থেকে বাঁচাতে রোজ রাতে পইপই করে বোঝাতো। বুঝিয়ে বুঝিয়ে মুখে ফেনা অবশেষে মণীশ অতিশয় তাচ্ছিল্য ও উপেক্ষার ভাব দেখিয়ে রাজি হল ইন্টাৰ্ণ বাইপাসের কাছাকাছি অপর্ণার মিনি মাসীর একটা চার কাঠা প্লট কিনতে। দাম খুবই সুসাধ্য। তখন ওপাশটায় লোকালয় নেই।
