আজ সকালে উঠে তার মনে হল, বার্ধক্যের একা এবং অসহায় দিনগুলির জন্য তার কিছু আগাম প্রস্তুতি নিয়ে রাখা দরকার। তার বয়স যদিও ত্ৰিশের এদিক ওদিক, তবু প্ৰস্তুত হয়ে থাকা ভাল। অন্তত ভাবনা চিন্তা এখনই শুরু করা দরকার। জন্মাবধি এ পর্যন্ত তার জীবন অতীব মসৃণ এবং তৈল নিষিক্ত মেশিনের মতো ত্রুটিহীন। কিন্তু কিছু পরে সমস্যা সৃষ্টি হতে থাকবে।
পরমানন্দকে সে মাঝে মাঝে টাকা দেয়। পরমানন্দ চায় না, সে নিজে থেকেই দেয়। পরমানন্দ আসলে তথাগত। ইস্কুলে তার গলাগলি বন্ধু ছিল। তথাগত ছিল ফাস্ট বয়। মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করেছিল ফাস্ট ক্লাস পেয়ে। চাকরি করেছিল কিছুদিন। তারপুর রামকৃষ্ণ মিশনে ব্ৰহ্মচারী হল, কিছু পরে সন্ন্যাসী। মিশন ছেড়ে সে এখন আলাদা আশ্রম করেছে। কয়েকজন অনুগামী নিয়ে। আগাগোড়া তথাগতকে লক্ষ করে এসেছে হেমাঙ্গ। তথাগত ঈশ্বরের সমীপবতী হতে পারল কিনা, ব্ৰহ্মজ্ঞান লাভ করে ফেলল। কিনা এসব জানার কৌতূহল ছিল প্রবল। সেসব না হলেও পরমানন্দ একটা সন্তোষের ভাব নিয়ে থাকে। সোনারপুরের কাছেই সে একটা অনাথ আশ্রম, একটা আশ্রমিক বিদ্যালয়, তাত সেন্টার আর মন্দির নিয়ে আছে। তাতে দেশের কতটা উপকার হচ্ছে তা জানে না হেমাঙ্গ। তবে জীবনের একটা অর্থ হয়তো পরমানন্দ পেয়েছে।
একদিন সে পরমানন্দকে জিজ্ঞেস করেছিল, যদি সন্ন্যাসীই হবি তা হলে এত লেখাপড়া শিখতে গেলি কেন? সময়টা নষ্ট হল।
পরমানন্দ স্মিত মুখে বলল, নষ্ট হয় না। কাজে লাগে। ঠাকুরেরই কাজে লাগে।
হেমাঙ্গর ঠাকুর নেই বলে কথাটা খুব গভীরে ফোকে না তার।
আর একদিন জিজ্ঞেস করেছিল, আগে তুই ক্রিকেটের খুব ভক্ত ছিলি। এখনও আছিস? ইন্ডিয়া-পাকিস্তান টেস্ট ম্যাচ হলে টিভিতে দেখিস?
পরমানন্দ অবাক হয়ে এবং পরে হেসে বলে, কেন দেখব না?
খুব দেখি। এর পরের প্রশ্নটা হঠাৎ মাথায় কি করে যে এল হেমাঙ্গর কে বলবে! সে জিজ্ঞেস করল, তুইতো সন্ন্যাসী, যখন খেলা দেখিস তখন সম্পূর্ণ পক্ষপাতশূন্য হয়ে দেখিস?
এ কথায় পরমানন্দ খুব হতবাক হয়ে খানিকক্ষণ চেয়ে ছিল হেমাঙ্গর দিকে। তারপর বলল, হেমাঙ্গ, তুই কিন্তু খুব অদ্ভুত!
কেন?
তুই আমাকে চমকে দিয়েছিস। বড় মারাত্মক প্রশ্ন। পক্ষপাতশূন্যতা।
ওটা তো জবাব হল না।
ওটাই জবাব। বোধ হয় ঈশ্বর স্বয়ং ছাড়া আর কেউ পক্ষপাতশূন্য হতে পারে না।
তা হলে সন্ন্যাসী হয়ে তোর কী লাভ হল?
লাভ হয়েছে কে বলল? লাভ লোকসান নয়। এটা একটা মোড অফ লাইফ।সন্ন্যাসও একটা রিসার্চ, এক ধরনের গবেষণা।
সেই সঙ্গে কি একটা স্যাটিস ফ্যাকশনও? একটু ইগো? একটু সুপিরিয়রিটি কমপ্লেক্সও?
পরমানন্দ খুব হাসল। বলল, তোকে নিয়ে পারা যায় না।
হেমাঙ্গ সামান্য উত্তেজিত হয়ে বলে, দেখ, সন্ন্যাসীদের বাইরে যতই বৈরাগ্য মাখা থাক, ভিতরে ভিতরে সে কিন্তু সংসারী মানুষদের চেয়ে নিজেকে উন্নত স্তরের মানুষ ভাবে। তুইও কি ভাবিস না? সত্যি করে বল তো, এই আমাকে দেখেই কি তোর মনে হয় না যে, ইস, হেমাঙ্গটা কোন অন্ধকারে লোভলালসার মধ্যে পড়ে আছে!
পরমানন্দ স্মিতমুখে বলে, অতটা হয় না। তবে ইগো একটা পাজি জিনিস। মৃতদেহের দাহ শেষ হওয়ার পরও একটা পিণ্ডাকার জিনিস থাকে। সেটা পুড়ে পুড়ে শেষ হতে চায় না। লোকে ওটাকে বলে অস্তি। অর্থাৎ যার লয়ক্ষয় নেই। ইগো ঠিক ওরকম। তবে সংসারী তার ইগোকে পুষে রাখে, তাকে যত্ন আত্তি করে। যেন পোষা পাখি। আর সন্ন্যাসী তার ইগোকে তাড়ানোর একটা চেষ্টা অন্তত করে। সেটাই তার তপস্যা।
নইলে সংসারী আর সন্ন্যাসীতে তফাত নেই বলছিস?
তফাত সামান্যই। শুধু অ্যাটিচুডের তফাত। পারপাসের তফাত।
আমি পারপাসের তফাতটাই জানতে চাই। তুই কেন বেঁচে আছিস তা বুঝিস? বেঁচে থাকাটার পারপাস কী?
সেটাই তো বুঝবার চেষ্টা করছি। কেন জন্ম, কেন এই বেঁচে থাকা, কেন চৈতন্য, কেন অনুভূতি। শুধু পান, ভোজন, রমণ, অস্মিতা এর তো কোনও উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য নেই।
আমাকে বুঝিয়ে দে। বুঝতে পারলে সব ছেড়েছুঁড়ে সন্ন্যাসী হব।
সন্ন্যাসী হবি! কোন দুঃখে। দুনিয়ায় সবাই সন্ন্যাসী হলে যে রসাতলে যাবে। চাষবাস, ব্যবসাবাণিজ্য, প্রোডাকশন সব লাটে উঠবে। সন্ন্যাসীরাও তখন ট্যানা কমণ্ডলু বা ভিক্ষে জুটবে না।
তোর আশ্চর্য পাটোয়ারি বুদ্ধি। সংসারীরা কাজকর্ম করে দুনিয়ার ইকনমি আর প্রোডাকশন বহাল রাখুক, আর তোর মতো সন্ন্যাসীরা তাদের ঘাড় ভেঙে খেয়ে দিব্যি ঈশ্বর-সাধনা করে। পরব্রহ্মে লীন হয়ে যাক। ভগবান যদি এতই বোকা লোক হয়ে থাকে। তবে তার জন্য তপস্যা করার মানেই হয় না।
সন্ন্যাসীরা কাজ করে না, কে বলল? ঠাকুর নিজেই তো সংসারী ছিলেন। সন্ন্যাসীরাও সংসারেরই কাজ কর, তবে বৃহৎ সংসার।
ওটা তত্ত্বকথা নয় তো রে?
পরমানন্দ মৃদু মৃদু হাসছিল। বলল, তত্ত্বকথা যখন ফলিত হয় তখনই ধর্ম। কিন্তু মুশকিল হল সব তত্ত্বকে ফলিয়ে তোলা কঠিন কাজ।
হেমাঙ্গ হতাশ হয়ে বলে, তোর ইস্কুল, অনাথ আশ্রম, তাত এসবও আমার কাছে ছেলেখেলা বলে মনে হয়। তুই তো রোজগার করে এর চেয়ে অনেক বেশি করতে পারতিস বৃহৎ সংসারের জন্য। তাই না? তুই কি এসকেপিস্ট?
তুই আজ আমার স্বরূপ না বের করে ক্ষান্ত হবি না নাকি?
স্বরূপ আবার কিছু আছে নাকি?
আছে বৈকি। ভণ্ড সন্ন্যাসীরস্বরূপ তো তার করুণ দুর্বল চেহারাটা।
